Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ধনত্রয়োদশীর অন্যতম উপাস্য কুবের কিন্তু বাঙালির অপরিচিত নন

ধনতেরাস আগে অবাঙালি উৎসব বলে পরিচিত ছিল। ধনতেরাসকে বাঙালি এখন আপন করে নিয়েছে। দুর্গাপুজোয় মায়ের সঙ্গে, লক্ষ্মীপূজায় একা বা স্বামীর সঙ্গে পুজো পাওয়ার পরেও আবার এই দিনে যেন মা লক্ষ্মীর উপরিপাওনা হয়।

ধনত্রয়োদশীর অন্যতম উপাস্য কুবের কিন্তু বাঙালির অপরিচিত নন
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন্তন মজুমদার: ধনতেরাস আগে অবাঙালি উৎসব বলে পরিচিত ছিল। ধনতেরাসকে বাঙালি এখন আপন করে নিয়েছে। দুর্গাপুজোয় মায়ের সঙ্গে, লক্ষ্মীপূজায় একা বা স্বামীর সঙ্গে পুজো পাওয়ার পরেও আবার এই দিনে যেন মা লক্ষ্মীর উপরিপাওনা হয়। তাতে খুব বেশি না মাতলেও এই দিন সোনা বা বাসনপত্র কেনাকাটির ধুম পড়ে যায় বাঙালির মধ্যে। লক্ষ্মীর পাশাপাশি এই দিন পুজো পান ধনদেবতা কুবের।     

Advertisement

ছোটবেলায় পুজোর ছুটিতে, ঠিক এই সময়টাতেই মাঝেমধ্যে পড়তাম উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখা ‘পুরাণের গল্প’। তাতে রাবণের গল্প পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম যে কুবের তাঁর সৎদাদা। দুজনেই বিশ্রবা মুনির পুত্র। 
রাবণের মা ছিলেন দানবী, কিন্তু কুবেরের মা দেববর্ণিনী ছিলেন ভরদ্বাজ ঋষির কন্যা। ছোটবেলায় কুবেরের ছবি বা মূর্তি  আমরা সেভাবে দেখিনি। পরে তাঁর  ছবি দেখে 
মাথার দিক থেকে না হলেও, পেটের দিক থেকে গণেশের সঙ্গে খুবই মিল পেয়েছি। 
আজ বলব প্রথম বাঙালি মহিলা কবির কথা। তিনি মধ্যযুগীয় বঙ্গসাহিত্যের একমাত্র মহিলা কবি চন্দ্রাবতী। তাঁর কলমেও এসেছে কুবেরকাহিনি। সেখানে আমরা পাই, লঙ্কায় দেবতাদের বন্দি করে এনে রাবণের ঠাকুরালী বা রাজত্ব করার কথা। চাপা থাকেনি ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাইয়ের দুর্দশা—‘কুবের আইস্যা রাবণ রাজার ভাণ্ডারী।’ অর্থাৎ সামান্য ভাঁড়ার ঘর সামলাতে হয়েছিল ধনভাণ্ডারী কুবেরকে।
এবার আসি রামায়ণের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ বঙ্গানুবাদক প্রসঙ্গে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ অনুযায়ী বিশ্বশ্রবা এবং লতার পুত্র কুবের রাবণের আগেই ব্রহ্মার বর লাভ করেছিলেন। এর ফলে  তিনি অমর ও ধনেশ্বর হন। ব্রহ্মা নিজের হাতে তৈরি করা পুষ্পক রথ তাঁকে দেন। পিতামুনির পরামর্শেই শূন্য লঙ্কাপুরীতে কুবের বাস করতে থাকেন, কেননা দানবরা নারায়ণের ভয়ে সেই সময় পাতালবাসী হয়েছিল। কিন্তু কুবেরের সুখ দেখে তাদের চরম হিংসা হয়। চক্রান্ত করে দানবী কন্যা নিকষার সঙ্গে বিশ্বশ্রবার বিবাহের ফলে রাবণের জন্ম হয়। রাবণের মনে কুবেরের প্রতি প্রবল ঈর্ষার জন্ম দেয় নিকষা—‘উহারে জিনিয়া লঙ্কা পার যদি নিতে।/ তবে ত আমার ব্যথা ঘুচিবে মনেতে।।’ আশ্চর্য হল এই যে, তপস্যায় সিদ্ধিলাভের পরে দাদাকে গুরুজ্ঞান করেছিলেন রাবণ। কিন্তু দাদু মাল্যবানের প্ররোচনায় খেপে যান এবং দাদার কাছে দূত মারফত লঙ্কাত্যাগের বার্তা পাঠান। তখন অশান্তি এড়াতে পিতার পরামর্শে কুবের লঙ্কা ছেড়ে হিমালয়ে চলে যান। ত্রিশ কোটি যক্ষ তাঁর ধনসম্পদ স্থানান্তরিত করেন। কিছুদিন পরে কুবের এক দূতকে রাবণের কাছে কর্তব্যের পাঠ দিতে পাঠান। রেগে রাবণ দূতকে মেরে ফেলে কুবেরের বিরুদ্ধে করলেন যুদ্ধযাত্রা। যুদ্ধে দুই সেনাপতিকে হারিয়ে শেষে কুবের রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসেন। প্রথমে রাবণ বিপাকে পড়লেও পরে মায়াযুদ্ধে কুবেরকে কাবু করে ফেলেন—‘কুবেরের অন্তঃপুরে হৈল হাহাকার। রাবণ লুটিয়া সব করে ছারখার।।’
সপ্তকাণ্ড রামায়ণের শেষ খণ্ডে রামের সঙ্গে অগস্ত্য মুনির এই উপরোক্ত কথোপকথন থেকে আরও জানা যায় যে, শিবপার্বতীর বিহারদৃশ্য দেখার ফলে কুবেরের বাম চক্ষু পুড়ে যায়। অর্থাৎ এক চোখে তাঁর দৃষ্টি ছিল না। এর অন্তর্নিহিত অর্থ অতিরিক্ত ধনী অথচ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মানুষের একচক্ষু দশার দিকে ইঙ্গিত করেছে। কিন্তু পার্বতীর কোপন স্বভাব ও স্বার্থসিদ্ধির কারণে বারবার কুবেরকে পরিবার-পরিজনসহ বিপদে পড়তে হয়েছে। মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়ের ‘অন্নদামঙ্গল’-র হরিহোড় ছিলেন কুবেরের অনুচর বসুন্ধর। দেবীর উদ্দেশ্য ছিল তার মাধ্যমে মর্ত্যে নিজের পুজো প্রচলন। আবার কৃষ্ণনগর রাজবংশের আদি পুরুষ ভবানন্দ মজুমদারকেও একই কারণে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল। তিনি আসলে ছিলেন কুবেরপুত্র নলকুবের। কুবেরের দুই পুত্রবধূকেও ভবানন্দের দুই স্ত্রী হয়ে অভিশপ্ত জীবন কাটাতে হয়েছিল। আবার কুবেরপত্নী মুরলা না থাকলে বোধহয় মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘পদ্মাবতী’ নাটক লিখতেই পারতেন না! কারণ কুবের-মুরলার কন্যা বিজয়াই পার্বতীর দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে পদ্মাবতী নামে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে এই নাটকে এবং অমিত্রাক্ষরে রচিত প্রথম কাব্য ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’-এ সস্ত্রীক কুবেরকে মধুকবি ভালোই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
যাই হোক, এই অভিশাপের হেতু এত সুন্দর সাহিত্যফল প্রাপ্তির বিষয়টা বেশ অভিনব। সেজন্যই হয়তো কুবের নিজেই এক যক্ষকে অভিশপ্ত করে অলকাপুরী থেকে রামগিরিতে পাঠিয়েছিলেন। সেই যক্ষের বয়ানেই কালিদাস লিখতে পেরেছিলেন ‘মেঘদূত’। বাংলায় তার একাধিক অনুবাদ রয়েছে। পরশুরাম রাজশেখর বসু লিখেছিলেন ‘অদল বদল’ নামে একটি গল্প। এটিকে উত্তর-মেঘদূত বলা যেতে পারে। অভিশাপে নির্ধারিত এক বছরের পরেও দশ দিন কেটে গিয়েছে, কিন্তু যক্ষের দেখা নেই। যক্ষিণী সোজা হাজির হয়েছেন কুবেরের কাছে। কুবেরের অন্যায্য প্রলোভনকে পাত্তা না দিয়ে, যক্ষকে না পেলে আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে বসেন তিনি। শেষে পুষ্পকে তাঁকে নিয়ে রামগিরিতে এসে কুবের দেখেন যে দক্ষ স্থূণাকর্ণ(পরশুরাম-প্রদত্ত নাম) মেয়ে হয়ে গিয়েছেন। দ্রুপদপুত্র শিখণ্ডীকে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য নিজের পুরুষত্ব তাঁকে দিয়েছিলেন যক্ষ। শিখণ্ডী তার পর থেকেই ফেরার। কুবের শেষে পাঞ্চালে গিয়ে শিখণ্ডীর কাছ থেকে যক্ষের পৌরুষ উদ্ধার করে অলকায় ফিরে যান। 
বড় হয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’(প্রকাশকাল ১৯৩৬) পড়তে গিয়ে অন্যতম চরিত্ররূপে পেয়েছিলাম কুবেরকে—দেবীগঞ্জের মাইল দেড়েক উজানে যে কুবেরমাঝি মাছ ধরে বেড়ায়, কেতুগ্রামে যার বাড়ি। তার নিজস্ব নৌকা নেই, জালও নেই, টাকার অভাবে পুকুর জমা নিতে পারে না। শরীর খারাপ থাকলেও ইলিশের মরশুমে গভীর রাত্রে তাকে মাছ ধরতে যেতে হয়। এতক্ষণ আমরা দেবতা কুবেরকে পেয়েছি, এবার দেখা যাক ‘গরিবের মধ্যে গরিব, ছোটলোকের মধ্যে আরও বেশি ছোটলোক’ মানুষ কুবেরকে। তার পরনের মূল পরিধান রাজবেশ নয়—নেংটিমাত্র। সোনার আলোয় ভরা ঘর তার জন্য নয়, দরজাজানালার বিশেষ ব্যবস্থা না থাকায় সেই ঘরে জমাট বেঁধে থাকে অন্ধকার। তাতে পড়ে থাকে পঙ্গু বউ। অল্পস্বল্প চুরি কুবেরও করে। তিল প্রাচুর্যের প্রতীক বলে কুবেরপুজোর আবশ্যিক একটি উপাদান। কিন্তু মানুষ কুবেরের শরীরের সাড় পাওয়ার জন্য দরকার হয় সামান্য তামাকের। কুবেরদেবের অন্য রূপ টাকাপয়সার কাছে আমাদের সকলকে একবার-না-একবার কিংবা বারবার হার মানতেই হয়। সেখানে পদ্মামাঝি নামে কুবের হলেও, তাকে নতি স্বীকার করতে হয়েছে দারিদ্র্যের কাছে, কেতুগ্রামের ভিটে ত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছে ময়না দ্বীপে। নিজের নামটাই তার কাছে হয়ে গিয়েছে ব্যঙ্গ ও উপহাসের নামান্তর।
বাংলা প্রবচনে বাঙালির মাত্রাছাড়া দুঃসাহসের কথা এই প্রসঙ্গে বলতেই হয়। ধনী লোক সম্পর্কে ব্যবহৃত হয় ‘টাকার কুমির’ শব্দবন্ধটি। বাঙালি ‘কুবের’ শব্দকে ক্রমান্বয়ে ‘কুবীর’ ও শেষে ‘কুমির’ শব্দে পরিণত করে ছেড়েছে। সে মনে করেছে যে মানুষ খাওয়ার ফলে তার ব্যবহৃত গয়না-টাকাপয়সা কুমিরের পেটে থেকে যায়, কেউ তার নাগাল পায় না। যেমন করে ধনীরা তাদের সঞ্চিত সম্পদের কথা গোপন রাখেন। কিন্তু প্রকৃত কথাটি প্রথমে ছিল ‘টাকার কুবের’। 
কুবেরকৃপা আমাদের চরমকাম্য বটে। কিন্তু তা পরমকাম্য হওয়া নিশ্চয়ই উচিত নয়। কারণ কাগুজে টাকা বা ধাতব মুদ্রা আমাদের কাছে অন্যতম প্রয়োজনীয় হলেও, বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ নয়। জীবনের যাত্রাপথে সঞ্চয় করতেই হবে, তবু গন্তব্য তাকে হতে দিলে চলবে না। লক্ষ্য হবে সৌন্দর্য ও কল্যাণরূপিণী শ্রী। সে জন্যই লক্ষ্মীর সঙ্গে কুবেরের সহাবস্থান বা কুবেরলক্ষ্মীর প্রচলন ঘটেছে। তাই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ গল্পের নামকরণ আপাতভাবে কুবেরকেন্দ্রিক হলেও শেষে তা কুবেরকে অতিক্রম করে যায়। গল্পে সুকুমার নামধারী গল্পকথক তথা গল্পকার চরিত্রটির জবানবন্দিই তার প্রমাণ—‘স্নেহ-মমতা-ক্ষমার এক মহাসমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়িয়েছি।...সেই ক্ষমা কুবেরের ভাণ্ডারকে ধরে দিয়েও যা পাওয়া যায় না।’
লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ