সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: একেবারে হাতেগরম একটা ঘটনার কথা বলি। নিজের নয় অবশ্য। এক বাঙালি ভদ্রলোকের অভিজ্ঞতা। প্রবল ঠান্ডার রাতে লেপের তলায় শুয়ে মোবাইলে একটি অনলাইন সাইট থেকে কী কী কিনতে হবে, সেসব দেখছিলেন। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে বাড়ির মাউথ ওয়াশটা শেষ হয়ে গিয়েছে। অর্ডার করা দরকার। গৃহস্থালির অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে মাউথ ওয়াশটা ‘অ্যাড টু কার্ট’ করতে গিয়ে ভুলবশত ‘বাই নাও’ করে ফেলেন। যতক্ষণে তিনি বিষয়টি খেয়াল করেছেন, ততক্ষণে অর্ডার প্লেস হয়ে গিয়েছে। মফস্সলে ওই গভীর রাতে একটা মাউথওয়াশ ডেলিভারি হবে না বলে ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁকে অবাক করে ওই রাতেই অর্ডার প্যাকড এবং আউট ফর ডেলিভারি। বাকরুদ্ধ ভদ্রলোক অর্ডার ক্যানসেল করার চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি। কারণ ডেলিভারি পার্টনার ততক্ষণে রওনা দিয়ে দিয়েছেন। রাত দুটো দশে বাড়িতে এসে হাজির হন ওই ডেলিভারি এজেন্ট। মাউথ ওয়াশ নিয়ে। সামান্য একটা জিনিস, যেটা ওই মুহূর্তে না পেলেও চলত, হাতে নিয়ে তখন মহা বিব্রত ওই ভদ্রলোক। ক্ষমাও চান ডেলিভারি পার্টনারের কাছে। কিন্তু তাঁকে চমকে দিয়ে ওই কর্মী বলেন, ‘কী ডেলিভারি হচ্ছে, সেটা বড় বিষয় নয়। ১৫ মিনিট ডেলিভারিতে ক্রেতা যা অর্ডার করবেন, তাই আমাদের নিয়ে আসতে হবে।’
এটাই নিয়ম। কিন্তু ওই ভদ্রলোক নিজের অভিজ্ঞতা (কিছুটা বিড়ম্বনাও বটে) সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার পরেই রে রে করে উঠেছেন নেটিজেনদের একাংশ। কেউ লিখেছেন, অনলাইন সাইটগুলির দিকে আঙুল না তুলে নিজে সতর্ক হোন। রাতবিরেতে বিনা দরকারে কিছু অর্ডার করবেন না। কেউ আবার বলেছেন, কিছু জিনিস পাড়ার মুদি দোকান থেকে, বাকিটা স্থানীয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে কিনে নিলেই হয়। অথচ যাঁরা এই ধরনের পোস্টগুলি করছেন, তাঁরা সবাই কিন্তু পাড়ার দোকান থেকে জিনিসপত্র কেনেন, এমনটা নয়। কখনও বাড়তি ছাড়ের লোভে, কখনও অতি প্রয়োজনে বহু সময়েই অ্যাপের দ্বারস্থ হন তাঁরা। সেক্ষেত্রেও কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যেই বাড়িতে এসে হাজির হয় অর্ডারি জিনিসপত্র। আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেইসব ডেলিভারির জন্য শহরের কোনও প্রান্তে কখনও কেউ ট্র্যাফিক সিগন্যাল ভাঙেন, কেউ বৃষ্টির মধ্যে নিজের জীবনের ঝুঁকি নেন। সেসব অবশ্য অ্যাপগুলি দেখায় না। সুকুমার রায়ের ‘খুড়োর কল’ আজ অ্যাপের ভিতরে। আঙুল ছোঁয়ালেই সেই কল চলে। কিন্তু কে চাকা ঘোরাচ্ছে, কার শরীর ক্ষয় হচ্ছে, সেটা কল জানে না। আমরাও জানি না। এই অদৃশ্যতাই গিগ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই অদৃশ্যতার আড়ালেই জন্ম নিচ্ছে গিগ ওয়ার্কারদের নিরাপত্তা বিষয়ক বিতর্ক। সেই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশের একটি ঘটনায়। অনন্তপুর স্টেশনে মাত্র এক-দু’মিনিটের জন্য থেমেছিল প্রশান্তি এক্সপ্রেস। সেই সময়ে ফার্স্ট এসি কোচে খাবার পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন এক ডেলিভারি এজেন্ট। কিন্তু খাবার দিয়ে নামার আগেই ট্রেন চলতে শুরু করে। চলন্ত ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে নামতে গিয়ে পড়ে যান তিনি। সৌভাগ্যবশত প্রাণে বেঁচে যান ওই যুবক। সেই ঘটনার ভিডিয়োটি ভাইরাল হতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্নের ঝড় উঠেছে। কেউ আঙুল তুলেছে সংস্থার ডেলিভারি ব্যবস্থার দিকে। কেউ আবার দুষেছেন খাবারের অর্ডার দেওয়া ব্যক্তিকে। কেন তিনি গেটে এসে খাবারের প্যাকেট নিলেন না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।
কোনও কোনও ঘটনার কিছু ভিডিয়ো ভাইরাল হয়। দু’দিন আলোচনা হয়। তারপর সবাই ভুলে যায়। কিন্তু এগুলি আসলে কোনও ব্যতিক্রমী বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতে অতি দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকা গিগ অর্থনীতির প্রতিদিনের ঝুঁকিপূর্ণ চালচিত্র। এদেশে দীর্ঘদিন ধরেই গিগ অর্থনীতিকে ‘স্বাধীন কাজের’ মডেল হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়, নিজের মতো কাজের সময় বেছে নেওয়া, নিজের আয় নিজে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ রয়েছে এই পেশায়। কিন্তু বাস্তবে এই স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রেই কাগুজে। এই ধরনের প্রতিটি প্ল্যাটফর্মেই অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত কাজের চাপ, রেটিং সিস্টেম এবং ইনসেনটিভ কাঠামো গিগ কর্মীদের এমন এক দৌড়ে নামিয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা প্রায় গৌণ হয়ে পড়ে। মুখ্য হয়ে ওঠে প্ল্যাটফর্মে নিজের রেটিং ভালো রাখার তাগিদ। আর সেই কারণে অর্ডার এলে মাঝরাতে বাইক স্টার্ট করে দৌড়তে হয়। ট্রেন স্টেশনে এক-দু’মিনিট দাঁড়াবে জেনেও কোচের ভিতরে ঢুকে ডেলিভারির ঝুঁকি নিতে হয়। কোনও অর্ডার বাতিল করলে শুধু যে সেই দিনের আয় কমে যাবে, এমনটা নয়। পাশাপাশি কমে যাবে রেটিংও। আর একবার রেটিং কমে গেলে ভবিষ্যতের অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে। পর পর কয়েকটা অর্ডার যদি কেউ ক্যানসেল করে দেয়, তাহলে ওই ডেলিভারি পার্টনারের অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত ব্লক হয়ে যেতে পারে। এভাবেই অ্যালগরিদমের অদৃশ্য শৃঙ্খলে আটকে পড়ে যান ডেলিভারি পার্টনাররা।
আসলে আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে ‘সময়’ এখন সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য। আর এই সময়ের চাহিদাকে পুঁজি করেই ফুলেফেঁপে উঠেছে ‘কুইক কমার্স’ বা অতি-দ্রুত পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, স্বল্প সময়ে ডেলিভারি মডেলটি আসলে এক ‘অ্যালগরিদমিক শোষণের’ হাতিয়ার। সংস্থাগুলির সিইওরা অবশ্য দাবি করেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষেই দ্রুত ডেলিভারি সম্ভব হচ্ছে। অথচ বাস্তবে অতি-দ্রুত পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার পুরো বোঝা বইতে হয় ডেলিভারি পার্টনারদের। ঘিঞ্জি রাস্তা, জ্যাম এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে যখন কম সময়ে ‘কাল্পনিক’ লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়ার চাপ থাকে, তখন ট্র্যাফিক আইন লঙ্ঘন করা বা জীবনের ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া গিগ ওয়ার্কারদের কাছে কোনও পথ থাকে না।
মজার বিষয় হল, ‘কুইক কমার্স’ প্ল্যাটফর্মগুলি প্রায়শই দাবি করে যে গিগ কর্মীরা তাদের কর্মচারী নন, ‘পার্টনার’। গালভরা শব্দটা শুনতে দারুণ লাগলেও এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে অন্ধকার। কারণ এই আইনি সংজ্ঞাই সংস্থাগুলির বড় অস্ত্র। কারণ কর্মচারী না হলে প্রভিডেন্ট ফান্ড, স্বাস্থ্যবিমা, দুর্ঘটনা বিমা, ন্যূনতম মজুরি বা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার মতো বাধ্যবাধকতা অনেকটাই এড়ানো যায়। বি আর আম্বেদকর শ্রমের অধিকার এবং মর্যাদার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আজকের গিগ অর্থনীতিতে ডেলিভারি কর্মীরা একটি বিচ্ছিন্ন শ্রেণিতে পরিণত হয়েছেন। মানুষের বদলে একটি ‘অ্যাপ’ বা ‘অ্যালগরিদম’ তাঁদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। কোম্পানিগুলি কোটি কোটি টাকার আইপিও আনলেও নিচুতলায় থাকা কর্মীদের ‘বেস পে’ বা ইনসেনটিভ কমে যায়। জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দামের বাজারে যখন একজন ডেলিভারি কর্মীর আয় কমে যায়, তখন পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া আর কোনও পথ খোলা থাকে না। কারণ, যত বেশি ডেলিভারি, তত বেশি কমিশন। আর সেই কারণেই বাড়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা।
গিগ অর্থনীতি থাকবে। থাকবেন গিগ ওয়ার্কাররাও। কিন্তু প্রশ্ন হল, কী শর্তে? সম্প্রতি বড়দিন ও বর্ষবরণের রাতে কম বেতন, ১০ মিনিটের ডেলিভারি মডেলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষার অভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ধর্মঘটে শামিল হন গিগ কর্মীরা। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রাজস্থান, কর্ণাটক, বিহার ও ঝাড়খণ্ড (তেলেঙ্গানায় আইন প্রণয়নের কাজ চলছে) ছাড়া গিগ ওয়ার্কারদের সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত কোনও আইন নেই। সংসদে শীতকালীন অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন সাংসদ রাঘব চাড্ডা। গিগ ওয়ার্কারদের বাস্তব লড়াইকে জনসমক্ষে আনতে এক ডেলিভারি কর্মীর সঙ্গে ঘুরে একটি ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন তিনি। তার একদিন পরেই বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ব্লিনকিট, জেপটো, জোমাটোর মতো সংস্থাগুলিকে তাদের বিজ্ঞাপন থেকে ‘১০ মিনিটের ডেলিভারি’ কথাটি সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে ব্লিনকিট '১০ মিনিটে ১০ হাজারের বেশি জিনিস ডেলিভারি'র ট্যাগ লাইন বদলে '৩০ হাজারেরও বেশি জিনিস আপনার বাড়ির দরজায়' করেছে। বাকি সমস্ত গুলিও এই পথে হাঁটবে বলেই খবর। যে ১০ মিনিটের ‘মরীচিকা’র পিছনে হন্যে হয়ে ছুটতে গিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত হচ্ছিল গিগ ওয়ার্কারদের, তাতে অবশেষে দাঁড়ি পড়ল। আম আদমি পার্টির নেতা রাঘব চাড্ডার মতো অনেকেই এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন।
আসলে রাইডারের পিঠের ব্যাগে যখন ‘১০ মিনিট’ লেখা থাকে এবং ক্রেতার ফোনের স্ক্রিনে টাইমার চলে, তখন সেই অদৃশ্য চাপ রাইডারকে ট্রাফিক সিগন্যাল ভাঙতে বা জীবনের ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে। অবশেষে সময়ের সেই মারণ ফাঁস অন্তত খাতায়-কলমে ঢিলে হচ্ছে। কিন্তু ব্র্যান্ডিং বদলালেই কি অ্যালগরিদমের অদৃশ্য চাবুক থেমে যাবে নাকি নাম বদলালেও পর্দার আড়ালে সেই গতির পাগলামি চলতেই থাকবে? তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে শুধুমাত্র সরকার বা সংস্থাগুলির তরফে পদক্ষেপ নিলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমনটা নয়। ক্রেতা হিসাবে আমাদেরও ভাবতে হবে—আমাদের এক প্যাকেট দুধ বা মাঝরাতের ক্রেভিংসের জন্য আইসক্রিম ও চিপসের জন্য অন্য একজন মানুষের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া কতটা যুক্তিপূর্ণ? সেই উত্তর দিতে হবে আমাদেরই।