Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নেপালের বার্তা

হিমালয়ের কোলে সুন্দর শান্ত দেশ নেপাল। ২০০৫ থেকে সেখানেই ধারাবাহিকভাবে শুরু হয় অশান্তি। পরিণামে, ২০০৮ সালে পতন হয় প্রাচীন রাজতন্ত্রের। পৃথিবীর একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্রের রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ (২০০১-২০০৮) প্রাক্তন ঘোষিত হন এবং সেদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করে একটি নির্বাচিত সরকার।

নেপালের বার্তা
  • ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমালয়ের কোলে সুন্দর শান্ত দেশ নেপাল। ২০০৫ থেকে সেখানেই ধারাবাহিকভাবে শুরু হয় অশান্তি। পরিণামে, ২০০৮ সালে পতন হয় প্রাচীন রাজতন্ত্রের। পৃথিবীর একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্রের রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ (২০০১-২০০৮) প্রাক্তন ঘোষিত হন এবং সেদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করে একটি নির্বাচিত সরকার। নতুন নেপালের পরিচয় হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র’। গত ১৭ বছরে ছোট্ট দেশ নেপালে বারবার সরকার বদল হয়েছে। একাধিকবার বদলে গিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মুখ। কিন্তু সেদেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, বরং রকমারি অশান্তিই গ্রাস করেছে দেশটিকে। এবার তো একেবারে বাংলাদেশের কায়দায় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল গণবিদ্রোহ। বলা বাহুল্য, হরেক কিসিম বৈষম্যের বিপুল শ্রীবৃদ্ধি এবং বেলাগাম দুর্নীতিই এসবের নেপথ্যে। মানুষ ফুঁসছিল। দেশটি বস্তুত এক বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছিল ভিতরে ভিতরে। তাতেই ঘটে যায় সোজা অগ্নিসংযোগ। আগুনের ফুলকির কাজ করেছিল ফেসবুক ও ইউটিউবসহ ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়াকে নেপালে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত। ‘জেন জি’র কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর শাসকের রোষের মূল কারণ, এসব অ্যাপ থেকেই সরকার বিরোধী প্রচার চূড়ান্ত আকার নিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম ‘নেপো কিড’ বা বড়োলোকের বখাটে ছেলেপুলেদের বিলাসবহুল জীবন নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিল। তাদের সরাসরি বক্তব্য, দেশবাসীকে শোষণ বা ব্যাপক দুর্নীতি করেই নেতালোকদের ছেলেমেয়েদের এই অসভ্যের মতোই বৈভবের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। তারা এই জিনিস আর বরদাস্ত করবে না বলেও জোরদার প্রচার শুরু হয় দেশজুড়ে। 

Advertisement

অমনি প্রমাদ গুনতে থাকে সরকার বাহাদুর। ২৬টি জনপ্রিয় অ্যাপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ওলি প্রশাসন। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে যাকে বলে ফেটে পড়ে গোটা দেশ। প্রতিবাদীদের হাতে শোভা পায় ‘এনাফ ইজ এনাফ (যথেষ্ট হয়েছে)’ এবং ‘এন্ড টু করাপশন (দুর্নীতির অবসান হোক)’ প্ল্যাকার্ড। কিন্তু এই জনরোষ মোকাবিলার নামে নেপাল পুলিশ নিরীহ মানুষের উপর নির্বিচারে গুলিই চালায় এবং তাতে বহু মানুষ হতাহত হয়। আর যায় কোথায়, মানুষের প্রতিবাদের সমস্ত বাঁধ ভেঙে যায় মুহূর্তে। দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী, এমনকি প্রাক্তন মন্ত্রীদের প্রাসাদ এবং অফিসেও হামলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটও করা হয়েছে যথেচ্ছ। রাস্তায় ফেলে পেটানো হয়েছে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং বিদেশমন্ত্রীকে। আগুনে ঝলসে মারা গিয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পত্নী। প্রতিবাদীদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে সংসদ ভবন, শাসক দলের পার্টি অফিস এবং দিকে দিকে অফিস আদালত শপিং মল প্রভৃতিও। এককথায়, বেনজির নৈরাজ্য গ্রাস করেছে নেপালকে। বেগতিক বুঝে সরকার অ্যাপের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেও শেষরক্ষা করতে পারেনি। পতন হয়েছে কে পি শর্মা ওলি সরকারের। দেশটিতে আপাতত বহাল সেনার শাসন। পাশাপাশি চলছে গণতন্ত্র ফেরাবারও সাধু উদ্যোগ। 
সমস্যাটি আর নেপালের একান্ত অভ্যন্তরীণ নেই—বিশেষ চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে ভারতের জন্য। কেননা, বাফার স্টেট নেপালের সঙ্গে আমাদের সুদীর্ঘ মুক্ত সীমান্ত। দেশটির নিজস্ব সমুদ্র সীমান্ত নেই। ভারতের উপর দিয়েই তাদের সমুদ্র যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। আর একটি উদ্বেগের বিষয় হল—জঙ্গি অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার এবং জাল নোটের কারবার বৃদ্ধিতে নেপালকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তান। বাণিজ্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নেপালকে টার্গেট করে থাকে চীন। একাধিক ইস্যুতে নেপালের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত সমস্যা সৃষ্টির নেপথ্যে পাকিস্তান ও চীনের পরোক্ষ ভূমিকার বিষয়টিও বারবার চর্চায় উঠে আসে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ইউনুস সরকারও (নির্বাচিত নয়) নেপালকে চূড়ান্ত ভারত-বিরোধী করে তুলতে সক্রিয়। আসলে ভারতের সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলটিকে অশান্ত করে তোলাই মুনির-মদতপুষ্ট ইউনুস বাহিনীর মতলব। সব মিলিয়ে আজ যা হাল, কে বলবে এটাই মেঘ-কুয়াশার স্বপ্নের দেশ, বিশ্বশান্তির প্রতীক গৌতম বুদ্ধের জন্মভূমি? সামনেই দুর্গাপুজোসহ আমাদের প্রধান উৎসবের মরশুম। এই মরশুম পর্যটনেরও। পর্যটনের দফারফা হয়ে গিয়েছে। বিপর্যস্ত সীমান্ত বাণিজ্যও। তার বিরাট ধাক্কা লেগেছে এপারেও। নেপালের জেল থেকে উধাও ১৪০০ বন্দি। সব মিলিয়ে আমাদের উদ্বেগের অন্ত নেই। শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের পর নেপাল। বার্তা একটাই। মানুষকে উপেক্ষা, মানুষ শেষমেশ বরদাস্ত করে না। কেউ না পারুক, বিদ্রোহের দায়িত্ব বুক চিতিয়ে আহ্বান করবে যুবসমাজ। তারাই শেষ দেখে ছাড়বে দুর্নীতির এবং যুব সমাজকে লাগাতার অবহেলার। সুখের কথা একটাই, ভারতে গণতন্ত্রের বাঁধুনি বেশ মজবুত। তাই বিপর্যস্ত তিন প্রতিবেশীর পংক্তিতে ভারতকে এখনই বসাবার চিন্তা নিশ্চয় কেউ করে না। তবে দুর্নীতি বা অস্বচ্ছতার প্রশ্নে ভারত রাষ্ট্র যে বহুকাল যাবৎ অন্যতম এক চ্যাম্পিয়ন, তাতে সংশয় কী! তাই বাংলাসহ সমগ্র ভারত যদি এই বার্তাকে সিরিয়াসলি গ্রহণ না করে তবে আগামী দিনে আমাদের অস্বস্তি বাড়তে পারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ