সন্দীপন বিশ্বাস: স্নানযাত্রা হোক কিংবা রথযাত্রা, চিরকালই প্রধান আকর্ষণ থাকেন পুরীর জগন্নাথদেব। কিন্তু এবার পুরীর সঙ্গে দীঘাও মানুষের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। গত কয়েকমাস ধরে দীঘায় মানুষের ঢল বুঝিয়ে দিচ্ছে, প্রভু জগন্নাথ দর্শনে তাঁরা কতটা আবেগপ্রবণ। তবুও পুরীর আকর্ষণ থাকবেই। শত শত বৎসরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরীর মন্দির। তাকে ঘিরে পুরাণ, শাস্ত্রে লেখা রয়েছে কত কথা। শ্রীচৈতন্যের উপস্থিতি পুরীকে শুধু বাড়তি মর্যাদাই দেয়নি, বাঙালিকে বারবার আজও টেনে নিয়ে যায় মহাপ্রভুর দ্বিতীয় বাসভূমি পুরীতে।
পুরীতে জগন্নাথদেবকে ঘিরে বারো মাসে নানা ধরনের উৎসব হয়। যেমন বৈশাখে চন্দনযাত্রা, জ্যৈষ্ঠে স্নানযাত্রা, আষাঢ়ে রথযাত্রা, শ্রাবণে ঝুলনযাত্রা, ভাদ্রে জন্মাষ্টমী, আশ্বিনে শ্রীরামচন্দ্রের বিজয়োৎসব, কার্তিকে রাসপঞ্চক, অগ্রহায়ণে প্রভুকে শীতবস্ত্র পরিধান উৎসব, পৌষে বিগ্রহের অভিষেক উৎসব, মাঘে বসন্ত পঞ্চমীতে সেই শীতবস্ত্র উন্মোচন করা হয়, ফাল্গুনে দোলযাত্রা, চৈত্রে দমনকার্পণ্যোৎসব। এর মধ্যে মূলত দু’টি উৎসব ঘিরে ভক্তদের সাড়া পড়ে যায়। সে দু’টি হল স্নানযাত্রা ও রথযাত্রা।
জগন্নাথদেবকে নিয়ে যত উৎসব হয়, তার মধ্যে আদি উৎসব হল স্নানযাত্রা। এই দিনটি হল মূলত তাঁর জন্মদিন। কেন এই দিনটিকে প্রভু জগন্নাথদেবের জন্মদিন মনে করা হয়? কেননা জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার দিনেই ব্রহ্মা জগন্নাথদেবের দারুব্রহ্ম তৈরি করে তাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একে দেবস্নানা পূর্ণিমাও বলে। স্কন্দপুরাণে দেখা যায়, ইন্দ্রদ্যুম্ন মহারাজকে জগন্নাথ বলছেন, ‘আমি অবতীর্ণ হয়েছি জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমাতে। তাই এই দিনটিই আমার জন্মদিন। সেই কারণে ওই দিনটিতে তুমি আমার মহাস্নানের ব্যবস্থা করবে। তার আগের দিন নিষ্পন্ন করবে অধিবাস পর্ব। ভক্তরা এই স্নান দর্শন করলে তাদের পাপ দূর হবে। কিন্তু স্নানের পর কেউ যেন আমার অঙ্গরাগহীন মূর্তি দর্শন না করে। তাতে তার অমঙ্গল হবে।’
সেই নির্দেশ পাওয়ার পর ইন্দ্রদ্যুম্ন জগন্নাথের পুণ্যস্নানের ব্যবস্থা করেন। প্রভুর স্নানের জন্য নির্মাণ করেন একটি স্নানবেদি। সেই স্নানবেদি নানা ধরনের মণি ও মরকত দিয়ে সাজানো হয়। মন্দির থেকে জগন্নাথদেবকে স্নানবেদিতে এনে স্নান করানো হয়। তাঁর সঙ্গে স্নান করানো হয় সুভদ্রা, বলভদ্র এবং সুদর্শনকেও। কোন জলে তাঁকে স্নান করানো হবে, সেই বিষয়েও মহারাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে নির্দেশ দিয়েছিলেন জগন্নাথদেব। তিনি নির্দেশে জানিয়েছিলেন, ‘সিন্ধুকূলে যে অক্ষয় বট আছে, তাহার উত্তরে সর্বতীর্থময় এক কূপ বিরাজিত। সেই কূপটি বর্তমানে বালুকারাশি দ্বারা আবৃত। সেই কূপটি আমিই নির্মাণ করেছিলাম। সেই কূপের জলকে সূর্যরশ্মি স্পর্শ করে না। সেই কূপকে খুঁজে বের করে সেটির সংস্কার করে, তার জল সোনার কলসিতে ভরে নিয়ে এসে আমাকে স্নান করাবে। জল ঢালার সময় আমাকে স্মরণ করে মন্ত্র উচ্চারণ করবে।’
১০৮ স্বর্ণকলসিতে জল ভরে তাতে মেশানো হয় কাঁচা দুধ, চন্দন, আতর, হলুদ, বিভিন্ন রকমের ফুল ইত্যাদি। মোট ১০৮ কলসি জলের মধ্যে জগন্নাথকে স্নান করানো হয় ৩৫ কলসি, বলরামকে ৩৩, সুভদ্রাকে ২২ এবং সুদর্শনকে ১৮ কলসি জল দিয়ে। সেই জল আনার সময় পুরোহিতরা নিজেদের নাক, মুখ ঢেকে রাখেন। কেননা সেই জলে নিঃশ্বাসটুকু লাগলেও জল অপবিত্র হয়ে যাবে।
বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণের মধ্যে বেজে ওঠে শঙ্খ, নানা ধরনের বাদ্য। ভক্তরা ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি দেন। অনেক ভক্ত ভগবানের স্নান দর্শন করে আনন্দে চোখের জলে ভাসেন। তাঁরা চামর, তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করতে থাকেন। পুরাণে উল্লেখ করা আছে, জগন্নাথের সেই স্নান দর্শন করেন স্বর্গের দেবতারাও। তাঁরা বলেন, ‘এই স্নান হল প্রভুর বিজয়াভিষেক। এই মুহূর্তটুকু দর্শন করে আমরা ধন্য হলাম।’
স্নানের পর প্রভু জগন্নাথ গণপতি বা হাতিবেশ ধারণ করেন। অর্থাৎ তিনি গণেশ হয়ে যান। জগন্নাথ ও বলরাম ধারণ করেন গজবেশ এবং সুভদ্রা ধারণ করেন পদ্মবেশ। কেন এমন হয়? এর কারণ হিসাবে দু’টি বিষয় জানা যায়। সেটি হল, যে কোনও পুজোর আগেই গণেশের পুজো করতে হয়। তাই রথযাত্রার পুজোর আগে তিনি গণপতি বেশ ধারণ করেন। দ্বিতীয় কারণটি জানা যায় ওড়িয়া গ্রন্থ ‘দার্ঢ্যতা ভক্তি’ থেকে। সেখানে একটি কাহিনির উল্লেখ আছে। কর্ণাটকের কানিয়াড়ি গ্রামে বাস করতেন এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। তিনি ছিলেন গণপতির উপাসক। একদিন তিনি জানতে পারলেন, নীলাচলে রয়েছেন দারুব্রহ্ম জগন্নাথদেব। তিনি ব্রহ্মস্বরূপ। একথা জানার পর সংসারে আর তাঁর মতি রইল না। ব্রহ্মদর্শনের জন্য তিনি সংসার, স্ত্রী, পুত্র কন্যা ত্যাগ করে যাত্রা করলেন পুরীধামের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে তিনি ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন তুলসী চহুরা গ্রামে। গ্রামটি পুরীর কাছাকাছি। সেই দিনটি ছিল স্নানযাত্রার দিন।
তিনি দেখলেন বহু লোক যাচ্ছেন, আসছেন। ভগবানের কথা আলোচনা করছেন। সেই সময় জগন্নাথ এক বৃদ্ধের রূপ ধরে তাঁর কাছে আসেন এবং বলেন, ‘বসে আছো কেন, যাও জগন্নাথের স্নানযাত্রা দেখে এসো। তিনি হলেন কল্পতরু। তাঁর কাছে কেউ কিছু প্রার্থনা করে নিরাশ হন না।’
সেই ব্রাহ্মণ গিয়ে জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা দর্শন করলেন। কিন্তু জগন্নাথের রূপ দেখে খুশি হতে পারলেন না। তিনি যেহেতু গণপতির উপাসক। তাই তিনি মনে করতেন, ব্রহ্ম মানেই গণপতির রূপ। এই ভাবনার পর যখন সেই ব্রাহ্মণ ফিরে যাচ্ছেন, তখন জগন্নাথদেব তাঁর এক পান্ডাকে বললেন, ‘যাও আমার এক ভক্ত বিফল মনোরথ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। ওকে ফিরে আসতে বল, আমি ওর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করব।’
পান্ডার ডাকে ফিরে এলেন সেই ব্রাহ্মণ। দেখলেন জগন্নাথ গজানন বেশে উপবিষ্ট। আনন্দে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন ব্রাহ্মণ। জগন্নাথ তাঁকে বর প্রার্থনা করতে বললে ব্রাহ্মণ বললেন, ‘আমি যেভাবে আপনার রূপ দেখে মুগ্ধ হলাম, প্রতি বছর ভক্তরা যাতে আপনার এই রূপ দর্শন করে তাঁদের জীবন ধন্য করেন, সেটাই চাই। এই রূপ দর্শনের পর আমি আর ধরাধামে থাকতে চাই না।’ তাঁর কথা শুনে প্রভু জগন্নাথ বললেন, ‘বেশ তাই হবে। ভক্তদের আমি প্রতি বছর স্নানের পর গজানন রূপ দর্শন করাব।’ শুনতে শুনতে চক্ষু বুজে এল ব্রাহ্মণের। তাঁর শরীর থেকে প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে আলোকরূপ ধারণ করল, তারপর সেটা মিশে গেল জগন্নাথের মধ্যে। ভক্তের প্রাণ শুধু ভগবানের জন্যই কাঁদে না। ভগবানের হৃদয়ও ভক্তের দুঃখ ও আনন্দের সঙ্গী হয়ে ওঠে। এই স্নানযাত্রাই তার উদাহরণ। মন্দিরের রত্নবেদি থেকে জগন্নাথদেব নেমে আসনে রাজপথে। ভক্তের কাছে এই নেমে আসার মধ্য দিয়ে তিনি প্রকাশ করেন, তাঁর সারল্য, ভক্তের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা। যাঁরা তাঁর কাছ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন না, তিনি তাঁদের কাছে ধরা দেন।
স্নানের পর জগন্নাথ সকলের চক্ষুর অন্তরালে চলে যান। এই সময়কালকে বলে অনবসর পর্ব। বলা হয় স্নানের পর প্রভুর জ্বর এসেছে। তাঁকে পাঁচন খাওয়াতে হবে। অবশ্য স্নানের পরই জগন্নাথদেবকে ভোগ নিবেদন করা হয়। সুগন্ধি অন্ন, যাকে বলে পাখাল। এর সঙ্গে থাকে একটা পাঁচমিশেলি তরকারির ঝোল। তাতে থাকে পটল, বেগুন, কাঁচকলা ইত্যাদি। এছাড়াও নিবেদন করা হয় বিভিন্ন ধরনের শাক, শুকতো, পিঠে, খিচুড়ি, সরপুলি, খোয়ামণ্ড, হংসকেলি।
পাঁচন খেয়ে বাঁশের পালঙ্কে তিনি শয়ন করেন। অন্তরালে থাকার জন্য তাঁর ভোগ ও আরতি বন্ধ থাকে। ভগবানের অসুখ করলে পাঁচন খাওয়ার পাশাপাশি অল্প কিছু খাদ্য গ্রহণ করেন তিনি। এই সময় রোগক্লিষ্ট শরীরের জন্য জগন্নাথদেবকে দেওয়া হয় ভেজা মুগ ডাল, মিছরি, চিনি, ফল ও মিষ্টি। স্নানযাত্রার ছ’দিনের মাথায় জ্বর কিছুটা কমে তখন তপ্ত শরীর শীতল করার জন্য মাখানো হয় চন্দন। সপ্তম দিনে শরীরের ব্যথা কমানোর জন্য মাখানো হয় তিল তেল। অষ্টম দিনেও তেল মালিশ করা হয়। নবম দিনে দেহকে পরিষ্কার করা হয়। দশম দিনে আবার তাঁকে নানা ধরনের অঙ্গরাগ দেওয়া হয়। যেমন চন্দন, রক্তচন্দন, কস্তুরী, কুমকুম কর্পূর ইত্যাদি। নানাবিধ পথ্য এবং অঙ্গরাগের পর দারুব্রহ্মের নবযৌবন লাভ হয়। এই পুরো সময়টি অতিবাহিত করার পর রথযাত্রা উৎসব।
মাহেশের স্নানযাত্রা পর্ব বেশ দেখার মতো। এখানেও স্নানের নিজস্বতা আছে। গঙ্গায় যখন ষাঁড়াষাঁড়ির বান আসে, তখন সেই জল জগন্নাথের স্নানের জন্য ধরে রাখা হয়। তার সঙ্গে মেশানো হয় দুধও। মাহেশের স্নানযাত্রার কথা পাওয়া যায় হুতোমের রচনায়। মাহেশের স্নানযাত্রা নিয়ে কবিতা লিখেছেন কবি ঈশ্বর গুপ্ত। স্নানযাত্রা নিয়ে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকবার পুরী গিয়েছিলেন। সেখানে জমিদারি সূত্রে ঠাকুর পরিবারের বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতে গিয়ে মাঝে মাঝে থাকতেন। শোনা যায়, তাঁকে পুরীর মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তিনি অবশ্য একবার ভুবনেশ্বরে লিঙ্গরাজ মন্দির দর্শন করেছিলেন। পুরী ও মাহেশের পাশাপাশি এবার স্নানযাত্রায় নজর থাকবে দীঘার দিকেও।