Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পিএফ পুরো ঝঞ্ঝাটমুক্ত হোক

বেসরকারি কোম্পানি বা সংস্থার গড়পড়তা শ্রমিক-কর্মচাীরদের বেতন সাধারণভাবে কম। তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। তার উপর অবসরকালীন প্রাপ্তি বেশ কম এবং পর্যাপ্ত পেনশনেরও সংস্থান তাঁদের নেই।

পিএফ পুরো ঝঞ্ঝাটমুক্ত হোক
  • ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বেসরকারি কোম্পানি বা সংস্থার গড়পড়তা শ্রমিক-কর্মচাীরদের বেতন সাধারণভাবে কম। তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। তার উপর অবসরকালীন প্রাপ্তি বেশ কম এবং পর্যাপ্ত পেনশনেরও সংস্থান তাঁদের নেই। তাঁদের একমাত্র এবং শেষ ভরসা বলতে ভবিষ্যনিধি তহবিল। কর্মজীবনে একাধিক জরুরি প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষে এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইপিএফ) থেকে কিছু টাকা তোলা যায়। তবে বেশিরভাগ সদস্যই চেষ্টা করেন কর্মজীবনে ওই তহবিলে হাত না দিতে। কারণ কর্মজীবনে ওই তহবিলের আংশিক টাকা ভোগ করে ফেললে অবসরকালীন সুবিধা অনেকটাই কমে যায়। অর্থাৎ অবসর জীবনে একটু ভালো থাকার আশায় শ্রমজীবী মানুষ কর্মজীবনে রীতিমতো কৃচ্ছ্রসাধন করেন। তবুও দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ে না অনেকের। অবসরগ্রহণের পরেও ইপিএফ-এ সঞ্চিত টাকা সকলে সময়মতো তুলতে পারেন না। অথচ সেখানে তাঁদের পুরো কর্মজীবনে আবশ্যিক সঞ্চয়ের মূল অর্থ এবং তার উপর অর্জিত সুদ জমা হয়। বস্তুত এই টাকাগুলিই একজন সাধারণ শ্রমিক বা কর্মচারীর শেষ আর্থিক সম্বল। এজন্যই ইপিএফ-কে ভবিষ্যনিধি তহবিল বলা হয়। তবু এই হকের পাওনা তুলতে গিয়ে অনেকেই বাধার মুখে পড়েন এবং তাঁদের দুর্ভোগ বাড়ে। এই বাধার নেপথ্যে কিছু প্রশাসনিক জটিলতা। ইপিএফও কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় ২১ লক্ষ ৫৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর বা গ্রাহকের টাকা আটকে আছে। সেই টাকা তাঁরা তুলতে পারছেন না। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কাউন্সিলের তথ্য বলছে, ওই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা! কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বহু গ্রাহকের পিএফের ইউনিক নম্বরের সঙ্গে আধার যোগ হয়ে ওঠেনি। গ্রাহকের অর্থ হস্তান্তরে, এই সংযুক্তি না-হওয়াটা এখনও বড়ো সমস্যা। ফলে গ্রাহকের পিএফ ক্লেম প্রাপ্তির সমস্যা দূর হয়নি। গ্রাহকের হয়রানি দূর করতে ক্লেম মেটাবার অনলাইন পরিষেবা চালু করা হয়েছে অনেক আগেই। তারপরও সমস্যাটি যে অনেককাংশেই রয়ে গিয়েছে তা মানছে দপ্তর। 

Advertisement

সুখবর এই যে, অবশেষে এই সমস্যার সুরাহা করতে উদ্যোগী হল এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (ইপিএফও)। তারা জানিয়েছে, কোনও অজুহাতেই আর পিএফ গ্রাহকের প্রাপ্য আটকে রাখা যাবে না। পুরোটা না-হলেও অবসরের সময় পিএফের আংশিক প্রাপ্য মিটিয়ে দিতে হবে। চূড়ান্ত হিসেবনিকেশের পর না-হয় বাকি টাকা মেটানো যাবে। প্রাথমিক প্রয়োজন অবসরগ্রহণকালেই মেটাতে হবে ইপিএফও-কে। পিএফ কর্তৃপক্ষ নিজেই স্বীকার করেছে, অনেক গ্রাহকের কর্মদাতা সংস্থা তাদের অংশের টাকা নিয়মিত জমা করে না। কখনও আবার জমা পড়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের কম টাকা। কর্মক্ষেত্র বদলের ক্ষেত্রে পুরোনো সংস্থার পিএফ অ্যাকাউন্ট ‘ট্রান্সফার’ হয়ে যাওয়ার কথা। সেটাও অনেকের ক্ষেত্রে হয় না। আবার ট্রান্সফারের কাজটি হয়ে থাকলেও দেখা যায়, পূর্বেকার সংস্থা তাদের অংশের টাকা নিয়মিত জমা করেনি। অবসরের পর পিএফ জমার অর্থ প্রাপ্তির সমস্যার নেপথ্যে এরকম একাধিক কারণ ইতিমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছে। আর এই কারণকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করেই, কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকের হকের পাওনা মেটাতে পিএফ কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি অস্বীকার করে। 
এই সমস্যা থেকে গ্রাহকদের মুক্তি দিতেই পিএফের সমস্ত আঞ্চলিক অফিসকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছে ইপিএফও। কর্তৃপক্ষের নির্দেশ, গ্রাহকের সব টাকা কোনোভাবেই আটকে রাখা যাবে না। পিএফ অ্যাকাউন্টে সেইদিন পর্যন্ত যত টাকা জমা রয়েছে, তা দিয়ে দিতে হবে গ্রাহককে। বাকি টাকার জন্য হিসেবনিকেশ পরে চলতে পারে এবং সেইমতোই হবে চূড়ান্ত মীমাংসা। গ্রাহকদের স্বার্থে পিএফ কর্তৃপক্ষ আরও একটি নতুন নিয়ম এনেছে। এখন থেকে ‘ট্রান্সফার সার্টিফিকেট’ জমা করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট গ্রাহকই। এই সার্টিফিকেট আগে পুরোনো সংস্থাই পাঠাত। নয়া নিয়মে সেই জটিলতা কেটেছে। বলা হয়েছে, পিএফ গ্রাহক অনলাইনে তাঁর ‘মেম্বার পোর্টাল’ থেকে নিজেই ‘ট্রান্সফার সার্টিফিকেট’ তুলে নিতে পারবেন। আধার সংযুক্তিসহ যে অল্প কয়েকটি সমস্যা এখনও রয়ে গিয়েছে, সেগুলিরও সুরাহা দ্রুত করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। কারণ তাদের এই উদ্যোগের উপরেই অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের ভালো থাকা বা না-থাকা নির্ভর করছে। তাঁদের ভদ্রস্থ পেনশনের দাবি আজও মেটেনি। কবে মিটবে কিংবা আদৌ কোনোদিন মিটবে কি না, তা কেউ জানেন না। ওইসঙ্গে যদি পিএফের টাকা তোলার ক্ষেত্রেও বাধা রয়ে যায়, তবে তাকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা ছাড়া আর কীই-বা বলা যাবে? সরকারি প্রশাসনের এই ব্যর্থতা একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের বিপরীত ব্যবস্থা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ