নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লায়োনেল মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার জের। ৭২ ঘণ্টার মাথায় রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিলেন অরূপ বিশ্বাস। মঙ্গলবার দুপুরেই তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং আপাতত ক্রীড়াদপ্তর নিজের হাতে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, যুবভারতীকাণ্ডে তদন্ত কমিটির প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে পুলিশ-প্রশাসনের তাবড় কর্তাদের বিরুদ্ধেও এদিন একের পর এক ‘অ্যাকশন’ নিয়েছে নবান্ন। গত শনিবারের ঘটনায় পুলিশি গাফিলতির জোরালো অভিযোগ উঠেছে। সেই কারণে শোকজ করা হয়েছে রাজ্যের ডিজি রাজীব কুমারকে। সিপি বিধাননগর মুকেশ এবং ক্রীড়া সচিব রাজেশ কুমার সিনহাকেও বিশৃঙ্খলার কারণ দর্শানোর (শোকজ) চিঠি ধরানো হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের জবাব দিতে হবে। এছাড়া কাজে গাফিলতির অভিযোগে সাসপেন্ড করা হয়েছে বিধাননগরের ডিসিপি অনীশ সরকারকে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরুর নির্দেশও দিয়েছে নবান্ন। সেই সঙ্গে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে যুবভারতীর সিইও দেবকুমার নন্দনকে।
শনিবার যুবভারতী কাণ্ডের পর থেকেই ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের পাশাপাশি পুলিশ-প্রশাসনের একাংশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করছিল। মেসিকে দেখতে না পেয়ে স্টেডিয়ামে ভাঙচুর চালায় ক্ষিপ্ত দর্শকরা। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়, মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ এবং স্বরাষ্ট্র সচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন মুখ্যমন্ত্রী। কমিটির সুপারিশ মেনে পুলিশ প্রশাসনের তাবড় কর্তাদের বিরুদ্ধে নবান্নের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে মুখ্যসচিবের দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ্যে আসে এদিন দুপুরে। তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অরূপ বিশ্বাসের ক্রীড়ামন্ত্রী পদে ইস্তফার চিঠি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। নবান্নের তরফেও জানিয়ে দেওয়া হয় ইস্তফা গ্রহণের বিষয়টি। সোমবার মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়া সেই চিঠিতে অরূপ লিখেছেন, ‘নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে আমি ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে আপনার কাছে অব্যাহতি চাইছি। আশা করি আপনি আমার এই অনুরোধ রাখবেন।’ এদিন সেই ইস্তফাপত্র গ্রহণ করেন মমতা। এও জানিয়ে দেন, তদন্ত চলাকালীন অরূপের ক্রীড়ামন্ত্রী পদে না থাকার সিদ্ধান্ত সঠিক। আপাতত এই দপ্তরের কাজকর্ম তিনি নিজেই দেখবেন। তবে বিদ্যুৎ এবং আবাসন দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে স্বাভাবিক ছন্দে কাজ চালিয়ে যাবেন অরূপ বিশ্বাস।
এদিন সকালেই দক্ষিণ কলকাতায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়ের বাড়িতে বৈঠকে বসেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। তার পরেই জমা পড়ে কমিটির প্রাথমিক রিপোর্ট। বৈঠকের পর মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ জানিয়েছেন, যুবভারতীতে মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় নজরদারির অভাব ধরা পড়েছে। জলের বোতল স্টেডিয়ামের ভিতর কীভাবে ঢুকল, তা খতিয়ে দেখা হবে। যদি রাতের অন্ধকারে যুবভারতীতে জল ও খাবার ঢোকে, তাহলে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা সিট গঠন করে গভীর তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। কমিটির এই পরামর্শের পরই ডিরেক্টর সিকিওরিটি পীযূষ পান্ডে, এডিজি (আইন শৃঙ্খলা) জাভেদ শামিম, এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) সুপ্রতিম সরকার এবং সিপি বারাকপুর মুরলিধরকে নিয়ে চার সদস্যের সিট গঠনের নির্দেশিকা জারি করে নবান্ন। সন্ধ্যায় যুবভারতী পরিদর্শনও করেছেন তাঁরা।
তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে মুখ্যসচিব আরও বলেন, ‘আমরা শুনেছি পুলিশি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জলের বোতল ঢুকেছে। এমনকি জলের স্টল দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেখানে যাঁরা (পুলিশ) ডিউটিতে ছিলেন তাঁরা কিছুতেই দায় এড়াতে পারেন না। তাঁদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ আবার আয়োজক সংস্থাও ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না বলে কমিটির প্রাথমিক রিপোর্টের পর্যবেক্ষণ। সেই কারণে অনুষ্ঠানে কী কী করার পরিকল্পনা ছিল তা নিয়ে পুলিশ ও ক্রীড়াদপ্তরের রিপোর্ট তলব করা হয়েছে।
যুবভারতী কাণ্ডে মূল আয়োজক শতদ্রু দত্তর সংস্থার সঙ্গে যুক্ত দুই ফুটবলার সহ আরও ছ’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠিয়েছিল বিধাননগর কমিশনারেট। এদিন হাজির হয়েছিলেন চারজন। আবার ভাঙচুরের ঘটনায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ধাপার বাসিন্দা রূপক মণ্ডল নামে আরও একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই নিয়ে ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করা হল।