বেদ নারায়ণের নিঃশ্বাসে বহির্গত হয়েছে। আবার সকল জ্ঞানের আকর বেদ। সেই বেদস্রষ্টা বেদ অপেক্ষা অধিকতর জ্ঞানী হবেন। কোনও ব্যক্তি যখন কোনও বই লেখেন, তাতে তাঁর যে জ্ঞানটুকু প্রকাশিত হয়, তা সীমিত এবং ওই বইয়ে যতখানি দরকার ততখানিই প্রকাশিত হয়, কিন্তু লেখক নিশ্চয়ই তার থেকে অধিকতর জ্ঞানী। সুতরাং এই ভাগবত গ্রন্থের কর্তা সাক্ষাৎ নারায়ণ। সুতরাং গ্রন্থের শ্রেষ্ঠত্ব তো প্রতিপাদিত হচ্ছেই আর গ্রন্থকর্তার গ্রন্থ অপেক্ষাও অধিকতর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদিত হচ্ছে।
বেদব্যাস এই গ্রন্থের পূর্বে অষ্টাদশ পুরাণ লিখেছেন, মহাভারত লিখেছেন, বেদান্তসূত্র লিখেছেন—এগুলিতে কোথাও তিনি বলেননি, এটি অমুকের লেখা। ভাগবত তাঁর শেষ গ্রন্থ। গ্রন্থের শেষ অডিশানটি ভালই হয়। আমরা কিছু লিখবার সময় বা বলবার সময় যেমন উদ্ধৃতি দিই বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি থেকে। এতে আমার কথার দাম বেড়ে যায়। আমার কথা নির্মূল নয় এটি বোঝা যায়। এখানেও বেদব্যাস বলে দিলেন—এটি আমার কথা নয়। এটি মহামুনিকৃত। মহামুনি নারায়ণই প্রথম উপদেষ্টা। কাজেই গ্রন্থের কর্তৃগত শ্রেষ্ঠতা বিরাজিত। দ্বিতীয়ত, গ্রন্থের নাম হল ভাগবত। এ সম্বন্ধে পূর্বেই আমি বলেছি অন্যান্য গ্রন্থে ভগবানের কথা থাকলেও অন্যান্য কথাও অনেক আছে। যার জন্য বেদব্যাসের মনের তুষ্টি ছিল না এবং নারদের উপদেশে কেবল ভাগবতী কথা দিয়ে এই গ্রন্থ লিখলেন।
এখন গ্রন্থের অনুবন্ধ—অধিকারী, বিষয়, সম্বন্ধ ও ফল বলছেন। শ্রোতার সাক্ষাৎ প্রবৃত্তির অঙ্গ এরা। শাস্ত্রে একটি উক্তি আছে এ সম্বন্ধে—
‘‘সিদ্ধার্থং সিদ্ধসম্বন্ধং শ্রোতুং শ্রোতা প্রবর্ততে।
শাস্ত্রাদৌ তেন বক্তব্যঃ সম্বন্ধঃ সপ্রয়োজনঃ।।’’
প্রথমে ধরা যাক অধিকারী। ভাগবতের অধিকারী কারা? শিশুর অক্ষরপরিচয় হয়েছে। এখন বানান করে সব গ্রন্থই পড়তে পারে। তাকে যদি একটি উপন্যাস দেওয়া হয় বা কোনও তত্ত্বগ্রন্থ দেওয়া হয়, তা বানান করে সে পড়তে পারবে বটে, কিন্তু তাতে তার রসবোধ বা তত্ত্ববোধ হবে না। তেমনি, এই ভাগবত গ্রন্থে অধিকারীর স্বরূপ বলছেন—‘নির্মৎসরাণাং সতাং’ এই উক্তির দ্বারা। ‘মৎসর’ কথার অর্থ পরের উৎকর্ষ সহ্য করতে না পারা। আর সেইটি রহিত হল নির্মৎসর। ‘সতাং’ যাঁরা সজ্জন, ভূতানুকম্পী। ভূতজগতের প্রতি দয়াশীল এমন জন। এই ‘সতাং’ শব্দের দ্বারা কর্মকাণ্ডের অধিকারী, যাঁরা পশুবধাদি করে যজ্ঞ করে থাকেন তাঁরা বাদ গেলেন। সুতরাং অধিকারীর প্রাধান্য কথিত হল। ঐহিক ও আমুষ্মিক (পারলৌকিক) ফলাকাঙ্ক্ষী কর্মকাণ্ডের অধিকারী। আর ফলকামুক যারা, তারাই পরের উৎকর্ষ সহ্য করতে পারে না। তখন প্রশ্ন হতে পারে জ্ঞানকাণ্ডী তা হলে অধিকারী হতে পারে? তার উত্তরে বলা হচ্ছে—না, তারাও হতে পারে না। এটি বিষয়রূপ অনুবন্ধটি বলবার সময় বলেছেন।
দ্বিতীয় অনুবন্ধ হল বিষয়। এমন কি বিষয় যে, গ্রন্থের অধিকারী এত বড় দরকার? উত্তর করলেন—বিষয়ের নাম ধর্ম। ধর্ম তো বেদব্যাস আগেও বলেছেন। উত্তরে বলা হল—আগে যা বলেছেন তা কেবল ‘ধর্ম’। এখন বলছেন ‘পরমো ধর্মঃ।’ এই পরম ধর্মটি কি? তার ব্যাখ্যা বেদব্যাস নিজেই অন্যত্র করেছেন—
‘‘স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে।
অহৈতুক্যপ্রতিহতা যয়াত্মা সুপ্রসীদতি।।’’
ব্রহ্মচারিণী বেলা দেবীর ‘ভাগবতী কথা’ থেকে