ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। স্বাধীন ভারত গ্রহণ করেছে রাষ্ট্র পরিচালনার সংসদীয় গণতান্ত্রিক মডেল। সুবিশাল আয়তন এবং বহু ভাষা ধর্ম ও মতের মানুষ নিয়েই ভারতবর্ষ। তাই এখানে গণতন্ত্রের অনুশীলনে অংশ নেয় বহু দল। ভারত যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকার গঠিত হয় প্রধানত দু’ভাবে—কেন্দ্রে এবং প্রতিটি রাজ্যে। এছাড়া গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ সুবিধা সমাজের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত এবং পুরসভার মতো স্থানীয় সরকার (লোকাল গভর্নমেন্ট) গঠনের প্রয়োজনীয়তাও মেনে নেওয়া হয়েছে। রাজ্যে রাজ্যে গঠিত হয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। স্থানীয় সরকার তৈরির ব্যাপারটা তারা দেখে। অন্যদিকে, বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। ভারত হল সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ। ভারতে ভোটার সংখ্যা ১০০ কোটির কাছাকাছি। তার ফলে ভারতই হল পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। এজন্য আমরা আত্মশ্লাঘা অনুভব করি।
কিন্তু ভোটকেন্দ্রে কিছু ভোটার দাঁড় করিয়ে ভোটগ্রহণেই গণতন্ত্রের মান নিশ্চিত হতে পারে না। নির্বাচনের মান নির্ভর করে ভোটগ্রহণ এবং ভোটগণনাসহ পুরো প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার উপর। সোজা কথায়, সমস্ত প্রকারের ভোট জালিয়াতি রুখে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন জরুরি। একটি নির্বাচিত সরকার তখনই সার্থক হতে পারে যখন নির্বাচিত জনপ্রতিধিরা নিষ্কলুষ ব্যবস্থার মাধ্যমে আইনসভায় প্রবেশাধিকার পান। কিন্তু রিগিং, ছাপ্পা প্রভৃতি রুখে দিয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার কথা বহুদিন ভাবাই যায়নি। কারণ গলদ ছিল গোড়ায়। বিভিন্ন রাজ্যে প্রকৃত ভোটারদের বঞ্চিত করে ব্যাপক হারে জাল ভোট পড়ত। এই ব্যাপারে সবচেয়ে দুর্নাম কুড়িয়েছিল বাংলায় লাল জমানা। হার্মাদ বাহিনী দিয়ে রিগিং, ছাপ্পাসহ রকমারি ভোট জালিয়াতিকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছিল সিপিএম। বিরোধীদের অভিযোগ, টানা ৩৪ বছরের বাম জমানার আসল রহস্য ছিল ভোট লুট। বাংলাসহ সারা দেশে ‘গণতন্ত্র হত্যা’ রুখতে প্রথম তৎপর হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যুব কংগ্রেস নেত্রী হিসেবে তিনিই প্রথম সব ভোটারের জন্য সচিত্র পরিচয়পত্র (এপিক) চালু করার দাবি তোলেন। এই দাবি আদায়ের জন্য ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তিনি রাইটার্স অভিযানের ডাক দেন। সেই গণআন্দোলন ভাঙতে জ্যোতি বসুর পুলিস নিরীহ নিরস্ত্র যুব কংগ্রেস কর্মীদের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। পুলিসের গুলিতে লাল হয়ে গিয়েছিল সেদিন মহানগরের রাজপথ। নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল ১৩টি তাজা প্রাণ এবং জখম হয়েছিলেন আরও কয়েকজন। পরবর্তীকালে সারা দেশেই এপিক চালু করেছে ইসিআই এবং সেটি দেখিয়েই এখন সবাই ভোট দেন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গেও ‘পরিবর্তন’ এসেছে—বিদায় হয়েছে সিপিএমের জগদ্দল শাহি। এর পিছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভারতের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বাংলার অগ্নিকন্যার এই ভূমিকা ঐতিহাসিক এবং তা ইতিমধ্যেই স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়েছে।
আর সেই মমতার বাংলাকে এখন ঘুরপথে দখল করতে মরিয়া বিজেপি। এজন্য এবার তারা ঘুঁটি সাজাচ্ছিল ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণের নামে। অবশ্য বিতর্কিত এনআরসি চালুর ছক বলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশময়। কারণ এই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াটির সূচনা বিহার দিয়ে। সন্দেহ, ধাপে ধাপে বাংলায় এবং অন্যান্য রাজ্যেও ‘অনুপ্রবেশের’ চেষ্টা। এই শুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায় প্রথমে চাওয়া হয়েছিল ভোটারদের বাবা-মায়ের জন্মতারিখ ও জন্মস্থানের প্রমাণপত্র। জানামাত্রই গর্জে ওঠেন তৃণমূলনেত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফ দাবি, বিহার তো বাহানা, নির্বাচন কমিশনের আসল টার্গেট বাংলাই। আসলে তৃণমূল সমর্থকদের বাদ দিয়ে, ‘বহিরাগত’দের নাম ভোটার তালিকায় ঢোকানোর ষড়যন্ত্র করছে মোদি সরকার। সরব হন বিহারের বিরোধী দলনেতা আরজেডির তেজস্বী যাদবও। এরপরই ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নিয়ে ঢোক গিলতে বাধ্য হল ইসিআই। সোমবার রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে তারা জানিয়ে দিল, বিহারে ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের কোনও নথি দিতে হবে না। স্রেফ এনুমারেশন ফর্ম ভরলেই চলবে। এমনকী, তাঁদের সন্তানরাও বাবা-মায়ের নথি দেওয়ার হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছেন। তবে নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ আর এনুমারেশন ফর্ম ‘ফিল-আপ’ করতে হবে। কমিশন এখন ডিগবাজি খেলেও পুরো দুশ্চিন্তা কিন্তু দূর হয়নি। এই ব্যাপারে আগামী দিনেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। স্বচ্ছতা অবশ্যই কাম্য, কিন্তু স্বচ্ছতার বাহানায় কিছু প্রকৃত ভোটার (চিহ্নিত এবং নাপছন্দ) বঞ্চনার শিকার হলে তা হবে মারাত্মক অন্যায়। আগামী দিনে এই সন্দেহজনক ব্যবস্থায় কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’কেই পুষ্ট করবে।