Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

টিমটিমে আলো, বাঘের গর্জনে সিঁটিয়ে অতিথিরা, কুলতলির কুমিরপাড়া গ্রামে আতঙ্কের বউভাত, রাতে খাঁচায় বন্দি দক্ষিণরায়

গোটা গ্রাম মিশমিশে অন্ধকারে ঢেকে। সব ঘরের আলো নেভানো। শুধু পাড়ার এক কোণে একটি বাড়িতে টিমটিম করে আলো। গ্রামের অন্য দিকে তিন বিঘা জমি ঘিরে বাগান।

টিমটিমে আলো, বাঘের গর্জনে সিঁটিয়ে অতিথিরা, কুলতলির কুমিরপাড়া গ্রামে আতঙ্কের বউভাত, রাতে খাঁচায় বন্দি দক্ষিণরায়
  • ১৬ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, বারুইপুর: গোটা গ্রাম মিশমিশে অন্ধকারে ঢেকে। সব ঘরের আলো নেভানো। শুধু পাড়ার এক কোণে একটি বাড়িতে টিমটিম করে আলো। গ্রামের অন্য দিকে তিন বিঘা জমি ঘিরে বাগান। বাগান না বলে জঙ্গল বলাই ঠিক হবে। শনিবার সেখানেই সকাল থেকে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে বাঘ। একবার ঝাঁপ দিয়েছিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলুদ বিদ্যুতের শিখা দেখতে পেয়েছিলেন তিন গ্রামবাসী। তারপর বাঘকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বনদপ্তর জাল দিয়ে বাগান ঘিরে দেয়। সন্ধ্যার মুখে আবার গর্জন ভেসে আসে বাগান থেকে। তা শুনে এক বরযাত্রীর কাপ থেকে কফি চলকে পড়ে পাঞ্জাবিতে। বিয়েবাড়ি থেকে মেরেকেটে ১০ মিনিট দূরত্ব বাগানটির।

Advertisement

কনের মুখ শুকিয়ে এইটুকু। বরপক্ষ বলছে, ‘কপালটাই খারাপ। আজকেই ঢুকতে হল বাঘটাকে।’ পাত্রীপক্ষ বলছে, ‘কোন জায়গায় বিয়ে দিলে গো মেয়ের বাবা। এখানে তো দিনে দুপুরে বাঘ!’ এরপর মাঝরাত্তিরে বাঘটির এক থাবায় ঘাড়ের হাড় চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে যাবে মোটাসোটা একটি ছাগলের। বন্দি অবস্থাতেই সে এমনভাবে তেড়ে আসবে যে, বনকর্মীরা প্লাস্টিক দিয়ে খাঁচা ঢাকতে পর্যন্ত সাহস পাবেন না। গর্জনের শব্দে হাত কেঁপে মোবাইল ছিটকে পড়ে যাবে একজনের। বাঘটির শ্বদন্ত ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ। চোখ ভাটার মতো। ‘এক থাবায় ছ’ফুটের জোয়ান মানুষ পর্যন্ত স্পট ডেড করে দিতে পারে’, বক্তব্য অভিজ্ঞ বনকর্মীদের। বাঘটি এতটাই শক্তিশালী।
শনিবার নদী পেরিয়ে কুলতলির দেউলবাড়ি পঞ্চায়েতের দক্ষিণ দুর্গাপুরের কুমিরপাড়া গ্রামে শনিবার ঢুকেছিল বাঘটি। বনদপ্তরের অনুমান, রায়দিঘি রেঞ্জের চিতুরির জঙ্গল থেকে সে বেরয়। আট কিমি পথ পাড়ি দেয়। সাঁতরে পেরয় উত্তাল মাতলা নদী আর দু’টো খাল। ঢোকে গ্রামে। ঝিলপাড় ধরে হেঁটে জঙ্গলের মতো বাগানটিতে লুকিয়ে পড়ে। আর বেরয়নি। থেকে থেকে গর্জন করেছে। আর পিলে চমকে গিয়েছে গ্রামবাসীদের। কুমিরপাড়া গ্রামটি ছোট নয়। আড়াইশোরও বেশি ঘর। বাসিন্দারা মৎস্যজীবী নয় দিনমজুর। সেই গ্রামের বাসিন্দা সৌরভ ময়রার বিয়ে হচ্ছে। কনের নাম জয়ন্তী ময়রা। মেয়ের বাড়ি কচিয়ামারা নামে দূরের একটি গ্রামে।
সুন্দরবনের মানুষের খুব একটা যে ভয়ডর আছে এমন নয়। বাঘ-কুমির নিয়েই বাস করে। শনিবার যদিও বিয়েবাড়িটি ভয়ে থমথম করেছে। তবে আয়োজন আগেই থেকেই ছিল বলে বউভাত বাতিল করা হয়নি। নিমন্ত্রিত ৩০০ জনই এসেছিলেন। বসেছিল ফুচকার স্টল, কফির মেশিন। বাড়ির সামনের রাস্তায় কিছুটা পর্যন্ত আলো। আশপাশ ঘন অন্ধকার। মোবাইলের আলো পর্যন্ত জ্বালা নিষেধ। নিমন্ত্রিতদের ফিসফাস, ‘বাঘ কি ধরা পড়বে?’ ‘বেশিক্ষণ থাকা যাবে না কিন্তু।’ বনকর্মী বা পুলিসকে বারবার জিজ্ঞাসা, ‘বাঘটা এখানে আসবে না তো?’ বনকর্মীরা তখন জানান, জাল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে বাগান। নিশ্চিন্তে থাকুন।
তখন মাছ, কোয়েল পাখির মাংস, পটল চিংড়ি, মাছের মুড়ো দিয়ে ডাল, দই, মিষ্টি দিয়ে ভূরিভোজ হয়েছে। তবে ফুচকা দিতে গিয়ে হাত কেঁপে গিয়েছে পরিবেশকের। নিমন্ত্রিতরা পাত পেড়ে খেয়েছেন বটে তবে চোখ রেখেছিলেন দূরে, অন্ধকারে। এরপর দল বেঁধে বাড়ির রাস্তা ধরেন কনেযাত্রীরা। বরপক্ষের অনেকে থেকে যান বিয়েবাড়িতেই।
তারপর রাত গভীর হয়। মাঝরাতে খাঁচায় বন্দি হয় সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। শান্তি ফেরে কুমিরপাড়ায়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ