Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

হারা মামলা? বাবা হাইকোর্টেশ্বরের শরণেই মুক্তির আশা

তেল চুকচুকে চুল পাটপাট করে আঁচড়ে রতন বাগচী নদীয়া থেকে হাইকোর্ট এসেছেন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে।

হারা মামলা? বাবা হাইকোর্টেশ্বরের শরণেই মুক্তির আশা
  • ৮ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: গালে বড় আঁচিল। রোদে পুড়ে গায়ের রং তামাটে হয়ে গিয়েছে। তেল চুকচুকে চুল পাটপাট করে আঁচড়ে রতন বাগচী নদীয়া থেকে হাইকোর্ট এসেছেন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে। কাকাতো ভাইয়ের সঙ্গে জমি নিয়ে বহুদিন ধরে মামলা চলছে। একেবারে নাস্তানাবুদ দশা। এখন ঈশ্বর যদি কৃপা করেন... কড়কড়ে ১০০ টাকা দিয়েছেন প্রণামী বাক্সে। বললেন, ‘শেষ ভরসা বাবা হাইকোর্টেশ্বর। উনি মুখ তুলে চাইলে ঠিক জিতব। ভাইটা চামার। বুঝলেন! একটা চামার।’ বলে গজগজ করতে করতে লাগলেন।

Advertisement

বাবা হাইকোর্টেশ্বর? কোন ঠাকুর? মাথার আনাচে কানাচে ঘোরাফেরা করবেই এই প্রশ্ন। উত্তর পেতে যেতে হবে হাইকোর্ট চত্বরে। সেখানে আছেন এক শিবঠাকুর। তাঁরই নাম— ‘বাবা হাইকোর্টেশ্বর’। জটিল সব মামলা-মোকদ্দমায় নাজেহাল বাদী-বিবাদী দু’পক্ষই তাঁর থানে মাথা ঠেকান। প্রণামীর বাক্সে দশ-বিশ টাকা দিয়ে আশীর্বাদ জুটিয়ে, কপাল ঠুকে চলেন মামলা লড়তে। দু’পক্ষই ভাবেন, নিশ্চিত জিতছেন।
রতনবাবুর মতো হাইকোর্টেশ্বরকে যাঁরা চেনেন, তাঁরা চেনেন। না হলে মন্দিরটি খুঁজে পাওয়া সত্যিই বেশ মুশকিল। ছোটর থেকেও ছোট মাপের মন্দির। সাদা পাথরে তৈরি। চার্চ লেন থেকে বেরিয়ে উল্টোদিকের রাস্তা দিয়ে হাইকোর্টের দিকে ঢুকে সোজা এগলে গাদাগুচ্ছের গাড়ি যেখানে পার্ক করা থাকে, সেই গাড়ির আড়ালে ঢাকা থাকে মন্দিরটি। যাঁরা জানেন, তাঁরা কোনওক্রমে গাড়ির ফাঁক গলে এসে মামলা জেতার ফিকিরে প্রণামীর বাক্সে টাকা ফেলেন। যাঁরা চেনেন না, তাঁদের খুঁজে খুঁজে হয়রানই হতে হয়।
মনে হয়, পুরীর মন্দির বা তারাপীঠের মতো বাবার যদি একটি পান্ডা থাকত, তাহলে সকাল থেকে সন্ধ্যা নির্ঘাৎ শোনা যেত... ‘সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা? চলে আসুন। ডিভোর্স পাচ্ছেন না? বাবার থানে মাথা ঠেকান। পেনশনের মামলা? আসুন, আসুন। বাবা সব কেস জিতিয়ে দেবেন।’ কিন্তু হাইকোর্টেশ্বর বাবার যেহেতু পান্ডা নেই, তাই হাঁকডাকও নেই। উল্টোদিকের দোকানদাররা বলেন, ‘সকালের দিকে এক পুরুতঠাকুর আসেন। ফুল-বেলপাতা চড়ান। আকন্দের মালা পরিয়ে বিদায় নেন।’
গেরস্থের বাড়িতে সাধারণত যেমন থাকে, তেমনই ছোট মাপের সাদা পাথরের সিংহাসন গোছের মন্দির। ভিতরে কালো পাথরের শিবলিঙ্গ। মাথার উপর ধাতুর তৈরি সাপ। সামনে সাদা পাথরের নন্দী। প্রণামীর বাক্সটি শিবের থেকেও বড়। তাতে লাল রঙে বড় করে লেখা-‘প্রণামীর বাস্ক। জয় বাবা হাইকোটেশ্বর।’ টিনের বাক্সের উপর দিকে একটা অংশ কেটে ফাঁক তৈরি করা হয়েছে। তির চিহ্ন দিয়ে তা বিশেষভাবে দেখানো। সেখানে টাকা ফেলতে হয়। বড় একটি তালা দিয়ে অত্যন্ত সাবধানে বন্ধ রাখা বাক্সটি। স্থানীয়রা বলেন, বিহার থেকে আসা উল্টোদিকের একটি চায়ের দোকানদার হাইকোর্টেশ্বরের খেয়ালটেয়াল রাখেন। বাক্সটি তাঁরই জিম্মায় থাকে। 
হাইকোর্ট তৈরি হয়েছিল ১৮৬৪ সাল নাগাদ। বইপত্র খুঁজলে জানা যায়, হাইকোর্টেশ্বর অত পুরনো নন। পরে কোনও এক কালে ত্রিপল ঢাকা একটি অস্থায়ী ছাউনি হয়েছিল তাঁর। হালে ছোট মন্দিরটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখন এই চত্বরের অধিকাংশ মানুষ ঠাকুরের নামটি পর্যন্ত শোনেননি। এমনকী হাইকোর্টে নিত্য আসা-যাওয়া রয়েছে, এমন আইনজীবী বা স্থানীয় দোকানদারদের বেশিরভাগই কিন্তু জানেন না হাইকোর্টেশ্বরের মন্দির কোথায়। কোনও একদিন শিবরামের ‘দেবতার জন্ম’ গল্পের মতো হয়তো জন্ম নিয়েছিলেন বাবা হাইকোর্টেশ্বর।
মামলার ভারে ভারাক্রান্ত, ন্যুব্জ, নাজেহাল মানুষদের কেউ তবু খুঁজে খুঁজে আসেন কেস জেতার আশায়। সামান্য দক্ষিণার বদলে কোটি টাকার সম্পত্তি উদ্ধার করে দেওয়ার ক্ষমতা সম্ভবত এই দুনিয়ায় একমাত্র এই হাইকোর্টেশ্বরের দাক্ষিণ্যেই সম্ভব। ‘মুখ তুলে চাও ঠাকুর। জয় বাবা হাইকোর্টেশ্বর।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ