Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পথে মমতা, বিপদ বাড়ল বঙ্গ বিজেপির

রানাঘাট লোকসভা আসনে দু’ দু’বার জিতেছে বিজেপি। সেই কেন্দ্রের অন্তর্গত ধানতলা থানার পূর্ব নওয়াপাড়ায় মিলন কুণ্ডুর হার্ডওয়ারের দোকান। সেখানে সান্ধ্যকালীন আড্ডায় আলোচনার বিষয়, এসআইআর।

পথে মমতা, বিপদ বাড়ল বঙ্গ বিজেপির
  • ২ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: রানাঘাট লোকসভা আসনে দু’ দু’বার জিতেছে বিজেপি। সেই কেন্দ্রের অন্তর্গত ধানতলা থানার পূর্ব নওয়াপাড়ায় মিলন কুণ্ডুর হার্ডওয়ারের দোকান। সেখানে সান্ধ্যকালীন আড্ডায় আলোচনার বিষয়, এসআইআর। পুরো নাম না জানলেও বঙ্গ বিজেপির হুঙ্কারের জেরে স্কুলের চৌহদ্দিতে পা পড়েনি যাঁদের তাঁরাও জেনে গিয়েছেন ‘এসআইআর’ কী! খেতমজুর গোপাল বাগচির তেমন পড়াশোনা নেই। কিন্তু মোবাইল আর টিভির দৌলতে তিনিও বুঝতে পারছেন, এসআইআর তাঁদের জন্য নতুন আতঙ্ক। মানুষের মনে তৈরি হয়েছে চরম অস্থিরতা। আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে গোপালবাবুর মধ্যেও। বললেন, ‘আমার নাম ভোটার তালিকায় উঠেছে ২০০২ সালের আগেই। অনেকে বলছে, আমার নাকি ভয় নেই। কিন্তু না আঁচানো পর্যন্ত বিশ্বাস নেই।’ 

Advertisement

দোকানের মালিক মিলনবাবু বললেন, ‘নির্বাচন কমিশন আধার কার্ড, ভোটার কার্ড বা রেশন কার্ডকে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে ধরুক। তাহলেই কেটে যাবে অস্থিরতা। মানুষ স্বস্তি পাবে। আর সেটা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল।’ পাশে দাঁড়ানো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সুবল বাগচির বক্তব্য, ‘টার্গেট হয়তো সংখ্যালঘুরা। কিন্তু বিপন্ন বোধ করছেন হিন্দুরাও। কারণ সামনে রয়েছে অসমের দৃষ্টান্ত। সেখানে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ডিটেনশন ক্যাম্পে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সেই সব ভেবেই দুশ্চিন্তার পাথর বুকে নিয়ে বসে আছে সীমান্ত এলাকার ছিন্নমূল মানুষ। রাতের ঘুম চলে গিয়েছে। খেটেখাওয়া লোকজনের পেটের ব্যবস্থা করতেই দিন কেটে যায়। তাঁরা এতসব কাগজ জোগাড় করবেন কী করে?’
এই আতঙ্ক শুধু নদীয়ার নয়, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী প্রতিটি জেলার। বিহারে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশনের তথ্য লক্ষ লক্ষ বাঙালির কপালে ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। খসড়া তালিকা মোতাবেক বিহারে মোট ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যাচ্ছে। তারমধ্যে মৃত ২২ লক্ষ। আর ৩৬ লক্ষ নাকি বিহার থেকে পাকাপাকিভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন! তবে, নাম বাতিলের এই সাফাই বিহারের ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের বিরুদ্ধে একটা মারাত্মক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কী সেই প্রশ্ন? এক বছরের মধ্যে ৩৬ লক্ষ ভোটার বিহার ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন? কিন্তু কেন? ডাবল ইঞ্জিন সরকার কি তাঁদের কাজ দিতে পারেনি, নাকি বিজেপির জোট সরকারের প্রতি মানুষ বীতশ্রদ্ধ! 
এসআইআর ইস্যুতে বাংলাতেও একই ঘটনা ঘটবে। নাম বাদ দেওয়ার ব্যাপারে বিএলওদের সতর্ক করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। কিন্তু, সবটা কি বিএলওদের হাতে থাকবে? তাঁরা ঠিকঠাক রিপোর্ট দিলেও ভোটারলিস্টে নাম থাকবে, এই গ্যারেন্টি দেওয়া কঠিন। কারণ বাংলায় কত নাম বাদ যাবে, তার হিসেব বঙ্গ বিজেপির নেতারা আগাম দিয়ে রেখেছেন। সংখ্যাটা ভিন্নভিন্ন হলেও নেতাদের সুর এক। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, নাম বাদ দেওয়ার আবেদনপত্র জমা পড়বে প্রচুর। সেটা বুঝতে পেরেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই প্রতিবাদে নেমেছেন রাস্তায়। শুরু করেছেন মিটিং, মিছিল। জনস্রোত বইছে রাস্তায়। বাজছে রবীন্দ্রনাথের গান, ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল’। বাংলার মাটি আন্দোলনের মাটি। সেই আন্দোলনের ফসল কী করে ঘরে তুলতে হয়, সেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ে কে আর ভালো জানেন?
জনভিত্তি যত দুর্বল হয় রাষ্ট্রীয় শক্তির আস্ফালন ততই বাড়ে। এটাই বাস্তব। সিবিআই, ইডির মতো প্রতিষ্ঠানগুলি নামে স্বশাসিত। কিন্তু কাজ করে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে। কংগ্রেস যখন দিল্লির ক্ষমতায় ছিল, তখন তারাও একইভাবে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে বিরোধীদের শায়েস্তা করার কাজে লাগাত। সেই কারণেই সুপ্রিম কোর্টের চোখে সিবিআই হয়েছিল ‘খাঁচায় বন্দি তোতা পাখি’। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির রাজত্বে রাজ্যপাল সহ অধিকাংশ সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং এযাবৎ স্বাধীনভাবে কাজ করে আসা সংস্থাগুলিও ‘তোতা পাখি’র মতো আচরণ করছে। তাতে বিজেপির কতটা লাভ হবে, সেটা সময় বলবে। কিন্তু একটা প্রশ্ন জাগছে, এভাবে চললে ভারতবর্ষ সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে তো?
স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন সাধারণত ২০ বছর অন্তর হয়। তাই এসআইআর নিয়ে হইচই হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধনের সঙ্গে বিজেপি নেতাদের ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা খেদাও’ হুঙ্কারে। গেরুয়া শিবিরের ধারণা, এতে সনাতনি হিন্দুরা উৎসাহিত হবেন এবং বিজেপির ভোটবাক্স ভরিয়ে দেবেন। কিন্তু এসব করে বঙ্গ বিজেপি নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারছে। 
বিগত কয়েকটি নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট, মুসলিম ভোট প্রায় একচেটিয়াভাবে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে। পঞ্চায়েত ভোটে কয়েকটি সংখ্যালঘু এলাকায় কংগ্রেস এবং সিপিএম সাফল্য পেয়েছে। তার কারণ ব্যক্তিগত রেষারেষি। কিন্তু সাধারণ নির্বাচনে সেই ভোট আবার তৃণমূলের দিকেই যায়। বিশেষ করে বিধানসভা ভোটে। তাই সংখ্যালঘুরা যেসব কেন্দ্রের ভাগ্য নির্ধারণ করেন, সেখানে জেতে তৃণমূলই। 
অন্যদিকে বিজেপি মূলত সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতেই সাফল্য পায় বেশি। বিজেপির সেই জয়ের পিছনে রয়েছেন ওপার বাংলা থেকে এ রাজ্যে আসা হিন্দুরা। তাঁদের বেশিরভাগই পদ্মপার্টির সমর্থক। তার কারণ, বাংলাদেশ থেকে এ রাজ্যে আসা হিন্দুদের বেশিরভাগই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে এসেছেন। তাই মুসলিমদের বিরুদ্ধে কথা বললেই সেই দলের সঙ্গে তাঁরা একাত্মতা বোধ করেন। কিন্তু, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি নেতৃত্ব ভোটার তালিকা সংশোধনের সঙ্গে অনুপ্রবেশের বিষয়টি জুড়ে দেওয়ায় বদলে যেতে পারে সীমান্ত এলাকার রাজনীতির সমীকরণ। 
বাংলায় কথা বলার জন্য বিজেপি শাসিত রাজ্যে যাঁদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে অত্যাচার চালানো হয়েছে তাঁরা সবাই মুসলিম নন। অত্যাচারিতের মধ্যে অনেক হিন্দুও রয়েছেন। এমনকী, মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষও আছে। বিজেপির বিপদটা এখানেই।
বিগত কয়েকটি নির্বাচনে নাগরিকত্বের ‘গাজর’ ঝুলিয়ে বিজেপি মতুয়া ভোটারদের সমর্থন আদায় করেছে। একুশে তো বটেই চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনেও তার প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যেভাবে নাগরিকত্ব যাচাই চলছে তা বিজেপির জন্য ব্যুমেরাং হতে পারে। সীমান্ত জেলাগুলিতে এখন একটাই চর্চা, নাগরিকত্ব থাকবে তো? চায়ের দোকান থেকে পাড়ার আড্ডায় মূল আলোচনা, এসআইআর। খেটেখাওয়া মানুষ থেকে ব্যবসায়ী, সকলেই অজানা আশঙ্কায় ভুগছেন। অনেকেই খুঁজতে শুরু করেছেন দলিল, পুরনো কাগজপত্র। কিন্তু যাঁদের সেসব নেই? বিশেষ করে আদিবাসীরা। যাঁদের দিন এনে দিন খাওয়াটাই জীবন। তাঁদের কী হবে, এই প্রশ্নটা দিন দিন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সঙ্গে অনুপ্রবেশের বিষয়টি জুড়ে দেওয়ার ছকটা বিজেপির। কিন্তু, শেষপর্যন্ত সেই চেষ্টা সফল হবে, এমনটা বলা যাচ্ছে না। কারণ পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের। এখনও পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালত যে ভাষায় কথা বলছে, তাতে বিজেপির ছক ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে, শেষপর্যন্ত তারা উতরে গেলেও বাংলায় মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ বাংলার ও বাঙালির উপর অত্যাচারকে সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যজুড়ে গণআন্দোলন গড়ে তুলছেন। কাতারে কাতারে মানুষ পা মেলাচ্ছে। তাতে ছাব্বিশের ভোটে বঙ্গ বিজেপি খড়কুটোর মতো উড়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
যে পদ্ধতিতে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন করার চেষ্টা চলছে, তা অনেকের চোখে এনআরসির প্রথম ধাপ। নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড বাদ দিয়ে এমন সব তথ্য চাওয়া হচ্ছে যা কোটি কোটি দেশবাসীর নেই। নির্বাচন কমিশন শুধু রাজনৈতিক দলের কাছে নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও ছিল ভরসার জায়গা। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদির রাজত্বে তাকে ঘিরেই উঠছে নানান প্রশ্ন। শুধু বিজেপি বিরোধী দলগুলির মধ্যেই নয়, দেশের সর্বোচ্চ আদালতেরও কমিশনের কাজে জেগেছে সংশয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্তের কথাতেই তা স্পষ্ট। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যদি বেআইনি কিছু ঘটে তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটাই বাতিল করে দেওয়া হবে।’ 
এক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রশ্নটি হল, বিজেপি কেন এমন মারাত্মক ঝুঁকি নিতে চাইছে? উত্তর হল, হারের ভয়। পরাজয়ের আতঙ্ক ঘাড়ে চেপে বসেছে বলেই দিশেহারা বিজেপি এমন মানুষ খ্যাপানো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ঠিক এই ভুলটাই করেছিলেন মিসেস ইন্দিরা গান্ধী। জারি করেছিলেন জরুরি অবস্থা। উদ্দেশ্য ক্ষমতায় টিকে থাকা। কিন্তু পারেননি। বিনাশকালে বিপরীত বুদ্ধির দাপট সপ্তমে চড়ে। ইতিহাস কিন্তু সেকথাই বলে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ