Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সঙ্কটে মেডিক্যাল শিক্ষা

শিক্ষার অনেক উদ্দেশ্য থাকলেও তার মধ্যে অবশ্যই প্রধান পছন্দের কেরিয়ার গড়া। অর্থাৎ ভালো কেরিয়ার তৈরি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভই বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর জীবনের লক্ষ্য। বিশ্বায়নের যুগে উচ্চশিক্ষা লাভ এবং কেরিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে অভাবনীয় বৈচিত্র্য এসেছে।

সঙ্কটে মেডিক্যাল শিক্ষা
  • ৫ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শিক্ষার অনেক উদ্দেশ্য থাকলেও তার মধ্যে অবশ্যই প্রধান পছন্দের কেরিয়ার গড়া। অর্থাৎ ভালো কেরিয়ার তৈরি করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভই বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর জীবনের লক্ষ্য। বিশ্বায়নের যুগে উচ্চশিক্ষা লাভ এবং কেরিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে অভাবনীয় বৈচিত্র্য এসেছে। তবুও মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের কাছে এখনও এক নম্বরে রয়ে গিয়েছে চিকিৎসা পেশা। এই পেশাটির প্রতি যত না আদর্শের টান, তার চেয়ে বেশি রয়েছে আর্থিক এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভের হাতছানি। স্বভাবতই, ছেলেমেয়েরা মেধাবী চিহ্নিত হলে বেশিরভাগ বাacবা-মায়ের মনের কোণে এই আকাঙ্ক্ষাই জায়গা করে নেয় যে, আমার সন্তান বড় ডাক্তার হবে। ভাষা, প্রদেশ, এমনকী পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য নির্বিশেষে এই প্রবণতা অতিসাধারণ। আমরা এও জানি যে, ঠিক এই কারণেই মেডিক্যালে (এমবিবিএস) ভর্তির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সর্বাধিক। গত একদশকে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে দেশজুড়ে অনেক নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হয়েছে। এমনকী পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলিতেও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে ছাত্র ভর্তির পরিকাঠামো। তার পরেও মেডিক্যাল ভর্তির ক্ষেত্রে হাহাকার দূর হয়নি। বরং স্কুল স্তরে পড়ুয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়ে চলেছে মেডিক্যালে ভর্তির চাহিদা। মেডিক্যাল কলেজ এবং সিট সংখ্যা বৃদ্ধি তার সঙ্গে কোনোভাবেই এঁটে উঠতে পারছে না। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে ভালো র‌্যাঙ্ক করেও দেশের প্রথম সারির মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস এবং এমডি-এমএস কোর্সে ভর্তির সুযোগ পাওয়া ভয়ানক কঠিন হয়ে গিয়েছে। ডিএম-এমসিএইচ-এর মতো শীর্ষ পাঠ্যক্রমে সুযোগ পাওয়া তো রীতিমতো সাধ্যসাধনার ফসল! ডাক্তার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নিট পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও বছর বছর বাড়ছে। 

Advertisement

আর এখানে সামনে এসেছে বিপরীত চিত্রও। পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করা গিয়েছে যে, দুর্লভ কিছু মেডিক্যাল কোর্স থেকে ছিটকে যাওয়া পড়ুয়ার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। গত পাঁচবছরে একাধিক এইমস-সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানের এগারোশোর বেশি ছাত্রছাত্রী ডাক্তারি পড়তে পড়তেই ছেড়ে দিয়েছেন! সম্প্রতি তথ্যের অধিকার আইনে সামনে এসেছে এমনই বিস্ময়কর ছবি।  দেশের জুনিয়র ডাক্তারদের শারীরিক-মানসিক অবস্থা কেমন? ইউনাইটেড ডক্টর্স  ফ্রন্ট (ইউডিএফ) আরটিআই‌ করে তা জানতে চায়। ২০২০-২৪—এই পাঁচবছরে মেডিক্যাল পড়ুয়াদের উপর র‌্যাগিংয়ের কতগুলি ঘটনা ঘটেছে? কতজন ছাত্রছাত্রী কোর্স ছাড়লেন? কতজন আত্মহত্যা করেছেন? অবসাদের জন্য ডাক্তার দেখাচ্ছেন ক’জন? কতজন ন্যূনতম ছুটি থেকে বঞ্চিত? এই সাতটি প্রশ্নের জবাবে বলা হয় যে, পাঁচবছরে ডাক্তারি পড়া ছেড়েছেন ১,১৬৬ জন। ১১৯ জন আত্মঘাতী হয়েছেন। মানসিক সমস্যা ও অবসাদ সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে ১৬৮০টি। র‌্যাগিং, হেনস্তা এবং মাত্রাতিরিক্ত কাজের চাপই এর নেপথ্যে। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশনকে উদ্ধৃত করে ইউডিএফ জানাচ্ছে, এইমস দিল্লি, ভুবনেশ্বর, নাগপুর, জিপমার পুদুচেরির মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলির তথ্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ৬২ শতাংশের বেশি তরুণ ডাক্তার এবং ডাক্তারি পড়ুয়া সপ্তাহে ৭২ ঘণ্টা কাজ করেন। ৮১ শতাংশ নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি পান না। তার ফলে তাঁদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। গত পাঁচবছরে জিপমারের ২৭৬ জন, এইমস ভুবনেশ্বরের ১২২ জন এবং এইমস নাগপুরের ৫৬ জন পিজি কোর্স ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু জিপমারেরই ২০০ জন পড়ুয়া মানসিক চাপের জন্য ডাক্তার দেখাচ্ছেন। এমনকী, ১২ জনের চিকিৎসা চলছে হাসপাতালে ভর্তি রেখে। 
ইউডিএফ মনে করে, কম বয়সি ডাক্তার এবং ডাক্তারি পড়ুয়ারা এই সিস্টেমে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছেন। এখনই এর বিহিত করা জরুরি। সংগঠন এই মারাত্মক সমস্যাটি সরকারের গোচরে আনছে। ডাক্তারদের টানা ১২, ২৪ বা ৩৬ ঘণ্টা ডিউটির রেওয়াজকে তারা সমর্থন করে না। শুধু দিনে ৮ ঘণ্টা ডিউটিরই পক্ষে ইউডিএফ। ইউডিএফের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত ব্যক্ত করেছেন রাজ্যের জুনিয়র ডাক্তার নেতা অনিকেত মাহাত। সবচেয়ে মানসিক চাপের মধ্যে আছেন মেডিক্যাল পিজিটিরা। তাঁদের একাংশ মনোবিদের পরামর্শ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। উপর্যুক্ত তথ্যের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে হবে। ডাক্তারদের দায়িত্ব দেশবাসীকে সুস্থ রাখা। কিন্তু সেই ডাক্তাররাই যদি উল্টে অসুস্থতার শিকার হন তবে তাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন কীভাবে? ১৪৪ কোটি মানুষের দেশে ডাক্তারের আকাল কতখানি তা সকলেই জানেন। সেখানে বিপুল সংখ্যক মেডিক্যাল পড়ুয়া যদি মাঝপথে পড়াই ছেড়ে দেন কিংবা পেশার প্রতি আগ্রহ উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন তবে প্রয়োজন মতো নতুন ডাক্তার মিলবে কোত্থেকে? পরিকাঠামো বৃদ্ধির সুযোগ নিতে ব্যর্থ হবে দেশ। চিকিৎসার সঙ্কট হ্রাসের বদলে নিশ্চিতভাবেই ঘনীভূত হবে তা। এই পরিস্থিতি আর মেনে নিলে সেটি কোনোভাবেই সুস্থতার লক্ষণ বলে বিবেচিত হবে না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ