Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

তিস্তাবুড়ি পুজোয় মিশে গিয়েছে উত্তরের জেলার বহু জনগোষ্ঠী

নদীমাতৃক ভারতবর্ষে নদীকে কেন্দ্র করে গ্রাম-গঞ্জ, শহর-নগর গড়ে ওঠার ইতিহাস বহু পুরনো। সেই ধারা এখনও বহমান। নদীর সঙ্গে মিশে গিয়েছে লোকসংস্কৃতি, বিশ্বাস, ভয় ও পুজো।

তিস্তাবুড়ি পুজোয় মিশে গিয়েছে উত্তরের জেলার বহু জনগোষ্ঠী
  • ১৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পবিত্র বর্মন, শিলিগুড়ি: নদীমাতৃক ভারতবর্ষে নদীকে কেন্দ্র করে গ্রাম-গঞ্জ, শহর-নগর গড়ে ওঠার ইতিহাস বহু পুরনো। সেই ধারা এখনও বহমান। নদীর সঙ্গে মিশে গিয়েছে লোকসংস্কৃতি, বিশ্বাস, ভয় ও পুজো। উত্তরবঙ্গের তিস্তাকে কেন্দ্র করে এখানকার জনমানস তৈরি করে ফেলেছেন তিস্তাবুড়ি পুজো। মূলত চৈত্র মাস ও বৈশাখের প্রথম দিকে উত্তরবঙ্গের কোচ-রাজবংশী সমাজ, বিহার, অসম ও নেপালের কিছু অংশের রাজবংশী মানুষ গ্রীষ্মকালের আগে কালবৈশাখী ও ভয়াল বন্যা থেকে বাঁচতে তিস্তাবুড়ির (বুড়ি অর্থে দেবী বা ঠাকুরানি) পুজো করেন। এই পুজোর গানকে রাজবংশীরা মেচেনি গান বলেন। এই মেচেনি গানে মিশেছে উত্তরের প্রাণের গান ভাওয়াইয়ার সুর। এটি মূলত নারীকেন্দ্রিক ব্রতগান। এই মেচেনি গানে কোনও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হয় না। হাতের তালিতেই গানের লয় ধরে রাখা হয়।

Advertisement

নানা ভাষা ও জনগোষ্ঠীর বসবাস উত্তরবঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই কোচ-রাজবংশীদের তিস্তাবুড়িকে আপন করে নিয়েছেন তরাই অঞ্চলের আদিবাসী সমাজও। মুন্ডা, ওরাওঁ জনগোষ্ঠীও চৈত্র ও বৈশাখ মাসে এই পুজো করে। তবে অন্য নামে। তাঁরা বলেন, গঙ্গাপুজো। রীতিনীতি ও পুজোর ধরন একই। 
মহিলারাই মূলত এই পুজো করেন। নদীর পাড়ে মহিলারা কলার ‘গেরা’ (ভেলা) বানিয়ে পুজো দেন। পুজো শেষে সেই গেরা নদীর জলে ভাসিয়ে দেন। তার আগে অবশ্য দেবীকে ‘হাট ঘুরিয়ে’ আনা হয়। পুজোয় নৈবেদ্য হিসেবে থাকে চিঁড়ে, টকদই, কলা, গুড়, হাঁসের ডিম ইত্যাদি। পুজো শেষে মহিলারা নদীর পাড়ে বসে দই, চিঁড়ে খেয়ে বাড়ি ফেরেন।
পুজোর দিন মহিলা সকাল থেকে উপোস থাকেন। মাটিগাড়ার আলো রায়, বাসন্তী বর্মনরা বলেন, দল বেঁধে তাঁরা একটি ছাতাকে বেলপাতা, জবাফুলে সাজিয়ে দেবী রূপে কল্পনা করে বাড়ি বাড়ি ঘোরেন। ছাতার নীচে একটি পাত্রে আতপ চালের টোপলা বেঁধে রাখা হয়। দুপুরে হাট ঘুরে মহিলারা নিজের এলাকার নদীর পাড়ে জমায়েত হন। 
বেশীরভাগ জায়গায় এই দেবী নিরাকার হলেও জলপাইগুড়ি, ধূপগুড়ির মতো জায়গায় মূর্তি বানিয়ে পুজো হয়। তবে তরাই ও ডুয়ার্সের বেশীরভাগ অঞ্চলে মহিলারা কলার ভেলা বানিয়ে তিস্তাবুড়ির পুজো দেন। পুজোয় মহিলাদের সহযোগিতা করেন পুরুষরাও।
পুজোর উদ্দেশ্য, সংসারের মঙ্গল কামনা ও ঝড় ঝঞ্ঝা থেকে পরিবারকে রক্ষা করা। 
অনেকের মতে, এই তিস্তাবুড়ি পুজোর সঙ্গে জলপাইগুড়িতে তিস্তার ভয়ঙ্কর বন্যার প্রেক্ষাপট যুক্ত রয়েছে। ইতিহাস বলে, ১৯৬৮ সালে তিস্তায় ভয়াবহ বন্যা হয়। তিস্তাপাড়ের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। বহু মানুষের মৃত্যু হয়। বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই তিস্তাকে সন্তুষ্ট করতে এই পুজোর প্রচলন বলে অনেকে বলে থাকেন।
বহু বছর ধরে এই পুজো করে আসছেন মাটিগাড়ার তিবিল ওরাওঁ, সুমতি ওরাওঁ, যুগুন মুন্ডা, রাজু সোরেনরা।  তিবিল ওরাওঁয়ের কথায়, বহু বছর ধরে আমরা এই পুজো করি। রাজবংশীরা ওদের মতো করে করে। আমরা আমাদের মতো করে করি। 
এ থেকে পরিষ্কার, উত্তর-পূর্ব ভারতে জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে এক বৃহৎ বলয়ের লৌকিক দেবী এই তিস্তাবুড়ি।  ফাইল চিত্র।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ