ধ্যানের অধিকারী কে? আচার্য শঙ্করের মতে গীতার ষষ্ঠাধ্যায় সন্ন্যাসীর জন্য অর্থাৎ সন্ন্যাসী না হলে ধ্যানের অধিকারী হওয়া যায় না। তাঁর প্রধান যুক্তি হচ্ছে এই যে, শ্রীকৃষ্ণ যে যুগে গীতা উপদেশ করেছিলেন, তখন বর্ণাশ্রম-ধর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত; গৃহস্থরাই তখন কর্মযোগী, সন্ন্যাসীরা সর্বকর্ম ত্যাগ করে ধ্যানযোগী। গীতার ষষ্ঠাধ্যায়ের ‘আরুরুক্ষোর্মুনের্যোগং’ ইত্যাদি তৃতীয় শ্লোকটির তাৎপর্যই তাই। এছাড়া, ‘একাকী ধ্যান করবে’, ‘নির্জনে ধ্যান করবে’ ইত্যাদি শ্রীভগবানের নির্দেশগুলিও শঙ্কর স্বপক্ষ-স্থাপনে যুক্তিরূপে উপস্থাপিত করেছেন। ভাগবতের একাদশ স্কন্ধের চর্তুদশ অধ্যায় শঙ্করের হাতে পড়া যদি সম্ভব হ’ত— ভাষাতত্ত্ববিদদের মতে অসম্ভব— তাহ’লে সেখানেও ‘স্ত্রীণাং স্ত্রীসঙ্গিনাং সঙ্গং ত্যক্ত্বা দূরতঃ’ ইত্যাদি যে-সব কথা রয়েছে, তাতে শঙ্কর যে ঐ ধ্যানযোগ অধ্যায়টিও ভগবান সন্ন্যাসীদেরই জন্য বলেছেন, নিঃসন্দেহে এই মত ব্যক্ত করতেন—বিশেষতঃ সব উপদেশের শেষে যখন তিনি উদ্ধবকে বদরিকাশ্রমে তপস্যার জন্য পাঠালেন। এখন কথা এই যে, বর্ণাশ্রমধর্ম তো এখন আর নেই। যুগপ্রয়োজনে সন্ন্যাসীরাও এখন কর্মযোগী—শুধু শমদমাদি সহায়ে আত্মধ্যান নিয়েই তারা বসে নেই। প্রাচীনকালে গৃহস্থরা ঈশ্বরার্পণ—বুদ্ধিতে যে সব লোকহিতকর কর্ম করতেন, বর্তমানকালে সন্ন্যাসীরাও সেগুলি করছেন। সুতরাং কালচক্রে গার্হস্থ্য ও সন্ন্যাসের সীমারেখাই যখন পরিবর্তিত, তখন গীতা ও ভাগবতের ধ্যানযোগ শুধু সন্ন্যাসীদেরই জন্য, এ কথার স্বার্থকতা বর্তমান যুগে আছে কি? ঈশ্বরার্পণ বুদ্ধিতে লৌকিক কর্ম করেও সন্ন্যাসীরা যদি ধ্যানের অধিকারী হতে পারেন, তাহলে ঐভাবে কর্মব্য পৃত থেকে গৃহস্থদেরও ধ্যানযোগী হতে অনতিক্রমণীয় অন্তরায় আছে কি? আসল কথা, অন্তরে সন্ন্যসী হতে হবে। ঈশ্বরলাভ ছাড়া অন্য কোনও বাসনা ভেতরে থাকলে ধ্যান হবে না। বিষয়ের আকর্ষণ মনকে বহির্মুখ করবেই। যতদিন পর্যন্ত না বিষয়ে বৈরাগ্য হচ্ছে, ততদিন ধ্যানের অধিকারী হওয়া যায় না।



