Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

কু ঝিক ঝিক কলম্বো

একটা বই পড়ছিলাম। যে দেশে যাচ্ছি সে দেশের ইতিহাস সংস্কৃতিকে নিয়ে। এটা আমার অভ্যাস। আগে থেকে দেশটা সম্পর্কে জানা থাকলে নতুন দেশে বেড়াতে সুবিধা হয়।

কু ঝিক  ঝিক কলম্বো
  • ১ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে: কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা। দলবদ্ধভাবে কিংবা একা। 

Advertisement

 

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত:  একটা বই পড়ছিলাম। যে দেশে যাচ্ছি সে দেশের ইতিহাস সংস্কৃতিকে নিয়ে। এটা আমার অভ্যাস। আগে থেকে দেশটা সম্পর্কে জানা থাকলে নতুন দেশে বেড়াতে সুবিধা হয়। বিশেষত আমার মতো যাঁরা একলা বেরিয়ে পড়েন দেশ দেখতে। হায়দরাবাদ থেকে বিমানে উঠেছি, যাত্রাপথ মাত্র দু’ঘণ্টার। বিমান অবতরণ করতে চলেছে কাটুনায়েক বিমানবন্দরে। ঘোষণা শুনে জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, সবুজ এক ভূখণ্ড, তার তটরেখাকে চুম্বন করে চলেছে সমুদ্রর জল। সেদিকে তাকিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা কবিতা মনে পড়ে গেল—
‘সিন্ধুর টিপ সিংহল দ্বীপ কাঞ্চনময় দেশ।
চন্দন যার অঙ্গের বাস তাম্বুল বন কেশ।
উত্তার তাল—কুঞ্জের বায়... মন্থর নিঃশ্বাস।
উজ্জ্বল যার অম্বর, আর উজ্জ্বল যার হাস।’
আরও মনে পড়ে গেল ছেলেবেলায় ইতিহাস বইয়ে পড়েছিলাম, সম্রাট অশোক তাঁর পুত্র মহেন্দ্রকে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য পাঠিয়েছিলেন সিংহল দ্বীপে।
কলম্বো এয়ারপোর্ট, যার পোশাকি নাম কাটুনায়েক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। আকারে বেশি বড় না হলেও বেশ সাজানো গোছানো। ছিমছাম। বর্তমানে ভারতীয়দের শ্রীলঙ্কা প্রবেশের জন্য কোনও ভিসার প্রয়োজন হয় না। শুধু একটা ছোট্ট ফর্ম ফিলআপ করতে হয়। যাতে লেখা থাকে অতিথির ঠিকানা, এ দেশে তিনি কত দিন থাকবেন, পাসপোর্ট নম্বর, ফ্লাইট নম্বর— এমন অতি সাধারণ কিছু প্রশ্ন। এ কাজ অনলাইনে আগেই সেরে রাখা ছিল। ইমিগ্রেশন অফিসার শুধু পাশপোর্ট চেয়ে নিয়ে তাতে শ্রীলঙ্কা প্রবেশের মোহর লাগিয়ে দিলেন। যখন এয়ারপোর্টের বাইরে কার পার্কিংয়ে উপস্থিত হলাম তখন বেলা দুটো। ফোন করতেই ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে হাজির হয়ে গেল। নাম সরফরাজ। তামিল বংশোদ্ভূত। শ্রীলঙ্কার প্রায় আশি শতাংশ মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও কলম্বো শহরে বেশ কিছু হিন্দু ও ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ বসবাস করেন। উঠে বসলাম সরফরাজের গাড়িতে। আমার গন্তব্য কলম্বো শহরের মধ্যবর্তী গ্যালে রোড। যেখানে আমি মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করেছি তার কাছাকাছি বেশ কিছু দ্রষ্টব্য স্থান আছে, যেগুলি স্বল্প খরচে এমনকী প্রয়োজনে পায়ে হেঁটে ঘোরা যায়। আমার মতো অকিঞ্চিৎকর বাঙালি কলমজীবীকে ভ্রমণকালে পকেটের প্রতি বিশেষ নজর রাখতেই হয়। মসৃণ রাস্তা। কলম্বো শহরের বাইরে আমাদের পথের দু’পাশে সবুজের আধিক্য আছে। বিশেষত চোখে পড়ে নারকেল গাছের সারি। তার নীচে বাড়ি-ঘর। আকৃতিতে ছোট হলেও বেশ সাজানো গোছানো ছিমছাম। মাত্র কয়েক বছর আগেই এদেশে গণআন্দোলন ঘটে গিয়েছে মুদ্রাস্ফীতিজনিত কারণে। আর কয়েক দশক আগেও বারবার কলকাতার খবরের কাগজে উঠে আসত কখনও কলম্বোতে কখনও জাফনাতে তামিল টাইগারদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষের কথা। এ দেশের আয়ের উৎসই হল— চা, মশলা আর পর্যটক। সরফরাজ ইংরেজি আর হিন্দি দুটো ভাষাই বোঝে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নাকি যথেষ্টই চড়া, এখনও তা কমেনি। এ দেশের মানুষ অপেক্ষা করে আছে নতুন সরকার জিনিসপত্রের দাম কমাতে পারে কি না তা দেখার জন্য। কথা বলতে বলতে এগতে এগতেই একসময় চোখে পড়ল রাস্তার পাশে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি। নীল আকাশ আর নীল জল যেন একেবারে মিলেমিশে একাকার। জলের উপর উজ্জ্বল রৌদ্র কিরণ ডানায় মেখে উড়ে বেড়াচ্ছে সিন্ধু সারসের দল। প্রাথমিক অবস্থায় সমুদ্র বলে ভুল হলেও গাড়ি চালক জানাল সেটা আসলে একটা খাঁড়ি।
মসৃণ পথ ধরে মিনিট চল্লিশ মতো চলার পর আমরা প্রবেশ করলাম মূল শহরে। প্রশস্ত রাজপথ। গাড়ির বেশ ভিড়। তবে তা চলছে সুশৃঙ্খল ছন্দোবদ্ধ গতিতে। রাস্তায় অধিকাংশ মানুষের পরনেই সাদা পোশাক। পুরুষদের পরনে সাদা শার্ট, মহিলাদের অনেকেরই শাড়ি বা লম্বা ঝুলের ফ্রকের মতো স্থানীয় পোশাকও সাদা রঙের। দেশটাতে বেশ গরম পড়ে বলেই এ দেশের মানুষেরা সাদা পোশাক পরেন। এমনকী বুদ্ধ মন্দিরগুলোর সন্ন্যাসীরাও সাদা পোশাক আর ধুতি পরেন বলে জানাল সরফরাজ। কলম্বো শহরের পথের দু’পাশে বাড়ি-ঘর বা দোকানপাট শপিংমলগুলোও বেশ সাজানো গোছানো। তবে, কলকাতা বা ভারতের বড় বড় শহরের মতো হাইরাইজ বিল্ডিং কিন্তু কলম্বো শহরের সর্বত্র তেমন চোখে পড়ে না। চোখে পড়ে সবুজ গাছপালা। পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। 
গগনি রোডে আমার এ দেশের বাসস্থানটা খুব বড় না হলেও সুন্দর ছিমছাম। সাদা রঙের বাড়িটাতে ইউরোপীয় স্থাপত্যের ছাপ আছে। যা এ দেশ একসময় ইউরোপের উপনিবেশ ছিল তার সাক্ষ্যবহন করে। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলাতে উঠে কাচের দেওয়াল দেওয়া রিসেপশন। রুমে চেক-ইন করেই আবার হোটেলের বাইরে বেরিয়ে পড়তে হল। কারণ খিদেতে পেট চুঁইচুঁই করছে। সৌভাগ্যবশত হোটেল থেকে বাইরে বেরতেই রাস্তার ঠিক ওপারেই একটা রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ল। গিয়ে বুঝলাম সেটা অনেকটা পাইস হোটেলের মতো। বহু মানুষ খাচ্ছেন সেখানে। মেনু কার্ডে লেখা স্থানীয় সিংহলি খাবার আমার অচেনা। তবে চেনা পদের মধ্যে ভাতের থালি আর চিকেনকারি আছে দেখে তো অর্ডার করলাম। ভারতীয় টাকার মূল্য শ্রীলঙ্কার টাকার তিনগুণ হলেও খাবারের দাম আমাদের দেশের তুলনায় তিনগুণ বেশি। খাবার চলে এল। ভাতের সঙ্গে ডাল, সব্জি, চিকেনকারি আর স্থানীয় কোনও একটা ঘন ঝোলের মতো পদ। কিন্তু ভাত ছাড়া অন্য সব পদেই মশলার বিশেষত গরম মশলার আধিক্য বেশি। স্বাদ আর গন্ধ দুটোই বেশ ঝাঁঝালো। হয়তো বা এ দেশ মশলার দেশ বলেই রান্নাতে মশলার আধিক্য বেশি। খাওয়া সেরে হোটেলে নিজের রুমে ঢুকে সোজা বিছানায় শুতেই পথশ্রমের ক্লান্তিতে ঘুম নেমে এল চোখে।
ঘুম যখন ভাঙল তখন সাড়ে পাঁচটা বাজে। আমার ট্যুর প্রোগ্রামে একটা দিন নির্দিষ্ট করে রেখেছি কলম্বো শহর দেখবার জন্য। রিসেপশনে বসা সিংহলি যুবকের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম শহরটা কেমন করে ঘোরা যায় তা নিয়ে। সে বলল ট্যুরিস্টরা সাধারণত গাড়িতে অথবা টুকটুক অর্থাৎ অটোরিকশতে শহরের প্রধান দ্রষ্টব্য স্থান গলফেস সমুদ্র সৈকত, লোটাস টাওয়ার, মিউজিয়াম ইত্যাদি ঘুরে দেখে। তবে মার্চ মাস হলেও কলম্বোতে ইতিমধ্যে বেশ গরম পড়তে শুরু করেছে। ছেলেটা হঠাৎ কাচের দেওয়ালের বাইরের দিকে আঙুল তুলে দেখাল। আমি দেখতে পেলাম হোটেলের বাইরে রাস্তার ওপারে দুটো বাড়ির ফাঁক গলে কিছুটা দূরে নীল জলরাশি দেখা যাচ্ছে! তা দেখে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘সমুদ্র?’
সিংহলি যুবক উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, সমুদ্র। ওর পাশ দিয়েই রেললাইন গেছে।’
তারপর সে একটু ইতস্তত করে আমাকে বলল, ‘কাছেই একটা রেল স্টেশন আছে তার নাম ব্যাম্বল আপাটিয়া। সেখান থেকে দুটো স্টেশন পরে কলম্বো ফোর্ট স্টেশন। আর তারপরের স্টেশন মারাডানা জংশন। এ দুটো স্টেশনের যে কোনও একটি স্টেশনে নামলেই আপনি পায়ে হেঁটে বা টুকটুক নিয়ে সামান্য দূরত্ব গেলেই কলম্বোর প্রধান দ্রষ্টব্যগুলো দেখে নিতে পারবেন। সব থেকে বড় কথা আপাটিয়া থেকে কলম্বো পোর্ট রেললাইন চলে গিয়েছে একদম সমুদ্রের ধার দিয়ে। বর্ষাকালে কিংবা জোরে বাতাস বইলে সমুদ্রর জলের ছিটে এসে লাগে ট্রেনের জানলাতে। এমন অভিজ্ঞতা কলম্বোতে যারা গাড়ি করে বেড়ায় তাদের হয় না।’
এই অজানা ভ্রমণ পথ আমাকে আকৃষ্ট করল। ঠিক করলাম আমি রেল যাত্রাই করব। আপাটিয়া রেল স্টেশনে যাওয়ার পথ আমি জেনে নিলাম রিসেপশন থেকে। সূর্য ডুবে গিয়ে সিংহল সমুদ্রের তীরে কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নামতে শুরু করল।
পরদিন রেল ভ্রমণের জন্য সকাল আটটার মধ্যে তৈরি হয়ে নিয়ে হোটেলের রুম থেকে বেরিয়ে প্রথমে গেলাম ডাইনিং রুমে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট খাবার জন্য। পেট ভরে মধ্যাহ্নভোজনের মতো প্রাতরাশ সেরে এরপর আমি হোটেল ছেড়ে রওনা হয়ে গেলাম রেল স্টেশনের দিকে।
রিসেপশনের ছেলেটার নির্দেশিত পথে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট স্থানে। সামনেই ভারত মহাসাগরের সুনীল জলরাশি। আর তার গা বেয়ে চলে গিয়েছে এক জোড়া রেললাইন। কিছু দূরেই চোখে পড়ল একটা ছোট্ট রেল স্টেশন। রেল স্টেশন আর সমুদ্রর মধ্যে কোনও বেলাভূমি নেই। নীল সমুদ্র আর নীল আকাশের বুকে একলা দাঁড়িয়ে থাকা ছোট রেল স্টেশনটা ঠিক যেন পিকচার পোস্ট কার্ডের ছবি।  রেললাইনের এক পাশে সমুদ্র আর অন্য পাশে সমান্তরাল একটা রাস্তা চলে গেছে প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত। যে রাস্তা থেকে ছোট একটা ওভারব্রিজ আছে, তাতে উঠে প্ল্যাটফর্মে নামতে হয়। এসবেস্টসের ঢালু ছাদ আর রঙিন স্তম্ভওলা প্ল্যাটফর্মের কাঠের বেঞ্চগুলোতে কয়েকজন যাত্রী বসে ট্রেনের প্রতীক্ষা করছেন। ট্যুরিস্ট নন, স্থানীয় মানুষ তাঁরা। নিস্তব্ধ প্ল্যাটফর্ম। সমুদ্রের দিকটাতে প্ল্যাটফর্মের গায়ে একটা দেওয়াল তোলা আছে। যাতে প্ল্যাটফর্ম থেকে কেউ ছিটকে সমুদ্রের জলে পড়ে না যায় সেই জন্য। সেই কংক্রিটের দেওয়ালের গায়ে সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। ছোট্ট টিকিট ঘরটাতে যে কর্মচারী টিকিট দিচ্ছিলেন তাঁকে প্রথমে নিজের বিদেশি পরিচয় দিয়ে আমার রেলযাত্রার কারণ ব্যাখ্যা করলাম। তিনি আমার কথা শুনে একই সঙ্গে বিস্মিত ও আনন্দিত হলেন। কারণ, যাঁরা কলম্বো দেখতে আসেন, তাঁরা কেউই রেলযাত্রা করেন না। আমাকে তিনি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলেন কোন স্টেশনের টিকিট কাটতে হবে। স্টেশনে নেমে কীভাবে দেখতে হবে। তাঁর কথা শুনে আমি টিকিট কাটলাম আপাটিয়া থেকে মারাডানা স্টেশন পর্যন্ত। রিটার্ন টিকিটের মূল্য সিংহলি টাকায় একশো টাকা অর্থাৎ ভারতীয় মূল্যে তিরিশ টাকার মতো। না, কম্পিউটারাইজ টিকিট নয়। পাঞ্চিং মেশিনে পাঞ্চ করা পিচ বোর্ডের হলুদ টিকিট। যা আগে আমাদের দেশেও সাধারণ টিকিট হিসাবে চালু ছিল। সময় যেন থমকে আছে সমুদ্র পাড়ের এই নিরালা ছোট রেল স্টেশনে। টিকিট দেওয়ার পর রেল কর্মচারী ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘দশ মিনিট অন্তর অন্তর এখানে ট্রেন আসা-যাওয়া করে। যাত্রীদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। কলম্বোতে অনেক বিদেশি তো বেড়াতে আসেন। তবে এটুকু বলতে পারি এই রেলযাত্রার কথা আপনি কোনও দিন ভুলবেন না।’ তিনি জানালেন, কলম্বো তথা শ্রীলঙ্কাতে এই রেলপথ চালু হয়েছিল প্রায় একশো সত্তর বছর আগে। কলম্বো থেকে এই রেলপথ শুরু হয়ে কখনও সমুদ্রর পার বরাবর, কখনও জনপদ, কখনও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে শেষ হয়েছে পাহাড়ি অঞ্চলে। উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত  প্রধান রেলপথ ও তার শাখা-প্রশাখা নিয়ে শ্রীলঙ্কার রেলপথ প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত। তবে ইলেকট্রিক ট্রেন নয়, ডিজেলে চালিত ট্রেন। কিছু কয়লা চালিত বা স্টিম ইঞ্জিনও এখনও আছে। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই কু-ঝিক ঝিক শব্দ শুনতে পেলাম। সিংহলি ভদ্রলোক বললেন, ‘যান আপনার গাড়ি এসে গেছে।’
কালো ধোঁয়া উড়িয়ে কু-ঝিক-ঝিক শব্দ তুলে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল গাড়ি। কাঠের তৈরি ছোট ছোট বগি। সংখ্যায় তাঁরা সম্ভবত পাঁচ-ছ’টা হবে। আমি উঠে পড়লাম একটা বগিতে। কাঠের আসনগুলো গদি আঁটা। বগিগুলো একে অপরের সঙ্গে ভেস্টিবিউল দিয়ে যুক্ত। বেশ ফাঁকাই ট্রেন। জানলার পাশে এক আসনে আমিও বসে পড়লাম।
ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছাড়াতেই যেন সুনীল জলরাশি ধেয়ে এল জানলার কাছে। না, সমুদ্র আর রেললাইনের মাঝখানে কোনও বেলাভূমি নেই। সমুদ্রর জল এসে সোজা ধাক্কা খাচ্ছে কংক্রিটের ব্লকের গায়ে, বোল্ডারের গায়ে। যার ওপর বসানো আছে রেললাইন। ট্রেনের চাকার হাত পাঁচেক নীচেই এসে ঝাপটা মারছে সমুদ্রর জল। প্রথমে সে দৃশ্য দেখলে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব হয়! যেন এই বুঝি ট্রেনটাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সমুদ্র। প্ল্যাটফর্মের রেলকর্মীদের মুখে শুনছিলাম ঝড়-বৃষ্টির সময় বা বর্ষাকালে অনেক সময় এ পথে ট্রেন স্থগিত রাখা হয় জলস্তর রেললাইন ছুঁয়ে যাওয়ার কারণে। ট্রেনের ঝমঝম শব্দ আর ঢেউয়ের শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর শব্দ চারপাশে। এই রোমাঞ্চ অনুভব করতে করতে পৌঁছে গেলাম একটা স্টেশনে। সেটাও ছোট স্টেশন। দু-একজন লোক ওঠানামা করল। তারপর আবার কু-ঝিক-ঝিক শব্দ তুলে জলরাশির গা বেয়ে ট্রেন চলতে শুরু করল। এবার দৃষ্টি দিলাম দূরের দিকে। যেখানে নীল সমুদ্র আর নীল আকাশ দূরে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যা গিয়ে মিশেছে আমার দৃষ্টি পথের অনেক দূরে ভারত ভূখণ্ডে। যে ভূখণ্ড থেকে সুদূর অতীতে বাঙালি রাজপুত্র বিজয় সিংহ এই সমুদ্র অতিক্রম করে এসেছিলেন এদেশ লঙ্কা জয় করার জন্য, এসেছিলেন অশোক পুত্র মহেন্দ্র সিংহলে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য, এই অন্তহীন জলরাশি অতিক্রম করেই একদা বাংলার তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে ভগবান বুদ্ধর শেষ চিহ্ন তাঁর পবিত্র দন্ত এসে পৌঁছেছিল এ দেশে। দেখতে দেখতে আরও একটা রেল স্টেশন অতিক্রম করে গাড়ি পৌঁছে গেল কলম্বো পোর্ট স্টেশনে। খানিকটা বড় স্টেশন কলম্বো পোর্ট। নেমে পড়লাম। অটোরিকশ নিয়ে চলে গেলাম মিনিট দশেকের দূরত্বে বিখ্যাত জলফেস বিচে। এখানেও বেলাভূমি নেই, তাই স্নানের অবকাশ নেই এখানে। সমুদ্রের পাড় বাঁধানো পার্কের মতো। দেশি-বিদেশি ট্যুরিস্টের ভিড় সেখানে। দূর থেকে দেখা যায় কলম্বো বন্দরে নোঙর করে আছে বিশাল বিশাল জাহাজের মাস্তুল। বিন্দুর মতো গাংচিলের দল পাক খাচ্ছে তার মাথার ওপর। এ সব ঘুরে দেখতে দেখতে সূর্য মাথার ওপর পৌঁছে গেল। অতঃপর আবার রওনা হলাম রেল স্টেশনের দিকে। উঠে বসলাম ট্রেনে পরবর্তী স্টেশন মারাডানা যাওয়ার জন্য। এ দুটো স্টেশনের মধ্যবর্তী রেলপথ অবশ্য শহরের মধ্যে দিয়েই যায়। স্টেশনের বাইরে পা রাখলেই কলম্বোর প্রধান দু’টি দর্শনীয় স্থাপত্য চোখে পড়ে। সীতারামাইয়া মন্দির ও শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ স্থাপত্য লোটাস টাওয়ার। রেল স্টেশনের লাগোয়া কলম্বোর বিখ্যাত পেট্টা মার্কেট। কলম্বোতে আসা সব ট্যুরিস্টই এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। প্রথমে পেট্টা মার্কেট, তারপর সীতারামাইয়া মন্দির। মিউজিয়াম হয়ে বিকালবেলা কলম্বোর লোটাস টাওয়ারে উঠে পাখির চোখে দেখলাম সমুদ্রর তটরেখা বরাবর কলম্বো নগরীকে। আবার ফেরার জন্য রওনা হলাম। সূর্য এখন ঢলে পড়েছে। বেশ বাতাস বইছে এখন। হাতটা ট্রেনের জানলার বাইরে বার করতেই নোনা জলের ছিটে আমাকে স্পর্শ করল। বাতাস, সমুদ্রের গর্জন আর কু-ঝিক-ঝিক শব্দ আমাকে কলম্বো ঘুরিয়ে নিয়ে এক অনাস্বাদিত আনন্দ আর রোমাঞ্চের স্বাদ দিতে দিতে ফিরিয়ে নিয়ে চলল আমার গন্তব্যে। কু-ঝিক-ঝিক কলম্বো। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ