রাজনীতিতে নেতা-মন্ত্রীদের ডিগবাজি খাওয়া নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু জাতি গণনা নিয়ে আজীবন বিরোধিতা করে আসা মোদি অ্যান্ড কোম্পানির ইউ-টার্ন খাওয়াটা বোধহয় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে! সাম্প্রতিক অতীত থেকে মূলত কংগ্রেস এবং বিরোধী ইন্ডিয়া মঞ্চের শরিকরা জনগণনার সঙ্গে জাতি গণনারও জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে। একই দাবিতে সরব থেকেছে বিজেপির ইন্ডিয়া জোটের একাধিক শরিক দলও। যা দেখে, শুনে রীতিমতো তাচ্ছিল্যের সুরে গত লোকসভা ভোটের প্রচারে নরেন্দ্র মোদিকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘আমার কাছে চারটি প্রধান জাত। মহিলা-তরুণ-কৃষক-গরিব।’ বিরোধীদের এই দাবিকে ‘শহুরে নকশালদের ভাবনা’ বলেও কটাক্ষ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আরও বলেছিলেন, এ হল ‘সমাজকে বিভাজনের চেষ্টা’। এই ধরনের দাবিকে ‘পাপ’ বলেও অভিহিত করেন তিনি। তাঁর দলের ‘পোস্টার বয়’ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জাতি গণনার দাবিকে ‘দেশকে টুকরো করার চেষ্টা’ বলেছিলেন। তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘কাটেঙ্গে তো বাটেঙ্গে’। আরএসএসের ঘরের ছেলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গাদকারির নিদান ছিল, ‘যারা এই নিয়ে রাজনীতি করছে তাদের লাথি মেরে বের করে দেওয়া উচিত।’ কিন্তু রাজনীতিতে ভোট বড় বালাই। চলতি বছরের শেষে বিহার বিধানসভার ভোট। দু’বছর পর ভোট হবে উত্তরপ্রদেশের। এই দুই হিন্দিভাষী রাজ্যেই জাতপাতের অঙ্কে ভোটের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। তাই পহেলগাঁওয়ে ২৬ জন পর্যটকের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোটা দেশ যখন ফুঁসছে, প্রধানমন্ত্রী থেকে কেন্দ্রের প্রায় সব মন্ত্রী যখন পাকিস্তানকে পাল্টা মারের রক্তগরম করা হুমকি দিচ্ছেন, তখন ‘ভবি ভোলবার নয়’-এর আপ্তবাক্য মেনে সম্পূর্ণ ইউ-টার্ন নিয়ে আচমকা জাতি গণনার কথা ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সরকার। যা শুনে যোগী, নীতিন, অনুরাগ, নাড্ডা, স্মৃতির মতো পারিষদবর্গকে এখন বলতে শোনা যাচ্ছে, ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, বৈপ্লবিকও। কেউ এই ঘোষণায় আপ্লুত, কারও মতে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ। বিরোধীরা অবশ্য কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণাকে ‘নিজেদের দাবির জয়’ বলে মনে করছে।
ভারতে প্রতি দশ বছর অন্তর জনগণনা হয়। কিন্তু জাতি গণনা হয়েছিল প্রায় একশো বছর আগে ১৯৩১ সালে। জনগণনায় তফসিলি জাতি (এসসি) এবং উপজাতির (এসটি) সংখ্যা জানা গেলেও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসির গণনা হয় না। তাই সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া এই অংশের সংখ্যা ঠিক কত, তা জানার কোনও উপায় নেই। দ্বিতীয় মনমোহন সরকারের আমলে ২০১১ সালে ওবিসিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা জানতে একটি সমীক্ষা হয়েছিল। কিন্তু তার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আজও প্রকাশ করেনি মোদি সরকার। তবে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ মেনে সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় ওবিসিদের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু আছে। সব মিলিয়ে (এসসি, এসটি, ওবিসি) এখন সংরক্ষণের পরিমাণ ৪৯.৫ শতাংশ। কিন্তু ১৯৩১-এর জাতি গণনা এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল দেখে এটা প্রায় সকলেই নিশ্চিত যে জাতি গণনা হলে শুধু ওবিসিদের সংখ্যাই জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ ছাড়াবে। তার মানে, মোট সংরক্ষণও অন্তত ৭০ শতাংশের আশপাশে দাঁড়াবে। এই কারণেই সংরক্ষণের বর্তমান ৫০ শতাংশের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়ার দাবি তুলেছে বিরোধীরা। কিন্তু প্রশ্ন হল, জনগণনার সঙ্গে জাতি গণনার ঘোষণা হলেও কবে তা শুরু হবে, কবেই বা শেষ হবে— তা নিয়ে কিছু জানায়নি কেন্দ্রীয় সরকার। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে জনগণনা হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও শুরুই হয়নি। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের বাজেটে গণনার জন্য মাত্র ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখায় আশঙ্কা হচ্ছে, তবে কি জাতি গণনার গাজর ঝুলিয়ে বিহারের নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে চাইছে মোদির দল? সবই আসলে ফাঁকা আওয়াজ?
তবে বিজেপি তথা আরএসএসের এই পাল্টি খাওয়ার নেপথ্যের কারণ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কিন্তু ঘটনা হল, বিরোধীদের জাতি গণনার দাবিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুইয়েছে গেরুয়াবাহিনী। খোদ অযোধ্যার আসনে মন্দির নির্মাণ করেও পরাজয় এড়ানো যায়নি। অন্যদিকে, বিহারে নীতীশ কুমারের সরকার আগেই জাতি গণনা সেরে ফেলেছে। কংগ্রেস শাসিত একাধিক রাজ্যেও জাতি গণনা হয়ে গিয়েছে অথবা হওয়ার পথে। এই অবস্থায় চলতি বছরে বিহার এবং ২০২৭-এ উত্তরপ্রদেশে জয় নিশ্চিত করতে হলে বিরোধীদের মুখের গ্রাস কাড়তে জাতি গণনার ঘোষণা ছাড়া অন্য পথ ছিল না বিজেপির কাছে। যদিও এই সিদ্ধান্তে বিজেপির উচ্চবর্ণের নিশ্চিত ভোট ব্যাঙ্কে চিড় ধরার আশঙ্কা রয়েছে মোদির দলের। এই দুইয়ের মধ্যে ব্যালান্স করতে তাই জাতি গণনার ঘোষণা হলেও সংরক্ষণের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়ার বিষয়ে টুঁ শব্দটি করছে না শাসকদল বা সরকার। এ হল অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল। এখন দেখার, শাসক না বিরোধী— জাতি গণনার ঘোষণায় কার ব্যাটে রান ওঠে।