Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

কলতলা

কলতলাটা আমার চোখেই পড়েনি। একে অন্ধকার, তার উপর শুকনো পাতা, জট পাকানো শিরা-উপশিরার মতো ঘাস, বাঁধানো মেঝের ফাটলে নিম-বটের চারা সব মিলিয়ে একেবারে যাচ্ছে তাই অবস্থা। তবে নলকূপটা দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজার মতো। দেখেই গলা শুকিয়ে গেল।

কলতলা
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০

ধ্রুব মুখোপাধ্যায়: কলতলাটা আমার চোখেই পড়েনি। একে অন্ধকার, তার উপর শুকনো পাতা, জট পাকানো শিরা-উপশিরার মতো ঘাস, বাঁধানো মেঝের ফাটলে নিম-বটের চারা সব মিলিয়ে একেবারে যাচ্ছে তাই অবস্থা। তবে নলকূপটা দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজার মতো। দেখেই গলা শুকিয়ে গেল। দু’হাতে হাতল চেপে ঝুলিয়েই দিলাম নিজেকে। আর অমনি মুমূর্ষু রোগীর মতো নলকূপ চেঁচিয়ে উঠল, ‘ছেড়ে...দে রে...বাবা রে’। জল না পড়লেও আওয়াজটাতে কিন্তু দম ছিল। কলকব্জা হয়তো ঠিকই আছে। এই ভেবেই আবারও চাপ দিলাম। কিন্তু আবারও সেই। লাথি মেরে পালাতেই যাচ্ছিলাম। ‘কে বটিস রে?’ ডাকটা আটকে দিল। যাত্রাপালায় গাল বসে যাওয়া, খড়খড়ে চুলের লোকগুলোকে, ঝকমকে পোশাকের নবাব সাজালে যেমন লাগে এই জায়গাটা ঠিক তেমনই। নামেই মফস্‌সল! সরু রাস্তা, বাল্ববিহীন ইলেকট্রিকের পোল আর পথচারীর কানা মামা বলতে গৃহস্থের দরজা-জানলার ফাঁকফোকর দিয়ে ছিটকে আসা আলো। সেই আলোতেই রাজত্ব করছে কলতলা। পাশেই একটা দোতলা বাড়ি। বাড়িটাতে জানলা-দরজার ফাঁকফোকর খুঁজছিলাম আমি। আর তক্ষুনি সেই গলাটাই, ‘এই যে হিথা!’ বললে আমার আর অসুবিধা হয়নি। বারন্দায় এক মহিলা, সাদা শাড়ি আর ধবধবে সাদা চুলে আমায় ভূত দর্শন করিয়ে দিলেন। তবে এটুকুই। এর বেশি আর কিছুই দেখতে পাইনি। ‘হ্যাঁ। বলুন’ বলে বারান্দার কাছাকাছি গেলে মহিলা খেঁকিয়েই বললেন, ‘পাড়াতে লতুন নাকি?’ মানুষের আবার নতুন পুরনো। জিনিস নাকি! ‘কেন আপনার কী?’ বলতে গিয়েও বলিনি। অন্ধকার ততক্ষণে সয়ে গিয়েছে। মহিলাকে দেখে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। স্কুল যাওয়ার সময় আমার মা-ও ঠিক এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকত। এমনকী ফেরার সময়ও। বাবার ছিল সকালে অফিস। আমি তাই ইস্কুলে গেলে একাকিত্বের সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে আমার মা ঠিক এভাবেই লোক দেখত। এখনও অবশ্য দেখে। তবে এখন মা নয়, উল্টে রাস্তার লোকেই মাকে দেখে। যাকগে, বেশি ইমোশনাল হয়ে কাজ নেই। হেসেই বললাম, ‘হ্যাঁ। আজকেই এলাম।’ কিন্তু মহিলা বড্ড ঠ্যাঁটা। কোথায় একটু জল দেবে তা না, মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘সে আমি বুঝেছি। নাহলে কেউ এই কলের হাতল ধরে! যাক্‌গে, তা কাদের ঘরে?’

Advertisement

‘সুমনবাবুদের’ বলে আমি এবার প্যাডেলটা অ্যাডজাস্ট করে দু-পা ঝাঁপিয়ে চাপব বলে সাইকেলটাকে ঠেলেই দিচ্ছিলাম, কিন্তু মহিলা আবারও বললেন, ‘আরে যেছ কোথা? জল নিতে এয়েছিলে তো?’ 
‘কলতলায় কী মধু নিতে আসব!’ বলতে গিয়ে আবারও থেমে গেলাম। তবে চুপ থাকিনি, ‘বাড়িতে এক ফোঁটাও জল নেই। এত রাতে দোকানপাটও বন্ধ, এদিকে মালিকরাও নেই। সেজন্যই জল খুঁজতে বেরিয়েছি। তেষ্টাও পেয়েছে।’ কিন্তু বুড়ি গলল না। একেবারে ক্যাটক্যাট করে বলল, ‘তা জল নাও।’ শুনে ভিতরটা জ্বলে গেল। ‘গোঙানি ছাড়া এই কলে আর কিছু বেরয়?’ খানিকটা চেঁচিয়েই বললাম। বুড়ি শুনে আরও চেঁচিয়ে বলল, ‘বেরবে। চেষ্টা কর। এত অধজ্জি কীসের?’
ধুর! এ নির্ঘাত পাগল! পালাতে পারলে আমি বাঁচি। কিন্তু পালাতে পারলে তো। বুড়ি একপ্রকার হুকুম করেই আমাকে বাধ্য করল কলের হাতল ধরে ঝুলতে। ঝুললামও। আর বার চারেক ঝুলতেই খানিকটা আয়রনওয়ালা লাল জল আর তারপরেই মিরাকল। ‘খেলে কিছু হবে না তো?’ ভয়ে জিজ্ঞেস করতে বুড়ি এমনভাবে বলল, ‘এই খেয়েই তো জীবন কাটালাম। তোমার প্যাটেও সওয়া উচিত’ যেন নলকূপের নীচে বুড়ি নিজেই হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনের সাপ্লাই দেয়। যাইহোক মরলে মরব। মরার আগে তেষ্টাটুকু তো মেটাই। এই ভেবেই পাম্প করে, দৌড়ে, দু’হাতে জল ধরে, পেট ভরে খেলাম। আহা! প্রাণ জুড়িয়ে গেল। বুড়িও যেন শান্ত হল। ‘আহাঃ, খুব তিস্‌সে লেগেছিল বুঝি?’ বুড়ি বললেও আমি কান দিইনি। জল খেয়ে, চোখে-মুখে ঝাপটা দিয়ে সঙ্গে আনা জ্যারিকেনটাকে রেখে শুরু করলাম পাম্প করা। এপাশে আমি, মাঝে গিজার, জেট স্প্রে-র যুগে বেমানান একটা নলকূপ আর ওপাশে বুড়ি।
—তা চাকরিবাকরি জুটেছে নাকি বাপের ভরসায়?
—চাকরি করি। নতুন পোস্টিং।
—অ। তা বাড়ি?
—গদাধরপুর।
—দিনের-দিনে যাওয়া যায় না?
—যায়, কিন্তু বিকেলের পরে বাস নেই।
—ওহ। তা এখানে একাই নাকি ঘরের লুকগুলাকেও এনেছ?
—লোক বলতে তো খালি মা। আসতে চাইল না।
—কেনে আসবে? পরিচিত মুখ নাই, কথা বলার জো নাই, কোথাও যাবার জাগা নাই। এই মাঝ রেতে তোমার মায়ের জল তিস্‌সে পেলে কী করত? ভেবেছ?
বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। মা তো একা-ই। ‘কী হল? দুশ্চিন্তা? সে করে আর কী লাভ?’ বলে বুড়ি বলতেই থাকল, ‘কলতলাটা তৈরির সময় আমি একেবারে ঘর মাথায় তুলেছিলাম বুঝলে। কিন্তু কাকু তোমার নাছোড়বান্দা ছিলেন। বাইরেই থাকতেন আর ঘরে তখন আমি আর আমার সাত বছরের ছেলে। পাড়া প্রতিবেশী জল নিতে এলে দু’দণ্ড কথা কয়ে মন হালকা হবে বলে ছাড়লই না। মিনিসপাল্টির লুকগুলাকে দিয়ে একেবারে বাসিয়েই ছাড়ল। দিন নেই, রাত নেই ঘড়াং ঘড়াং আওয়াজে একেবারে জান জ্বলিন দিলে। রেতেও ঘুমোতে দিত না। সকাল থেকে দুনিয়ার লুকের লাইন। ভাতের হাঁড়ির খবর, অফিসের কূটকাচালি, ছেলেপুলেদের মাস্টারের খবর, দেশের খবর সব এই বারন্দাতে বসলেই সোজা কানে। খবরের কাগজের বাবারও সাদ্দি নেই এত খবর লিখবার। প্রথমে গা জ্বললেও পরে অবিশ্যি সইয়ে গেল। তারপর ছেলেটেও যখন কাজে চলে গেল, তখন তো বেশ ভালোই লাগত। কলের এই আওয়াজ যেন জীবন্ত। মনেই হতো না যে ঘরে আমি একা।’ এতটা বলে বুড়ি কিছুক্ষণ থামল। তারপর আবার বলল, ‘ওহে ছোকরা, তোমার জ্যারিকেন যে উপচে পড়ছে হে। এই বয়সে এত ভাবনা কীসের?’ আসলে আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বুড়ির সবেতেই সমস্যা! পাত্তা না দিয়েই জ্যারিকেনটা নিয়ে পালিয়ে আসছিলাম, আবারও আটকাল। ‘কী ভাবছিলে?’ প্রশ্নটা ততক্ষণে দু’বার করে ফেলেছে। উত্তরও দিয়েই দিলাম, ‘আসলে আমাদের বাড়ির সামনেও মিউনিসিপ্যালিটির লোক কলতলা বসাতে এসেছিল। কিন্তু আওয়াজের ভয়ে আমি আর বাবা বসাতে দিইনি। তবে মায়ের ভীষণ ইচ্ছে ছিল। এককালে কলতলার জন্য মা জিদ পর্যন্ত করত। সেটাই ভাবছি। এখন বাবাও নেই। কিন্তু কলটা থাকলে হয়তো আপনারই মতো মায়েরও নিজেকে একা লাগত না।’ 
—অ! তা একখান বসিন দাও!        
—আর বসিয়ে কী লাভ! আজকাল কি আর কেউ কলতলায় আসে?
—কেনে! তুমি তো এলে। এরকমই কেউ আসবে। পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। এই দেখ কী সুন্দর খানিক কথা কয়ে নিলাম।
বলে বুড়ি অদ্ভুতভাবে হাসল। আর তারপরেই কোথায় ঢুকে গেল। যেন ভ্যানিস করে দিল কেউ। বাবা, বাঁচা গেল! এই ভেবেই আমি রাস্তায় সাইকেলটার দিকে পা বাড়িয়েছি কী একটা ছেলে একেবারে তেড়েমেড়ে বলল, ‘রাস্তাটা সাইকেল রাখার জায়গা?’ আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললাম, ‘এই রাস্তায় ক’টা লোক যাতায়াত করে ভাই?’
—এই তো আপনি করছিলেন। আমি করছি। আরও লোক চাই? ডাকব?
ছেলেটা পা বাড়িয়ে ঝগড়া করলেও আমি আর পারছিলাম না। কিন্তু ব্যাটা নাছোড়বান্দা। ‘কী করছিলেন এখানে? আগে তো দেখিনি!’ খেঁকিয়ে বলাতে আমি কিছুটা গুটিয়েই বললাম, ‘জল নিতে এসেছিলাম।’ কিন্তু ‘জল’ শব্দটা শুনে ছেলেটা এমন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল যেন আমি একটা পাগল।
—আরে দাদা, এখানে জল কোথায়? এই কল তো কবে থেকে খারাপ। দেখে বোঝেন না।
—সে তো আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম, কিন্তু বার কয়েকের ঝাঁকুনিতে বেশ ভালোই জল পড়ল।
—বলেন কী? এই কল থেকে জল! কই বের করে দেখান তো দেখি।
ছেলেটার চ্যালেঞ্জটা আমার বেশ ভালোই লাগল। বুক ফুলিয়ে জ্যারিকেন খুলে ছেলেটাকে দেখাতেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু ভিতর ছ্যাঁত করে উঠল। জ্যারিকেনটা খালি! মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল আমার। তবে ছেলেটা ততক্ষণে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছিল। ‘দাদা, একটু খুলে বলবেন’ বলে এগিয়ে এলে। আমি ওকে পুরো ঘটনাটা বললাম। আর ঘটনাটা শুনেই ছেলেটা কে জানে কেন অবাক হবার বদলে মুষড়ে পড়ল। ‘আমাকে কেন যে দেখা দেয় না’ বলেই বলতে শুরু করল, ‘এই বাড়িটা আমাদের। আর যাঁকে আপনি দেখেছেন তিনি আমার মা। বছর তিনেক হয়ে গেল গত হয়েছেন।’ ভিতর আমার হালকা ততক্ষণে। তবে ছেলেটা থামেনি, ‘একাই থাকত। এই কলতলাটাই ছিল মায়ের জীবনসঙ্গী। মৃত্যুর বছর দুয়েক আগে কলটা খারাপ হয়ে গেলে, মা নানান জায়গায় দরখাস্ত করেছিল। কিন্তু কেউ পাত্তা দেয়নি। অগত্যা জোরাজুরিটা শুরু করেছিল আমার আর বাবার উপর। আমারও সিরিয়াসলি নিইনি। কেনই বা নেব? বারোয়ারি নলকূপ। নিজের গ্যাঁটের টাকায় কে সারায় বলুন? একা একা থেকে মানসিক রোগ ধরাল। তারপর আর বেশিদিন থাকেনি। আজ পর্যন্ত আমরা কিন্তু কিছুই টের পাইনি তবে পাড়াতে নতুন লোক এলেই এরকম ঘটনা ঘটে। যদিও কারও কোনও ক্ষতি করেনি কখনও। বলছি, আপনি আমার বাড়িতে জ্যারিকেনটা ভরে নিয়ে যান। ভয় নেই।’ ভয় একটা আমি পেয়েছিলাম বটে তবে সেটা ওই মহিলাকে নিয়ে নয়। বরঞ্চ আমার নিজের মাকে নিয়ে। এই কলতলাটা চোখে না পড়লেও, গদাধরপুরের বাড়ির সামনের কলতলাটা ততক্ষণে আমার চোখের সামনে একেবারে স্পষ্ট।

সম্পর্কিত সংবাদ