Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নির্বাচনে কারচুপির কায়দা

৩ ফেব্রুয়ারি সংসদে আমার বক্তৃতায় এবং পরবর্তী এক সাংবাদিক বৈঠকে গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে আমার উদ্বেগ জানিয়েছিলাম।

নির্বাচনে কারচুপির কায়দা
  • ৭ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাহুল গান্ধী: ৩ ফেব্রুয়ারি সংসদে আমার বক্তৃতায় এবং পরবর্তী এক সাংবাদিক বৈঠকে গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে আমার উদ্বেগ জানিয়েছিলাম। ভারতে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা নিয়ে আমি সন্দেহ প্রকাশ করেছি। ব্যাপারটা প্রতিবার কিংবা সর্বত্র নয়, তবে প্রায়ই যথেষ্ট রকমে ঘটে থাকে। ছোট আকারের জালিয়াতির কথা বলছি না, বরং আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে দখল করার ক্ষেত্রে যে শিল্প-পর্যায়ের রিগিং বা কারচুপি হয়ে থাকে, আমি বলছি তারই কথা। 

Advertisement

কিন্তু যদি পূর্ববর্তী কিছু নির্বাচনের ফলাফল বিদঘুটে বলে মনে হয়, তবে ২০২৪ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ভীষণই অদ্ভুত। জালিয়াতির মাত্রা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, গোপন করার সমস্ত প্রচেষ্টাই বিফলে গিয়েছে। 
কোনও বেসরকারি সূত্রের তথ্য মানতে হবে না, ধাপে ধাপে সরকারি পরিসংখ্যানেই এর যাবতীয় প্রমাণ স্পষ্ট  হয়ে গিয়েছে। 
ধাপ ১: আম্পায়ার নিয়োগের প্যানেলে কারচুপি 
২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনারদেরকে কার্যকরভাবেই প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেছে নিতে পারবেন। কেননা, ২:১ ব্যবস্থায়, মোট তিনজন সদস্যের মধ্যে বিরোধী দলনেতা সর্বদাই এই ব্যাপারে ভোটের বাইরে থেকে যেতে পারেন। মজার বিষয় হল—যে প্রতিযোগিতার জন্য এই আম্পায়ারদের নির্বাচন ব্যবস্থা, ভদ্রমহোদয়গণ এই প্রতিযোগিতার শীর্ষ প্রতিযোগীও। প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে নির্বাচন কমিটিতে রাখার সিদ্ধান্তটি সন্দেহ সংশয়ের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, কেন একজন নিয়ম ভেঙে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একজন নিরপেক্ষ বিচারককে (নিউট্রাল আরবিট্রেটর) সরাতে যাবেন? এই প্রশ্নটির উত্তর জানা।
ধাপ ২: ভুয়ো ভোটারে লিস্ট ফাঁপানো 
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে যে, ২০১৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মহারাষ্ট্রে ভোটার ছিল ৮ কোটি ৯৮ লক্ষ। সংখ্যাটি পাঁচবছর পর, ২০২৪-এর মে মাসে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনের সময় বেড়ে ৯ কোটি ২৯ লক্ষে পৌঁছয়। কিন্তু মাত্র পাঁচমাস পরে, গত নভেম্বরে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংখ্যাটি এক লাফে হয়ে যায় ৯ কোটি ৭০ লক্ষ! যেখানে পাঁচবছরে ৩১ লক্ষ বৃদ্ধি, সেখানে ৪১ লক্ষ বেড়ে গেল মাত্র মাত্র পাঁচমাসে! এই উল্লম্ফন কতটা অবিশ্বাস্য ভেবে দেখুন: সরকারের নিজস্ব হিসেবে মহারাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা ৯ কোটি ৫৪ লক্ষ। ভোটার তার চেয়ে অনেকটাই বেশি—৯ কোটি ৭০ লক্ষ! 
ধাপ ৩: ভোটার সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে 
ভোটদানের হারও বৃদ্ধি 
বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী এবং পর্যবেক্ষকের কাছে, মহারাষ্ট্রে ভোটদানের দিনটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল। আর পাঁচটা জায়গার মতোই, ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছিলেন এবং যে যার বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। বিকেল ৫টার মধ্যে যাঁরা ভোটদান কেন্দ্রে ঢুকেছিলেন তাঁদের ভোটদান শেষ না-হওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকার অনুমতি ছিল। কোনও ভোটদান কেন্দ্রে অস্বাভাবিক দীর্ঘ লাইন কিংবা ব্যাপক ভিড়ের কোনও খবর ছিল না। 
তবে নির্বাচন কমিশনের মতে, ভোটদানের দিনটি অনেক বেশি নাটকীয় ছিল। ভোটদানের হার বিকেল ৫টায় ছিল ৫৮.২২ শতাংশ। ভোটগ্রহণ বন্ধ হওয়ার পরেও ভোটদানের হার ক্রমশ বাড়তে থাকে। পরদিন সকালেই ৬৬.০৫ শতাংশ চূড়ান্ত ভোটদানের রিপোর্ট মেলে। এই অভূতপূর্ব ৭.৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি কিন্তু ৭৬ লক্ষ ভোটারের সমান—মহারাষ্ট্রে তার আগের বিধানসভা ভোটের চেয়ে অনেক বেশি (নীচের টেবিলটি দেখুন):
ধাপ ৪: যথার্থ লক্ষ্যভেদ, বিজেপি যেন ব্র্যাডম্যান! 
অসঙ্গতি আরও অনেক। মহারাষ্ট্রে বুথ প্রায় ১ লক্ষ। গত লোকসভা ভোটে বিজেপির ফল খারাপ হয়েছিল ৮৫টি আসনের প্রায় ১২ হাজার বুথে। বিধানসভা ভোটে ওই চিহ্নিত বুথগুলিতেই বাড়তি ভোটার যোগ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, বিকাল ৫টার পর প্রতিটি বুথে গড়ে ৬০০ জনেরও বেশি ভোটার উপস্থিত ছিলেন। অনুমান, একজনের ভোটদানের জন্য এক মিনিটের প্রয়োজন, তাহলে ওই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ১০ ঘণ্টা জরুরি। যেহেতু এমনটা আদৌ হয়নি, 
তাই প্রশ্ন উঠেছে—অতিরিক্ত ভোটগুলি কোন জাদুতে পড়েছিল? অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, এই ৮৫টি আসনের বেশিরভাগই জিতেছে মোদি-শাহদের জোট (এনডিএ)।
ভোটার সংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধির জন্য নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা ছিল—‘তরুণদের অংশগ্রহণের একটি ওয়েলকাম ট্রেন্ড’। তাহলে ধরে নেব যে, ওয়েলকাম ট্রেন্ডটি কেবলমাত্র ১২ হাজার বুথেই সীমাবদ্ধ ছিল, বাকি ৮৮ হাজার বুথ রয়ে গিয়েছিল এর বাইরে! গণতন্ত্রের পক্ষে দুঃখজনক না-হলে ব্যাপারটি একটি মজার রসিকতাই হতো। 
একটি সাধারণ কেস স্টাডি হিসেবে কামঠী নামক আসনটিকে নেওয়া হল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আইএনসি) কামঠীতে ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ভোট পেয়েছিল। তার পাশে বিজেপির প্রাপ্তি ছিল ১ লক্ষ ১৯ হাজার। ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভোট সংগ্রহ ছিল ১ লক্ষ ৩৪ হাজার, সংখ্যাটি তাদের আগের ফলাফলের কাছাকাছি। একই জায়গায় বিজেপির স্কোর পৌঁছে গেল ১ লক্ষ ৭৫ হাজারে, অর্থাৎ শাসক দলের একলপ্তে বৃদ্ধির পরিমাণ ৫৬ হাজার! কামঠীতে এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন এসেছে দুটি নির্বাচনের মাঝে যোগ হওয়া ৩৫ হাজার নতুন ভোটার থেকেই। মনে হচ্ছে যেন লোকসভায় ভোট না-দেওয়া প্রায় সমস্ত ভোটার, এবং নতুন প্রায় ৩৫ হাজার ভোটারের সকলেই বিজেপির প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। চুম্বকের পদ্মের আকার গ্রহণের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা কঠিন নয়।
উপর্যুক্ত ধাপ ১-৪ থেকে এটাই পরিষ্কার যে, ২০২৪ সালে বিধানসভায় ১৪৯টি আসনের মধ্যে বিজেপি ১৩২টিতে জিতেছে, ব্যাপারটা শতাংশের হিসেবে ৮৯! শাসক দলের এই ভোট প্রাপ্তির হার যেকোনও সময় এবং যেকোনও স্থানের চেয়ে অনেক বেশি। মাত্র পাঁচমাস আগে লোকসভায় বিজেপির ভোট প্রাপ্তির হার ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ। সব মিলিয়ে তুলনাটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। 
ধাপ ৫: প্রমাণ গোপন 
নির্বাচন কমিশন নীরবে, এমনকী জোরের সঙ্গেও বিরোধী দলের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল। ২০২৪ লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ছবিসহ ভোটার তালিকা সরবরাহের দাবি তারা খারিজ করে দিয়েছিল পত্রপাঠই। 
আরও খারাপ বিষয় হল, বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র একমাস পরে, এবং হাইকোর্টের নির্দেশে নির্বাচন কমিশনকে ভোটগ্রহণের ভিডিওগ্রাফি এবং সিসিটিভি ফুটেজ শেয়ার করার নির্দেশ দেওয়ার পর ১৯৬১ সালের নির্বাচন বিধির ৯৩(২)(ক) ধারা সংশোধন করা হয়। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে কেন্দ্রীয় সরকার এই পদক্ষেপ করার ফলে সিসিটিভি ফুটেজ এবং ইলেকট্রনিক নথি পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। সংশোধনী নিজেই, এবং এর সময়কাল উভয়ই একটি ‘উপহার’। সম্প্রতি ফাঁস হয়ে গিয়েছে অবিকল নকল এপিক নম্বর। এই ঘটনায় ভুয়ো ভোটার সম্পর্কে দেশবাসীর উদ্বেগ বেড়ে গিয়েছে। তবে এই কেলেঙ্কারি সম্ভবত হিমশৈলের চূড়ামাত্র।
ভোটার তালিকা এবং সিসিটিভি ফুটেজ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহার্য হাতিয়ার, যখন গণতন্ত্র লঙ্ঘিত হচ্ছে তখন সেগুলি সিন্দুকে ভরে রাখার অলঙ্কার নয়। ভারতের জনগণের এটা নিশ্চিত হওয়ার অধিকার রয়েছে যে, এই সংক্রান্ত কোনও রেকর্ডই নষ্ট করে ফেলা হয়নি এবং তা করাও হবে না। কোনও কোনও মহলের আশঙ্কা, টার্গেট করে অপছন্দের 
কিছু ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং/অথবা তাঁদের বুথ পাল্টে দেওয়ার মতো কিছু গুরুতর জালিয়াতির প্রমাণ রেকর্ড পরীক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। আরও আশঙ্কা হল—এই নির্বাচনী কারচুপির খেলাটি বছরের পর বছর ধরেই চলছে। রেকর্ড পরীক্ষা করলে মোডাস অপারেন্ডি এবং গোলমেলে চরিত্রগুলিও খোলসা হয়ে যাবে। এই জন্যই বিরোধী দল এবং জনসাধারণকে রেকর্ডগুলির নাগাল পেতে পদে পদে বাধা দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে মহারাষ্ট্রে কারচুপি কেন এমন ভয়াবহ আকারে করা হয়েছিল এই অনুমান কঠিন নয়। কিন্তু নির্বাচনে কারচুপি ম্যাচ-ফিক্সিংয়ের মতোই। ফিক্সিং পক্ষ একটি খেলায় জিততে পারে, কিন্তু তার ফলাফল প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের বিশ্বাসের যে ক্ষতি করে তা অপূরণীয়। ম্যাচ-ফিক্সড ইলেকশনস (যোগসাজশের নির্বাচন) যেকোনও গণতন্ত্রের পক্ষেই বিষস্বরূপ।
 লেখক লোকসভার বিরোধী দলনেতা। 
মতামত ব্যক্তিগত 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ