বীতরাগ বিষয় চিত্তের উপর ধ্যান করা। গুরুর ধ্যান করবার সময় বেশিরভাগ ব্যক্তি গুরুর স্থূল রূপের উপরে ধ্যান করেন আর অনেক গুরু এমন করবার জন্য প্ররোচিতও করেন। অনেক স্থূলচিত্ত সাধকের জন্য এমন করা কিছু সহায়ক হতেও পারে, কিন্তু শীঘ্রই এটি হতে মুক্ত হয়ে উপরে ওঠা উচিত। গুরুর বীতরাগ বিষয় চিত্তেরই ধ্যান করা উচিত। গুরুর ধ্যান করবার সময় মূর্ত্তিভাব স্বাভাবিক রূপে মনে জাগ্রত হয়। কিন্তু গুরুর চিত্তের ভাবকেই আশ্রয় করা উচিত। বীতরাগ বিষয়ের ভাব আনন্দের ভাব, শূন্যতার ভাব ইত্যাদি লোকোত্তর অনুভবের ধ্যান করা উচিত। তবেই ইষ্টমূর্তি বা গুরুর ধ্যান সার্থক হয়। “ব্রহ্মানন্দং পরমসুখদং কেবলং জ্ঞানমূর্ত্তিম্” ইত্যাদি শ্লোকে গুরুর বীতরাগ বিষয়ের চিত্তের খুবই সুন্দর বর্ণনা আছে। সেই সবে সার্বভৌম গুরুর বর্ণনা করা হয়েছে।
স্বপ্ন বা নিদ্রা অবস্থায় যে অপূর্ব জ্ঞানলাভ হয়, কখন কখন তার অবলম্বন করলেও চিত্ত প্রশান্ত হয়ে যায়। এর সাধনা কিছু কঠিন। সামান্যতঃ স্বপ্ন বা নিদ্রাকে ক্লিষ্ট বৃত্তি মানা হয়। কিন্তু অক্লিষ্ট স্বপ্ন বা অক্লিষ্ট নিদ্রাও হতে পারে। আর এর অবলম্বন করলেও চিত্তনিরোধ সম্ভবপর হতে পারে। আরম্ভে সাত্ত্বিক নিদ্রার অভ্যাস করা উচিত। জাগ্রত অবস্থায় সাত্ত্বিক ভাব প্রবল থাকার ফলেই নিদ্রা সাত্ত্বিক হতে পারে। জপ, ধ্যান, স্বাধ্যায়, নিদিধ্যাসন, ব্রহ্মবিহার, ইত্যাদি দ্বারা জাগ্রৎ অবস্থাকে সাত্ত্বিক করা উচিত। তখন এই ভাব নিদ্রাতেও সঞ্চারিত হয়। এর পরে নিদ্রার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া দরকার। নিদ্রা আসবার সময় নিদ্রার অবলম্বন করে নিরোধ ভাবনা প্রবর্তিত করা উচিত। তখন যে স্বপ্নজ্ঞান হয়, তা হল উপনিষদে বর্ণিত বিজ্ঞানচেতনার অনুকূল। এইরকম অবস্থায় নিদ্রা হল জ্যোৎস্নালোকিত আকাশের মত। নিদ্রায় তার আভাসও পাওয়া যায়। নিদ্রায় জ্যোৎস্নার তরঙ্গ বয়। তার অবলম্বন করে চিত্তনিরোধ সম্ভবপর হয়। নিদ্রাজ্ঞান অবলম্বনের সময় জ্যোৎস্নাও বিলুপ্ত হয়। আকাশবৎ শূন্যচেতনা রয়ে যায়। সেইসময় মোক্ষভীতি দেখা দেয়, যেমন সমাধিতে হয়। এই প্রকারের শূন্যচেতনা বারম্বার আসলে পর তাতে স্বচ্ছতাপূর্বক অবস্থান করা যেতে পারে। যার স্বপ্নচেতনা প্রবল, তিনি স্বপ্নের অবলম্বন করে বিজ্ঞানভূমি লাভ করতে পারেন।
নিজের মনের মত কোনও বস্তুর ধ্যান করে চিত্তনিরোধ করা যেতে পারে। যা কিছু নিজের প্রিয় লাগে, তাতে স্বাভাবিকরূপে মন একাগ্র হয়ে যায়, ধ্যান সহজ হয়ে যায় আর ধীরে ধীরে চিত্তনিরোধ হয়ে যায়। শুরুতে কিছু বিশেষ আলম্বনের ব্যাখ্যা করে পতঞ্জলি সাধারণরূপে এই আলম্বনের বর্ণনা করেছেন। মন কোন বিষয়ে তন্ময় হয়ে গেলেও, চিত্ত তা হতে বিবিক্ত নাও হতে পারে। কেবল বিষয়ের সাথেই সংসপ্ত হয়ে যায়, এইরকম সম্ভাবনাও থাকে। এইজন্য এর উচিত প্রক্রিয়া বা technique জানবার দরকার পড়ে। অর্থ যদি পরমার্থ না হয় তো যোগ সম্ভব নয়। যথাভিমত ধ্যানের লক্ষ্য হল যে ঈশ্বরের ধ্যান তা যে কোনও প্রকারে করা যেতে পারে। কিন্তু এই ভাবনা বা ধ্যানের পরিণামে চিত্তের প্রসন্নতা আসা দরকার।
শ্রীমৎ অনির্বাণ রচিত ‘অনির্বাণ আলোয় পাতঞ্জল যোগ-প্রসঙ্গ থেকে