কলকাতাই সবচেয়ে নিরাপদ শহর। শুধু বাংলার বা পূর্ব ভারতের নয়, সারা দেশের মধ্যে নিরাপদতম শহর কলকাতা। এ কোনও রাজনৈতিক দাবি নয়, এই স্বীকৃতি দিয়েছে খোদ কেন্দ্রীয় সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন সংস্থা ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) বিচারে, দেশের ১৯টি মেট্রোপলিটন সিটির মধ্যে বাংলার রাজধানী শহরই সেরা। পশ্চিমা সাহিত্যিকের চোখে মহানগর কলকাতা অনেক আগেই ‘সিটি অফ জয়’ আখ্যা পেয়েছে। দমিনিক লাপিয়েরের এই বন্দনা যে কোনোভাবেই অতিরঞ্জিত ছিল না, কলকাতা তা বারেবারে প্রমাণ করেছে। একবার বা দু-বার নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায়, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল—টানা চারবার সেরার শিরোপা ধরে রেখেছে কলকাতা! এনসিআরবি মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছে দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ কিংবা আমেদাবাদ, লখনউ, গুয়াহাটি নয়—দেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহরের নাম কলকাতা—বাংলার প্রাণকেন্দ্র। ২০২৩ সালে সংঘটিত অপরাধের পরিসংখ্যান সম্প্রতি প্রকাশ করেছে এনসিআরবি। তাতেই মিলেছে এই প্রত্যাশিত শিরোপা। এতে অনেকে হয়তো অবাক হয়েছেন এই কারণে যে, বাংলা কোনও ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্য নয়। বাংলার শাসক দলের নাম তৃণমূল কংগ্রেস এবং বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার শাসক দল, রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীকে অপদস্থ করার জন্য সবসময় মুখিয়ে থাকে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি।
এজন্য তারা বারবার হাতিয়ার করেছে ধর্ষণ আর মৃত্যুকে। কলকাতায় বিক্ষিপ্তভাবে কোনও ধর্ষণ আর খুনের ঘটনা ঘটলেই প্রধান বিরোধী দল জনমানসে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে যে, এসব মর্মান্তিক কাণ্ড দেশের আরও কোথাও ঘটে না। খুন, ধর্ষণ নিয়ে কলকাতা এক নরক গুলজারে পরিণত হয়েছে! তথ্য, পরিসংখ্যান এবং সমাজবিজ্ঞানের বিশ্লেষণাত্মক আলোচনাকে দূরে রাখা হয়েছে প্রতিবার। কারণ অন্যান্য বড়ো শহরের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা সামনে এলেই জলের মতোই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সংঘটিত অপরাধ এবং অপরাধ প্রবণতার নিম্নহারের প্রশ্নে কলকাতা আক্ষরিক অর্থেই এক স্বর্গরাজ্য। কলকাতায় একটিও অপরাধ সংঘটন কিংবা তা ঘটাবার চেষ্টাও নিন্দনীয়। কারণ কলকাতাসহ বাংলাই সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে বরাবর দিশারির ভূমিকা পালন করেছে। কলকাতাকেই ‘ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে মনে করা হয়। ১৯১১ সালে দেশের রাজধানীর তকমা হারাবার পরও এই শিরোপা কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। সেই দিকটি মাথায় রেখেই নিজ কর্তব্যপালনে বাংলা অবিচল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের এই উন্নতশির চেহারা বাংলা-বিরোধীদের কোনোদিনই পছন্দ নয়। ব্রিটিশ ভারত বজায় রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসক বাংলা ও বাঙালিকে ‘খতম’ করার খেলায় মরিয়া ছিল। স্বাধীন ভারতে বাংলার বিরুদ্ধে যেন ইংরেজেরই দোসরের মতো আচরণ করছে গেরুয়া শিবির। পরিতাপের সঙ্গে এও লক্ষ করা যায় যে, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পর্যন্ত এই সংকীর্ণ রাজনীতিকে সরাসরি প্রোমোট করে থাকেন। মোদি সরকার একদশক যাবৎ এমন আচরণ করে চলেছে যে, বাংলার যেকোনো রকমের ‘জয়’ মানেই যেন কেন্দ্রের এবং বিজেপির ‘পরাজয়’!
রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই অভূতপূর্ব অবনমনের কালে কলকাতাকে এত বড়ো স্বীকৃতি সত্যিই অনেককে অবাক করে থাকবে। তবে একদেশদর্শিতার একটা সীমাও থাকে, মোদি সরকারের এনসিআরবি আলোচ্যমান ক্ষেত্রে অন্তত এই সীমা লঙ্ঘন করেনি, তারা যথার্থই কলকাতাকে তার প্রাপ্য স্বীকৃতি দিয়েছে। এজন্য তাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য। এনসিআরবির হিসেবে, ২০২৩ সালে কলকাতায় প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যার নিরিখে গুরুতর অপরাধের হার ৮৩.৯। এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কোচি, দিল্লি ও সুরাত। ২০২২ সালেই শেষবার দেশের অপরাধের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিল এনসিআরবি। গত দু-বছরের রিপোর্ট এতদিন পর্যন্ত পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছিল মোদি সরকার। কেন্দ্রের এই ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে বিস্তর। সব রাজ্যের থেকে আলাদা আলাদাভাবে তথ্য নিয়েও কেন রিপোর্ট পেশ করা হচ্ছে না—এই প্রশ্নে সরগরম হয়ে ওঠে বিরোধী রাজনীতি। শেষমেশ ২০২৫ সালের অক্টোবরে এসে ২০২৩ সালের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এনসিআরবি। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতায় আইপিসি (বর্তমানে বিএনএস) অপরাধের হার ৭৭.৫। বিশেষ ও সামাজিক আইনের (স্পেশাল ও সোশ্যাল ল) ক্ষেত্রে অপরাধের হার ৬.৪। কগনিজেবল বা আদালতগ্রাহ্য অপরাধের হার প্রতি লক্ষে ৮৩.৯। অর্থাৎ, কলকাতার প্রতি এক লক্ষ মানুষ পিছু প্রায় ৮৪ জন আদালতগ্রাহ্য অপরাধের শিকার, যা দেশের সবকটি মেট্রোপলিটন শহরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পূর্ববর্তী দুটি বছরের তুলনায়ও কলকাতায় অপরাধের সংখ্যা কমেছে। এই উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকেই দশে দশ নম্বর দিতে হবে।