ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: আধ্যাত্মিকতার পীঠভূমি ও পুণ্যক্ষেত্র ভারতে সাতটি তীর্থ ও চারটি ধাম আছে। এই চার ধামের মধ্যে বিশেষ ধাম হল পুরী। এটির অনেক নাম আছে— জগন্নাথধাম, পুরুষোত্তমক্ষেত্র, শঙ্খক্ষেত্র, শ্রীক্ষেত্র, দশাবতারক্ষেত্র, মর্তের বৈকুণ্ঠধাম, নীলাচল, পুরী ইত্যাদি। পুরীক্ষেত্রের অধীশ্বর শ্রীজগন্নাথ মহাপ্রভু। তিনি পুরুষোত্তম, যাঁর দ্বিতীয় নাস্তি। গীতায় শ্রীভগবানই বলেছেন—‘উত্তমঃ পুরুষস্ত্বন্যঃ পরমাত্ম্যেত্যুদাহৃত।’ তিনি অপাণিপাদ, অসীম, আদি ও অন্তহীন। ভক্তদের কাছে তিনি কল্পবৃক্ষ সদৃশ। জগৎ সংসারের পারাপারের একমাত্র নির্ভরযোগ্য নৌকা ও নাবিক। তিনিই তো পতিতপাবন, জগতের নাথ।
জগন্নাথ শব্দের অর্থ
‘শ্রীজগন্নাথ’ পঞ্চাক্ষরী শব্দ। এই প্রতিটি অক্ষরের একটি করে অর্থ আছে। যেমন— ‘শ্রী’ লক্ষ্মী, ভক্তি, প্রীতি আর শোভা প্রদানকারী, তাই তিনি ‘শ্রী’। ‘জ’ শব্দে তিনি স্বয়ং সৃষ্ট জগন্ময় ও জ্যোতিরূপ। সব দেবদেবী, জগৎ সংসার, বেদ, মন্ত্র, যোগ ও জ্ঞানের উৎপত্তিস্থল। ‘গ’ অর্থে সাগরের চেয়েও গভীর ও অনন্ত, তিনি গৃহ-গুরুতর, সর্বগঞ্জন ও দুঃখীজনের উদ্ধারকারী, দুঃখ নিবারক। ‘ন্না’ অর্থে— তিনি নিরাকার, নিরালম্ব, নির্বিকল্প, নিত্য ও নির্মল। ‘থ’ অর্থে— তিনি পরমাত্মা সর্বভূতের প্রাণপদ্মরূপ হৃদয় সিংহাসনে বাস করেন। তিনি সুদর্শন, স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন ও চতুর্বর্গ ফল প্রদানকারী— ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ দাতা। তিনি সর্বজীবের হিতকারী অনাথের নাথ, তারণহার।
যাত্রা কী?
যাত্রা শব্দটির সংস্কৃতে অনেকগুলো অর্থ আছে। ‘যাত্রা’ শব্দটির দ্বারা বোঝায় জীবনধারণ করা। আবার ‘যাত্রা’ শব্দের অর্থ গমন করাকে বোঝায়। অনুষ্ঠান বা উৎসব করার সঙ্গেও যাত্রা শব্দটি আরও দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। যাত্রা শব্দের মূল অর্থ হচ্ছে ‘যা’ ধাতু, যেটি মূলত বোঝায় গমনের ভাবকে বা যাতায়াত করাকে বা গতিশীলতাকে। মেদিনীকোষ গ্রন্থে এই বাক্যের সমর্থন পাওয়া যায়। জগন্নাথ মহাপ্রভুরও স্থানান্তর যাত্রা হয় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, আর তাঁর যাত্রাই হল উৎসব; যেমন— স্নানযাত্রা, চন্দনযাত্রা, রথযাত্রা, রাসযাত্রা, দোলযাত্রা প্রভৃতি। শ্রীজগন্নাথের নানাবিধ যাত্রার মধ্যে শুধুমাত্র স্নান ও রথযাত্রাতেই মহাপ্রভু স্বয়ং জনারণ্যে মিশে যান। অন্যগুলিতে তার প্রতিনিধিরা গমন করেন।
রথের প্রাচীনত্ব প্রশ্নাতীত শতপদ ব্রাহ্মণ রামায়ণ মহাভারত সাম্য পুরাণ বিভিন্ন পৌরাণিক কথায় রথের উল্লেখ পাওয়া যায়। সাম্য পুরাণ অনুসারে সূর্যদেব সর্বপ্রথম ব্রহ্মার কথায় রদ করান। পরবর্তীকালে সেই রথের অনুকরণে বিশ্বকর্মা চন্দ্র সহ বিভিন্ন দেবদেবী রাজা রাজাদের মধ্যে রথের প্রচলন দেখা যায় বিভিন্ন পৌরাণিক মতে রথকে ঘিরে একাধিক উপাখ্যানও পাওয়া যায়। আমাদের রথযাত্রা ওড়িশাবাসীদের কাছে গুণ্ডিচা যাত্রা। মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের মহারানি গুণ্ডিচার নাম অনুসরণে এটিকে গুণ্ডিচা যাত্রা বলে। শ্রীজগন্নাথদেব পুরীধামে থাকাকালীন প্রতি বছর ন’দিন করে তাঁর কাছে সেবা গ্রহণ করেন।
কঠোপনিষদ্ মতে রথের তাৎপর্য
কঠোপনিষদে রথের ব্যাখ্যাটি তাত্ত্বিক। এর প্রকৃত অর্থ আমাদের জীব শরীরটি হল রথ। জীবাত্মা হলেন রথ স্বামী। রথের সারথি আমাদের বুদ্ধি। আর সেই রথের লাগাম হল মন। রথের অশ্ব হল আমাদের ইন্দ্রিয় সমূহ। আর রথের পথ ইন্দ্রিয় ভোগ্য বিষয় সমূহ। জ্ঞানী ব্যক্তির চোখে শরীর, ইন্দ্রিয় ও মন। এদের সঙ্গে যুক্ত জীবাত্মাই হল ভোগের কর্তা— অনন্তরূপী পরমেশ্বর। তন্ত্র , পুরাণ প্রভৃতি শাস্ত্রমতেও পরমেশ্বর অন্তরূপী। যেমন ভাগবতে তাঁর ২৪টি অবতারের উল্লেখ আছে। শ্রীক্ষেত্র নীলাচলের রথযাত্রার পরম-আত্মার রূপ বাসুদেব, সংকর্ষণ আর অনিরুদ্ধ চতুর্ব্যূহ রূপে রথে আরোহণ করেন। জ্ঞানী এবং ভক্তগণের এটাই হল দৃঢ় বিশ্বাস। সৃষ্টির সঙ্গে ধ্বংসের বিশেষ সম্পর্ক আছে। যেখানে সৃষ্টি সেখানেই ধ্বংস। আবার যেখানে ধ্বংস সেখানেই শুরু হয় সৃষ্টির। দেহের বহিরঙ্গ হল রথ। অক্ষয় তৃতীয়ার পূণ্যলগ্নে তাই রথ তৈরির সূচনা হয়। এই দিনটিই সত্যযুগাদ্যা। তাই পুরীর জগন্নাথের রথ প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়ার দিনেই নির্মাণ শুরু করা হয়। আর রথযাত্রা হয়ে গেলে প্রতিবছরই রথগুলিকে ধ্বংস করা হয়। এটি সৃষ্টি ও ধ্বংসের চিরকালীন সত্যটিকেই মনে করিয়ে দেয়। রথের যারা সূত্রধর, চিত্রকর, অন্যান্য শিল্পী ও কারিগর তারা প্রত্যেক বছরে বংশানুক্রমিকভাবে যে যার কার্য যথাসময়ে নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করেন। শ্রীজগন্নাথদেবের রথ চলাচলকে বলা হয় ‘পহন্ডী বিজয়’। সংস্কৃত শব্দ ‘পাদহুণ্ডন’ অর্থে ধীরে ধীরে পদবিন্যাস। পহণ্ডি শব্দটি সংস্কৃত শব্দ থেকেই এসেছে।
তিনটি রথের বর্ণনা
শ্রীজগন্নাথদেবের রথ নন্দীঘোষ জগন্নাথের রথের নাম নন্দীঘোষ। অনেকে বলেন গরুড়ধ্বজ। ৮৩২টি কাঠের টুকরো দিয়ে নন্দীঘোষ রথটি তৈরি হয়। এর উচ্চতা ৪৫ ফুট। এই রথের সাত ফুট ব্যাসার্ধের ১৬টি চাকা আছে। অতীতে হিন্দু ধর্মের অষ্টাদশ সিদ্ধির প্রতীক রূপে ১৮টি চাকা ছিল। বর্তমানের ১৬টি চাকার প্রতীক হল চন্দ্রদেবের ষোলোটি কলা যা কালজ্ঞাপক। রথটি সুন্দরভাবে আচ্ছাদিত হয়, লাল ও হলুদ রঙের বস্ত্র দিয়ে। ষোলোটি চাকার রং হলুদ। রথ টানার জন্য চারটি ঘোড়া আছে। নাম—শঙ্খিকা, রোচিকা, মোচিকা আর জ্বালিনী। রথের রক্ষক নৃসিংহদেব। সহদেবতারা হলেন বরাহ, কৃষ্ণ, রাম ও নারায়ণ। নন্দীঘোষের আরও চারজন রক্ষক হলেন গরুড়, আয়়ধ, শঙ্খ ও চক্র। রথের উপরের দেবতার নাম কল্যাণসুন্দর। রথের চারদিকে ন’জন দেবতা হলেন—হনুমান, রাম, লক্ষণ, নারায়ণ, কৃষ্ণ, গোবর্ধনধারী, চিন্তামণি, রাঘব এবং নৃসিংহ। শঙ্খ বলাহক, শ্বেত আর হরিদাস রথের অশ্ব। রথের সারথি মাতলী বা দারুক। শঙ্খচূড় নামের নাগিনী হলেন রথের দড়ি। রথের মুখ হল নন্দীমুখ, দেবী যোগমায়া। রথের ভৈরব একপাদ, নন্দ ও কুবের চারণ। যক্ষ, হর্যক্ষ, গার্ভাধীশ্বর— হিরণ্যগর্ভা, শক্তি মা বিমলা। উৎকর্যণী-ক্রিয়া, যোগা, আজ্ঞা, অনুজ্ঞা, প্রজ্ঞা ও মেধা। নন্দীঘোষ রথের ঋষিরা হলেন— নারদ, দেবল, ব্যাস, শুক, পরাশর, বৈশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র ও রুদ্র। রথ কুম্ভের নাম হিরন্ময়। জয় ও বিজয় দুই দ্বারপাল। রথের চূড়ায় যে ধ্বজা লাগানো হয় তার নাম ত্রৈলোক্য মোহিনী। নন্দীঘোষের রথের অধীশ্বর হলেন শ্রীজগন্নাথ।
দেবী সুভদ্রার রথ
দর্পদলন বা পদ্মধ্বজ
দেবী সুভদ্রা লক্ষ্মী স্বরূপা। তাঁর রথের নাম দর্পদলন। তিনি পদ্মাসনা। তিনি পদ্মপ্রিয়া, পদ্মাবতী। ধন, ঐশ্বর্য ও শ্রীর প্রতীক হলেন দেবী সুভদ্রা। সেই জন্য তাঁর রথের নাম পদ্মধ্বজ। অনেকেই এই রথকে দেবদলনও বলেন। রথের উচ্চতা ৪৩ ফুট রথের চাকার সংখ্যা ১২ যা ১২ মাসের প্রতিটি চাকার ব্যাসার্ধ সাত ফুট লাল ও কালো রংয়ের বস্ত্র দিয়ে সমগ্র রথটিকে আচ্ছাদিত করা হয়। এই রথের ষোলোটি চাকা হল ১৬টি কলা। প্রজ্ঞা, অনুজ্ঞা, ঘোরা, অঘোরা— এরা রথের চার অশ্ব। রথের সারথি হলেন অর্জুন বা দেবদত্ত। যজ্ঞবল্ক্য ঋষি হলেন রথের মূল দড়ি। দেবী সুভদ্রার সঙ্গে রথে আরও অনেক দেবী থাকেন— যেমন জয়দুর্গা, চণ্ডী, চামুণ্ডা, শ্যামাকালী, উগ্রতারা, মঙ্গলা, শূলি, দুর্গা, বারাহি প্রভৃতি। এই রথের দ্বারে উপস্থিত থাকেন গঙ্গা ও যমুনা। মা জয়দুর্গা হলেন রক্ষক। সুদর্শন এই রথে সদা বিরাজমান।
বলভদ্রের রথ তালধ্বজ
তালধ্বজ নামটি কেন, তার সঠিক ব্যাখ্যা নেই। অনেক পণ্ডিতরা মনে করেন বলভদ্র যেহেতু স্বয়ং শেষ নাগ। আর বিষ্ণুর অনন্ত শয্যা তিনিই সৃষ্টি করেন। বলভদ্রের বেদীর নীচে আছে একটি দর্পণ, যেটি জ্ঞানের প্রতীক। এই দর্পণ দিয়ে তিনি সমগ্র বিশ্বকে দেখেন। তার এই দর্পণটি যেহেতু তলদেশে থাকে তাই এটিকে তালও বলা হয়। অন্যদিকে দর্পণ শুদ্ধতা ও স্বচ্ছতার প্রতীক। এটির অধিকারী হলেন বলভদ্র, তাই তাকে বলা হয় তালাঙ্ক। এই জন্যই বলরামের রথের নাম তালধ্বজ। তবে এ বিষয়ে মতভেদ আছে। অনেক পণ্ডিতের মতে বলরাম ও বলভদ্র এক এবং অভিন্ন। তালবনে তৃণাবর্তাসুরকে তিনি বধ করেছিলেন। সেই বিজয়ের প্রতীক তার রথে তাল বৃক্ষের চিহ্ন শোভা পায়। এজন্য বলরামের বা বলভদ্রের রথের নাম তালধ্বজ। রথটি উচ্চতায় ৪৪ ফুট। ৭৬৩টি টুকরো কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। চতুর্দশ ভুবনের প্রতীক রূপে এই রথের চাকার সংখ্যা ১৪। চাকার ব্যাস ৭ ফুট। লাল ও নীল রঙের কাপড়ে রথটি আচ্ছাদিত করা হয়।



