চিকিৎসা একটি অতিপ্রাচীন পেশা। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পরিষেবাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলেছে মানবসভ্যতা। বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু অনেকটাই বেড়েছে। এর পিছনে চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং পরিবেষবার অবদান অনস্বীকার্য। এই বিজ্ঞান এবং পরিষেবা বিগত কয়েক শতাব্দীতে কয়েকটি মারাত্মক মহামারীর মোকাবিলা করেছে এবং নির্মূল করেছে একাধিক প্রাণঘাতী রোগব্যাধি। বহু রোগ, জীবাণু, ফাঙ্গাস, ভাইরাস প্রভৃতির সঙ্গে নিরন্তর লড়াই জারি রয়েছে মানুষের। এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের হাতিয়ার হল চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং পরিষেবা। তবু অসুখবিসুখের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই সহজ হয়ে যায়নি, বরং প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে তা কঠিনতর হচ্ছে। লড়াইটা কঠিন করে তুলছে জীবাণু, ভাইরাস প্রভৃতির বেঁচে থাকার পরিবর্তিত কৌশল। এজন্য চিকিৎসা কৌশল এবং ওষুধ তৈরিতেও আনা হচ্ছে নিরন্তর বদল। সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে চিকিৎসা পদ্ধতি। এখানেই ডাক্তারদের দিতে হয় মুনশিয়ানার পরীক্ষা। চিকিৎসায় সেরা সাফল্য পেতে তাঁদেরকে সময়োগযোগী হয়ে উঠতেই হয়। প্রকৃত মেধাবী এবং সৎ, সেবাপরায়ণ ব্যক্তিরাই ভালো ডাক্তার হবেন বলে মনে করা হয়।
তাই হবু ডাক্তার বাছাইয়ে সার্বিক স্বচ্ছতা সবসময় কাম্য। সমাজ চায়, শুধুমাত্র যোগ্য ছেলেমেয়েরাই ডাক্তারি পড়বেন। এই মহৎ পেশায় অযোগ্যরা যেন কোনোভাবেই অনুপ্রবেশ করতে না-পারে, সেটা গোড়াতেই নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত, অসৎ উপায়ে প্রবেশিকা পরীক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করে কিংবা স্রেফ টাকার জোরে কিছু ক্যান্ডিডেট মেডিক্যাল কলেজে ঢুকে পড়লে তার চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছু হবে না। মধ্যপ্রদেশে ‘ব্যাপম’ কেলেঙ্কারি হল—দেশে অস্বচ্ছতার নীতিতে মেডিক্যাল ভর্তির নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত। পূর্ণ স্বচ্ছতার নীতিতে দেশজুড়ে মেডিক্যাল ভর্তির আশ্বাস দিয়েই নিট-ইউজি প্রবেশিকা চালু করেছে মোদি সরকার। কিন্তু এই পদ্ধতি কি যোগ্য ডাক্তার তৈরি করতে আদৌ সক্ষম? চোখ রাখা যাক অভিন্ন পরীক্ষা নিট-ইউজির সদ্য প্রকাশিত ফলাফলের উপর। পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে মোট ৭২০ নম্বরের। অসংরক্ষিতদের ক্ষেত্রে কাট অফ মার্কস ছিল ১৪৪ (বা ২০ শতাংশ)। কাট অফ মার্কস ১১৩ (বা ১৫.৭ শতাংশ) ছিল সংরক্ষিতদের জন্য। এই সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় মোট ১২ লক্ষ ৩৬ হাজার ৫৩১ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। আগামী দিনে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে থেকেই বাছাই করা হবে ভবিষ্যতের ডাক্তারদের। কিন্তু সত্যিই কি তাঁরা যোগ্য? নিটের মাধ্যমে সত্যিই কি তাঁদের মেধা যাচাই হয়েছে? নাকি এটা আসলে দেশের প্রায় ৩৫০ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের ‘ব্যবসা’ বজায় রাখতে মোদি সরকারের কৌশলমাত্র? এমনই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে নিট ইউজির ‘রেজাল্ট’ সামনে আসতেই। কারণ, সাধারণত যেকোনও স্কুল বোর্ডের পরীক্ষায় পাশ করার জন্য ৩০-৩৫ শতাংশ নম্বর পাওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু নিট ইউজির ক্ষেত্রে এমন নিয়ম নির্দিষ্ট করা হয়নি। শুধুমাত্র অসংরক্ষিত শ্রেণির পরীক্ষার্থীদের ৫০ পার্সেন্টাইল পেতেই হয়। সেটি সংরক্ষিতদের ক্ষেত্রে ১০ পার্সেন্টাইল কম বা ৪০।
কিন্তু এই নতুন পার্সেন্টাইল পদ্ধতি ঊহ্য রাখা হলে, দেখা দরকার ‘উত্তীর্ণরা’ ঠিক কত নম্বর পেয়েছেন? এই হিসেবে দেখা যাচ্ছে—তাঁদের অর্ধেকই ‘কোয়ালিফায়েড’ বা ডাক্তারি পড়ার ‘যোগ্য’ বলে নির্বাচিত হয়ে গিয়েছেন মাত্র ১৫-৩৪ শতাংশের মধ্যে নম্বর তুলে! সংখ্যার বিচারে তাঁরা কত? ভাবা যায়, ৬ লক্ষ ৩৫ হাজার! এক বিবৃতিতে এমনই বিস্ময়কর তথ্য সামনে এনেছে খোদ নিট আয়োজক সংস্থা এনটিএ। অসংরক্ষিত শ্রেণিতে কাট অফ মার্কস ছিল ১৪৪। ৩ লক্ষ ৩ হাজার ৪০ জন পেয়েছেন ১৪৪ থেকে ২০০ নম্বর। ২০১ থেকে ২৫০ নম্বর পেয়ে পাশ করেছেন প্রায় ২ লক্ষ পরীক্ষার্থী। এখানেই শেষ নয় এসসি, এসটি, ওবিসি, ইডব্লুএস, বিশেষভাবে সক্ষম প্রভৃতি আটধরনের সংরক্ষিত শ্রেণির জন্য কাট অফ মার্কস ছিল কোথাও ১২৭, কোথাও ১২৬, কখনও ১১৩! অর্থাৎ মাত্র ১৫-২০ শতাংশ পেয়েও ‘পাশ’ করেছেন প্রায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজার ৩৮০ জন! এই ‘কারবার’ কি আমাদের ন্যূনতম প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা কোনোভাবে স্বস্তি দিতে পারে? অনেকের মতে, এমবিবিএস আসন সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছে। সম্ভবত তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ‘কোয়ালিফায়েড’ পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ‘ব্যবস্থা’র নামে এই ‘অব্যবস্থা’ আমাদের চিন্তায় রেখেছে বইকি! পার্সেন্টাইল নয়, পার্সেন্টেজকেই গুরুত্ব দিয়ে মেধা যাচাইয়ে অবিলম্বে ফেরা দরকার। না-হলে চিকিৎসা পরিষেবায় ভারত আগামী দিতে অথই জলে পড়ে যেতে পারে। তার মূল্য চোকাতে হবে সকলকেই।