অবশেষে মূল্যবৃদ্ধির কারণের জন্য একজন ‘ভিলেন’ খুঁজে পেয়েছে রিজার্ভ ব্যাংক! তার নাম রান্নার গ্যাস। গত বছর দেশে রান্নার গ্যাসের দাম বেড়ে হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৯০০ টাকা। লোকসভা ভোটের আগে মার্চ মাসে সিলিন্ডার পিছু ১০০ টাকা দাম কমিয়ে দেয় মোদি সরকার। কিন্তু ভোট মিটতেই চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ফের ৫০ টাকা বেড়েছে গ্যাসের দাম। কলকাতায় এখন সিলিন্ডার পিছু গ্যাসের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৭৯ টাকা। গ্যাসের এই দাম বৃদ্ধির কারণেই মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম পরানো যাচ্ছে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সর্বোচ্চ ব্যাংক। এমনিতেই সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যে কোনও মানুষই জানেন, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। এটা কোনও নতুন তথ্য নয়। তবে স্বস্তির কথা হল, রিজার্ভ ব্যাংক নাগরিকদের মতো করে মূল্যবৃদ্ধির কারণটা ভেবেছে। কিন্তু একথা শুনে মোদি সরকার রাতারাতি গ্যাসের দাম কমিয়ে দেবে—এমনটা ভাবা খুব সরলীকরণ হয়ে যাবে। বরং জ্বালানি তেল নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে দর কষাকষির ভবিষ্যৎ যেদিকে মোড় নিচ্ছে, অর্থাৎ শেষপর্যন্ত ভারত যদি রাশিয়ার সস্তা তেলের আমদানি কমিয়ে বা বন্ধ করে দিয়ে আমেরিকা তথা পশ্চিমী দুনিয়া থেকে বেশি দামে তেল কেনার পরিমাণ বাড়ায়—তাহলে তার জেরে মূল্যবৃদ্ধি যে মাথাচাড়া দেবে—তা বলাই বাহুল্য। তাই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং জিএসটি কমে যাওয়ায় জিনিসপত্রের দাম সস্তা হয়ে গিয়েছে বলে যে প্রচার চালাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, এই সময়েই তা ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে।
ভারতের মতো দেশে এই মূল্যবৃদ্ধি কমে যাওয়া বা নিয়ন্ত্রণে আসার বিষয়টি বেশ গোলমেলে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবিমতো, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির হার ২০১৭ সালের জুন মাসের পর সবচেয়ে কম। আগস্ট মাসে মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ২.১ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা আরও কমে হয়েছে ১.৫ শতাংশ। এই মূল্যহ্রাস মূলত খাদ্যপণ্য কেন্দ্রিক। যেমন, শাকসবজি, ডাল ও মশলাপাতি সস্তা হওয়ায় সামগ্রিকভাবে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু এই খাদ্যপণ্যের মধ্যেই আবার দানাশস্য, ডিম, ভোজ্যতেল, ফল, দুধ, রান্নাকরা খাবারের দাম সামান্য বেড়েছে। মহার্ঘ হয়েছে মাছ, মাংস, চিনি। তার মানে, দৈনন্দিন খাদ্যদ্রব্যের এমন অনেক ‘আইটেম’ অর্থাৎ সামগ্রী রয়েছে, যার দাম আদৌ কমেনি। তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন হল, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও জিএসটি-র হার কমার তেমন কোনও সুফল কি পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ? পাড়ায় পাড়ায় খুচরো বিক্রির দোকান-বাজারগুলিতে এখনও যে দামে বিক্রি হচ্ছে খাদ্যসামগ্রী তাতে কি ‘সস্তার’ আঁচ পাওয়া যাচ্ছে? এককথায় উত্তর হল ‘না।’ সরকার যে দাবিই করুক সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা তেমনই। গত কয়েক মাস ধরে শাকসবজি, কাঁচাআনাজ, মাছ-মাংস থেকে মশলা ও প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যের যে ‘ঊর্ধ্বমুখী’ ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে মোদি সরকারের যাবতীয় দাবি ও রিজার্ভ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সেই বাস্তবের তেমন কোনও মিল নেই। আসলে এই ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগী বলে যে অংশটা থাকে, লোকে যাদের ‘দালাল’ বলে জানে, বিভিন্ন পণ্যে অর্থাৎ কাঁচামালে তাদের লাগামছাড়া উপার্জনের অংশ যোগ হয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঘুমিয়ে থাকা সরকারি আতশকাচে এদের কীর্তিকলাপ ধরা পড়ে না বলেই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের দাবি ও বাস্তব কোনওকালেই মেলে না। আসলে কোনও সরকারই এই হিসাব মেলাতে চায় না।
সাধারণ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে শুধু খাবার হলেই চলে না, আরও অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। খাতায়-কলমে যা ভোগ্যপণ্য। যেমন, গায়ে মাখার সাবান, তেল, শ্যাম্পু ইত্যাদি। স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো জরুরি ক্ষেত্রে, মাথাগোঁজার জন্য ফ্ল্যাট, আয়াস করার দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহারের খরচ বেড়েছে অনেকটাই। পাশাপাশি বাড়ির শুভ কাজে মূল্যবান সম্পদ হিসাবে যা কেনেন সাধারণ মানুষ, সেই সোনা-রুপোর দাম অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এসবের নিট ফল হল, খাতায়-কলমে খাদ্যপণ্যে কিছুটা ছাড় মিললেও এর বাইরে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যায়নি। তথ্য বলছে, খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির দামের নামা-ওঠার হিসাব বাদ দিয়ে যে মূল্যবৃদ্ধির হিসাব কষা হয় তাতে দেখা যাচ্ছে সেপ্টেম্বরে মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৪.৬ শতাংশ। আগস্টের তুলনায় এই হার ০.০৪ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বেশিরভাগ পণ্যসামগ্রীর দাম বেড়েছে। তাই একথা বলা যাচ্ছে না যে, বাজারদর নাগালের মধ্যে এসেছে। মোদি সরকার ‘জিএসটি সাশ্রয় উৎসব’ পালনের প্রচার যতই করুক না কেন সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলছে। তাঁদের অনেকেই মনে করছেন, জিনিসপত্রের দাম এখনও আকাশছোঁয়া। আর নানা ধরনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় গরিব মানুষের তো নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা।