পোশাকি নাম ‘স্বচ্ছতা’। দেশের ভোটার তালিকা নিয়ে হাজারো অভিযোগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির। শাসক বিজেপির অভিযোগের বহরও কম নয়। অতএব একটা স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির অভিপ্রায় ঘোষণা করে ইন্টেনসিভ রিভিশনের কাজে হাত দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। বিহার রাজ্য থেকে যা শুরু হয়েছে। কিন্তু মাত্র এক মাসে বিহারের ২৪৩টি বিধানসভা আসনের ইন্টেনসিভ রিভিশনের কাজ শেষ করে যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে নির্বাচন কমিশনের ‘স্বচ্ছতা’ নিয়েই বড়সড় প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা! এতদিন ভোটার তালিকায় ভুয়ো ভোটার, মৃত ভোটার থাকার কথা শোনা যেত। কমিশনের ইন্টেনসিভ রিভিশনের পর নতুন সংযোজন ‘ভুয়ো ঠিকানা’! সেইসঙ্গে হাজার হাজার বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। কীরকম? বিহারের খসড়া তালিকায় এমন তিন লক্ষ ভোটার পাওয়া গিয়েছে যাদের বাড়ির নম্বর (ঠিকানা) ০.০০ বা ০০০! এই ‘০’ নম্বর ঠিকানার বাসিন্দারা বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে ছড়িয়ে রয়েছেন বলে অভিযোগ। আবার বিহারের জামুই জেলার চৌডিহা পঞ্চায়েতের আমিন গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ৩ নম্বর বাড়ির ঠিকানায় ভোটারের সংখ্যা ২৩০ জন, জানাচ্ছে খসড়া ভোটার তালিকা। অভিযোগ উঠেছে, নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির নামে রাজ্যের বাহাদুরপুর কেন্দ্রের বন্ধ বস্তি গ্রামের ৫৯ জন আসল ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এদের ২০ জন গ্রামেই বসবাস করেন।
নির্বাচন কমিশনের ‘স্বচ্ছতা’র সাক্ষ্য বহন করছেন বিহারের বর্তমান এনডিএ সরকারের উপ মুখ্যমন্ত্রীই! খসড়া তালিকায় উপ মুখ্যমন্ত্রী বিজয়কুমার সিনহার দু’টি বিধানসভা কেন্দ্রের অধীনে দু’টি পৃথক এপিক নম্বরের ভোটার কার্ড নাকি রয়েছে। কেন্দ্র দুটি হল বাঁকিপুর ও লক্ষ্মীসরাই। দুটি এপিক কার্ডে বয়স যথাক্রমে ৫৭ এবং ৬০ বছর। উপ মুখ্যমন্ত্রী দু’টি কার্ড থাকার কথা মেনে নিয়েছেন। এর আগে একইসঙ্গে দুটি ভোটার পরিচয়পত্রও থাকার কথা শোনা গিয়েছিল সে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা লালুপুত্র তেজস্বী যাদবের কাছে। মজার কথা হল, দু’টি ক্ষেত্রেই দুই শীর্ষ নেতার কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তাদের নিজেদের অপদার্থতার কোনও ব্যাখ্যা দিতে শোনা যায়নি কমিশনের তরফে। বিহারের ইন্টেনসিভ রিভিশনের নামে জনজাতি, আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিহার নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যেই গত সপ্তাহে রাহুল গান্ধী রীতিমতো ‘প্রমাণ’ দিয়ে দাবি করেছিলেন, কর্ণাটকে ভোটে জেতার জন্য কীভাবে ভোটার তালিকায় পাঁচরকমভাবে ‘কারচুপি’ করা হয়েছে। এবার ওড়িশা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি কমিশনের তথ্য উল্লেখ করে অভিযোগ করেছেন, গত বছর তাদের রাজ্যে একইসঙ্গে লোকসভা ও বিধানসভা ভোট হয়েছে। ভোটদানের জন্য শেষ সময়সীমা বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে ৪২ লক্ষ ভোট পড়েছে!
সব মিলিয়ে তাই ভোটার তালিকাকে ‘স্বচ্ছ’ করার যে ঘোষণা করেছে কমিশন, তাকে ছাপিয়ে বড় করে দেখা দিয়েছে কমিশনের স্বচ্ছতার প্রশ্ন। বিজেপিকে সুবিধা করে দিতে কমিশন ‘ভোট চুরি’কে মদত দিচ্ছে— এই বক্তব্যতে সোচ্চার হয়ে সংসদ থেকে রাজপথে বিরোধী দলগুলি। ইন্টেনসিভ রিভিশন নিয়ে কমিশনের অতিরিক্ত তৎপরতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। একই ইস্যুতে সোমবার কমিশন কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচির কার্যত শুরুতেই বিরোধী সাংসদদের আটক করেছে অমিত শাহের দিল্লি পুলিস। বিরোধী সাংসদরা স্লোগান তুলেছেন, ‘ভোট চুরি’ বন্ধ কর কমিশন। ‘চুপি চুপি, কারচুপি’। বিরোধী সাংসদরা রাজপথেই ধর্নায় বসেন। যাঁদের উপর নির্বাচনী গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব, সেই কমিশনের গায়ে এমন ‘কেলেঙ্কারি’র অভিযোগের দাগ লাগাটা মোটেই স্বাস্থ্যসম্মত বা কাঙ্ক্ষিত লক্ষণ নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যিই যে, কমিশন এই ‘কলঙ্ক’ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি। বিরোধীদের অভিযোগ সত্য না অসত্য তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু কমিশনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ওঠা নিঃসন্দেহে কাম্য নয়। একটি সংবিধান সম্মত স্বাধীন স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে তারা আদৌ নিজেদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তৈরি করতে কতটা আগ্রহী— ঘটনা পরম্পরা দেখে সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সুতরাং তড়িঘড়ি ইন্টেনসিভ রিভিশন, ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগের পাহাড়, কমিশনের ‘সন্দেহজনক’ ভূমিকা নিয়ে সরকারবিরোধী পক্ষের লড়াই আপাতত বন্ধ হওয়ার নয়। দেখার এটাই, সাম্প্রতিক বিতর্কে দেশের সর্বোচ্চ আদালত শেষ পর্যন্ত কী রায় দেয়। এবং কমিশন তার নিরপেক্ষ স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রক্ষার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কি না। তা না হলে গণতন্ত্রই বিপন্ন হবে।