এখন এদেশের কেউ আর হিন্দু নন, কেউ মুসলিম নন, কেউ শিখ নন, সকলের একটাই পরিচয়, ভারতীয়। এই মুহূর্তে প্রত্যেকের একটাই দাবি, পাকিস্তান থেকে উপড়ে ফেলতে হবে সন্ত্রাসের শিকড়। দিতে হবে উচিত শিক্ষা। যে জঙ্গিরা মুছে দিয়েছে আমাদের মা-বোনেদের সিঁথির সিঁদুর, গুঁড়িয়ে দিতে হবে তাদের ঘাঁটি। সেই লক্ষ্যেই এয়ার স্ট্রাইক। ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিখুঁত নিশানায় ধুলিসাৎ মাসুদ আজহারদের ডেরা। কাজটা সহজ হওয়ার কারণ— গোটা ভারত আজ ঐক্যবদ্ধ। এক সুতোয় বাঁধা।
‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরুর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ শুধু সময়ের অপেক্ষা। তবে যুদ্ধ থামলেও বদলাবে না ‘পাকিস্তানের মানসিকতা’। যুদ্ধ ওদের রক্তে। পাঁচ, দশ, পঞ্চাশ বছর পরে হলেও পায়ে পা দিয়ে যুদ্ধ করতে চাইবে। তাই আমাদের এমন শক্তিধর দেশ হতে হবে, যাতে ভারতের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস না পায়। তারজন্য রাজনৈতিক রং না দেখে প্রতিটি রাজ্যকে শক্তিশালী করতে হবে। কাজে লাগাতে হবে রাজ্যগুলির সম্পদ। এই ‘যুদ্ধকালীন ঐক্য’কে চোখের মণির মতো রক্ষা করতে হবে। যুদ্ধজয়ের শেষে যেন ফের সেই কানাগলিতে ঢুকে না যাই। প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষের রাজনীতি যেন আমাদের ফের অক্টোপাশের মতো আঁকড়ে না ধরে।
কেন এই আশঙ্কা? আমরা ঘরপোড়া গোরু। এই যুদ্ধ আবহেই আরও একবার হয়ে গিয়েছে বাংলাকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা। পুরীর চুরি করা কাঠেই দীঘায় জগন্নাথদেবের মূর্তি, এমন ভয়ঙ্কর অভিযোগ তুলেও পিছু হটতে বাধ্য হল ওড়িশার বিজেপি সরকার। দীঘার জগন্নাথ মন্দিরে প্রতিদিন হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ ভিড় করছেন। কেউ মুগ্ধ শিল্পকর্মে, কেউবা ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি দিতে দিতে চক্কর কাটছেন মন্দির চত্বর। বিদেশিরা মাতোয়ারা হরিনামে। এভাবেই যখন দীঘার ‘জগতের নাথে’র নতুন আবাস ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাস সমুদ্র সৈকতে আছড়ে পড়ছে, ঠিক তখনই হল পুরীর নিমকাঠ চুরি বিতর্কের অবতারণা।
একথা ঠিক, পুরীর দয়িতাপতি জগন্নাথদেবের মূর্তির অবশিষ্ট কাঠের প্রসঙ্গ না তুললে এই বিতর্ক তৈরি হতো না। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, স্রেফ একজনের মুখের কথায় গেরুয়া শিবির বাংলার বিরুদ্ধে এমন মারাত্মক অভিযোগ তুলল কী করে? কাক কান নিয়ে গিয়েছে শুনে কাকের পিছনে দৌড়ানো কি বিবেচকের কাজ? অভিযোগ সত্যি-মিথ্যে যাচাইয়ের জন্য খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হতো না। জগন্নাথদেবের মূর্তির অবশিষ্ট নিমকাঠ রাখার ঘরটি খুলে দেখলেই ঝামেলা চুকে যেত। কিন্তু সে রাস্তায় বিজেপি হাঁটেনি। কারণ বাংলায় জলঘোলা করাই তাদের উদ্দেশ্য।
তার প্রমাণ আছে বিস্তর। কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হানা ঠেকাতে পারেনি কেন্দ্রীয় সরকার। সেই ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতে বাংলায় শুরু হয় জঙ্গি খোঁজা। নদীয়ার কৃষ্ণনগরের ভাণ্ডারখোলা পঞ্চায়েত এলাকার এক যুবকের পোস্ট করা ছবি দেখেই বিজেপি নেতারা ধরে নিলেন, সে জঙ্গি। সেই বার্তা রটিয়ে দেওয়া হল সোশ্যাল মিডিয়ায়। তা দেখে গভীর রাতে ছুটে এল এনআইএ। কিন্তু ফিরতে হল খালি হাতে। কারণ অভিযোগ মিথ্যে।
দীঘায় জগন্নাথ মন্দির হওয়ায় বিজেপির খুশি হওয়ারই কথা। সেখানে প্রভু জগন্নাথের পুজো হবে। কিন্তু বিজেপি খুশি হওয়ার বদলে বিরোধিতা শুরু করল। এসব দেখে অনেকেই বলছেন, বিজেপি মুখে হিন্দু ধর্মের কথা বললেও তাদের কাছে হিন্দু স্রেফ ‘ভোটার’। তাই অন্য কোনও দল হিন্দুর হয়ে কথা বললেই তাদের গা জ্বলে।
দীঘায় জগন্নাথ মন্দির অন্য কোনও সংস্থা করলে বিজেপি এত ছটফট করত না। কিন্তু করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাতে তাঁকে ‘হিন্দু বিরোধী’, ‘মুসলিম তোষণকারী’ এই প্রচার বিজেপি করতে পারছে না। করলেও কেউ মানবে না। মন্দিরের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ হয়নি, চাঁদা দিতে হয়নি। উল্টে এলাকার হোটেল মালিক থেকে সমস্ত ব্যবসায়ী খুশি। কারণ লক্ষ্মীলাভের পরিমাণ বৃদ্ধি। কেবল এসবিএসটিসির দৈনিক টিকিট বিক্রি বেড়েছে এক লক্ষ টাকার। এতদিন দীঘা ছিল শুধুই পর্যটন কেন্দ্র। মানুষ কেবল বেড়াতেই আসতেন। জগন্নাথ মন্দির হওয়ায় দীঘা হয়ে উঠেছে ‘ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র’। একইসঙ্গে পাওয়া যাবে প্রভু জগন্নাথদেবের দর্শনের ও সমুদ্র উপভোগের আনন্দ।
দীঘায় জগন্নাথ মন্দির হওয়ায় ওড়িশার বিজেপি সরকারের কপালের ভাঁজ স্পষ্ট। কারণ পুরীর পর্যটন ব্যবসার অনেকটাই বাংলার উপর নির্ভরশীল। ট্রেনের টিকিট পাওয়ার সমস্যা তো আছেই। তার সঙ্গে রয়েছে খরচের ধাক্কা। তা সত্ত্বেও প্রতি বছর বাংলা থেকে কাতারে কাতারে মানুষ জগন্নাথ দর্শন ও সমুদ্র উপভোগ করতে পুরী যায়। দীঘায় জগন্নাথ মন্দির হওয়ায় সেই ভিড়ে কিছুটা ভাটা পড়বেই। বাংলার অনেকের গন্তব্যই এখন পুরীর বদলে হবে দীঘা। তাতে দীঘার অর্থনীতির উন্নতির সম্ভাবনা প্রবল। ইসকন কর্তৃপক্ষকে মন্দির দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়াটা বাংলার অর্থনীতির হাল ফেরানোর ক্ষেত্রে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হতে পারে।
গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছেন ইসকনের ভক্ত। সেই সুবাদে দীঘায় বিদেশি ভক্তদের আসা-যাওয়া বাড়বে। দীঘায় রয়েছে প্রচুর বড় বড় হোটেল, যা বিদেশিদের থাকার উপযুক্ত। দরকার একটা ছোটখাটো বিমানবন্দর। তাহলেই বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নেবে দীঘা।
জগন্নাথদেবের দারুমূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন পুরীর দয়িতাপতিরা। কিন্তু পুজোর দায়িত্বে রয়েছে ইসকন কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্ভবত বাংলার উন্নতির কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইসকনের ভক্তদের অনেকেই প্রচুর ধনী এবং প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি। তাঁরা ইসকনের হাত ধরে এই সমুদ্র সৈকতে পা রাখলে খুলে যেতে পারে শিল্পের দরজাও। কাছেই সমুদ্র বন্দর। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সুলভ শ্রমিক, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, খড়্গপুর আইআইটির পেশাদারিত্ব, সব মিলিয়ে আগামীতে শিল্পস্থাপনের গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে পূর্ব মেদিনীপুর।
বিজেপির দূরদর্শীরা হয়তো দূরটা দেখতে পাচ্ছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, দীঘার জগন্নাথ মন্দিরকে ভারতবর্ষের আর দশটা মন্দিরের মতো ভাবলে ভুল হবে। অবস্থানগত সাদৃশ্য এবং নিখুঁত নির্মাণের সৌজন্যে পুরীর সঙ্গে দীঘার তুলনা চলে আসবেই। দিন যত যাবে এই তুলনা বাড়বে। ফার্স্ট একবার সেকেন্ড হলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না বলা কঠিন, কিন্তু মনোবল চুরমার হবেই। তাই কি পরীক্ষার আগেই প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটানোর মরিয়া চেষ্টা!
দীঘায় জগন্নাথ মন্দির তৈরিতে বিজেপির প্রবল বাধা দেখে এক ব্যক্তির সরস মন্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীঘাকে যখন ‘গোয়া’ বানানোর কথা বলেছিলেন, তখন বিদ্রুপের হাসি হেসেছিল বিজেপি। কিন্তু জগন্নাথ মন্দির বানিয়ে তিনি যে ‘পুরী’কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবেন, সেটা কল্পনাও করতে পারেনি।’ এই জন্যই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আনপ্রেডিকটেবল।’
দেশের সঙ্কটকালে রাজনৈতিক মতপার্থক্য হয়ে যায় মূল্যহীন। বিজেপির সঙ্গে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই করে টিকে থাকা মানুষটির নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ে প্রথম সারিতে তাঁর অবস্থান। কিন্তু সর্বদলীয় বৈঠকের অনেক আগেই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাতেই থাকবে তাঁর পূর্ণ সমর্থন।
‘অপারেশন সিন্দুর’ নামের মধ্যে আবেগ, চমক থাকলেও এয়ারস্ট্রাইক নিয়ে কারও কোনও সংশয় ছিল না। পাকিস্তান পহেলগাঁওয়ে যে পৈশাচিক অপরাধ সংগঠিত করেছে তার জন্য চরম শাস্তিই তাদের প্রাপ্য। উচিত শিক্ষা দেওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল গোটা দেশ। পাল্টা প্রত্যাঘাতে ছিল না কোনও বিস্ময়। ১৪০ কোটির দেশ বিস্মিত হল তখনই যখন ‘অপারেশন সিন্দুরে’র ব্রিফিংয়ে টিভির পর্দায় ভেসে উঠল দুই নারীর মুখ। একজন মুসলিম, অন্যজন হিন্দু। এ-যেন একই বৃন্তে দু’টি কুসুম। কর্নেল সোফিয়া কুরেশি ও উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিং বিশ্বকে জানালেন কীভাবে নেওয়া হয়েছে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হানার বদলা। হ্যাঁ, এটাই আসল ভারতবর্ষ। এই ঐক্য যেন শুধু যুদ্ধকালীন না হয়, বজায় থাক চিরদিন।