শিবাজী চক্রবর্তী, কলকাতা: পড়ন্ত বেলায় গেরস্থ পাড়া আরও শুনশান। বাঘাযতীনের গৌরাঙ্গ মন্দির রোডের শেষ মাথায় পাঁচিল ঘেরা বাড়িটা সবুজে সবুজ। আম, নারকেল, পেয়ারা গাছের ফাঁকে জাফরি কাটা রোদ। একটানা ডেকে চলা কোকিলের মতো বাড়ির বাসিন্দারাও কিছুটা নিঃসঙ্গ। জীবনের গোধূলিতে আনন্দঘরেই তাঁদের অবসরযাপন। ছিমছাম এই বৃদ্ধাশ্রম ইস্ট বেঙ্গলের প্রাক্তন সচিব কল্যাণ মজুমদারের বর্তমান ঠিকানা। ৮৫ ছুঁইছুঁই প্রবীণ দীর্ঘদিন ধরেই বেশ অসুস্থ। যোধপুর পার্কের ভাড়াবাড়ি ছেড়ে নিঃশব্দেই ঠাঁই নিয়েছেন এখানে। ‘কেমন আছেন?’ বারান্দার চেয়ারে হেলান দিয়ে ম্লান হেসে কল্যাণ বললেন, ‘আনন্দঘরে বেশ আনন্দেই আছি রে ভাই...।’
ঝলমলে চাকুরি জীবন। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের দাপুটে কর্তা। অন্যদিকে পাঁড় ইস্ট বেঙ্গল সমর্থক। ফ্লাইটের টিকিট পেতে ক্লাবের সমস্যা? কল্যাণই মুশকিল আসান। অবসরের পর শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকার ও স্বপন বলের আগ্রহে পুরোদস্তুর জড়িয়ে পড়েন ইস্ট বেঙ্গল প্রশাসনে। আদিবাড়ি পদ্মাপারের নোয়াখালি। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় চলে আসেন এই বাংলায়। চেনাশোনা নেই। আত্মীয়বাড়িই ভরসা। তার উপর কাঁটাতারের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত হৃদয়। এক বর্ষার বিকেলে মনমরা ছেলেটার জীবনে নতুন টুইস্ট। পাড়াতুতো বন্ধুর জোরাজুরিতে পৌঁছে যাওয়া ইস্ট বেঙ্গল মাঠে। টইটম্বুর গ্যালারি যেন সমুদ্রে ভাসমান ছোট্ট ডিঙি। হাওয়ায় আপ্পারাও , সালের নাম। কানের কাছে মুখ নিয়ে বন্ধু বলেছিলেন, ‘দেশভাগ এদের জীবন থেকেও কেড়ে নিয়েছে সবকিছু। ইস্ট বেঙ্গলই আমাদের আশ্রয়। আমাগো ক্লাব।’ সেদিন থেকে কল্যাণের জীবনের রংও লাল-হলুদ। তাই আশক্ত শরীরেও নিয়মিত হাজির হতেন তাঁবুতে। কিন্তু বয়স থাবা বসিয়েছে শরীরে। বিরাটির পৈতৃক বাড়ির অধিকার এককথায় ছেড়ে দিয়েছেন ভাইকে। কল্যাণ বড় ক্লান্ত, রিক্ত। জীবন সায়াহ্ণে বই আর ইস্ট বেঙ্গলই ওঁর অক্সিজেন। কবিগুরুর লেখনী ধার করে কল্যাণ বলে ওঠেন-‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান, গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।’