অগ্নিভ ভৌমিক, চাপড়া (মহৎপুর): লাল পতাকা পুঁতে দিলেই চরের খাস জমি চলে যেত নকশালদের জিম্মায়! ভয় দেখিয়ে দখল করে নিত রায়ত জমিও। জমি হারিয়ে বঞ্চিত হতো প্রকৃত চাষিরাই। দখলীকৃত সেই জমিতে চাষ করতে হলে নকশাল নেতাদের কাছে অনুমতি নিতে হতো। জমিদার-বিরোধী লড়াইয়ে নকশাল নেতারা আদতে চাষিদেরই জমিহীন করে দেয় বলে অভিযোগ। এই অঘোষিত ‘জমিদারি প্রথা’ গ্রামের পরিবেশকে খারাপ করে তোলে। জমি দখলকে সামনে রেখেই চরমহৎপুর ও মহৎপুর মৌজার বাসিন্দাদের সম্পর্ক বিষিয়ে ওঠে। নকশাল নেতাদের ইন্ধনেই নাকি সেই জমিতে হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও। অতীতে একাধিকবার জমি-বিবাদ নিয়ে সেখানে জারি হয় ১৪৪ ধারা। বর্তমানে সেখানকার ১২০০বিঘা জমিতে চাষাবাদ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
১৯৭৪ সালের মাঠ খসড়ার পর, নতুন করে রায়ত জমির রেকর্ড পেয়ে দুই মৌজার চাষিরাই চাষ করতে শুরু করেছিলেন। জলঙ্গির ওপারে চরমহৎপুর মৌজায় রায়ত জমির বেশিভাগই ছিল চাপড়া ব্লকের মহৎপুর মৌজার পুখুরিয়ার চাষিদের। এরই মধ্যে ধীরে ধীরে কৃষ্ণনগর-২ ব্লক অর্থাৎ ধুবুলিয়ার নকশালপন্থী নেতারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯৯২ সালে চরমহৎপুর এলাকায় ওঠা চরের খাস জমিতে থাবা বসায় তারা। অভিযোগ, নিয়মের তোয়াক্কা না করেই তাদের সমর্থকদের মধ্যে জমি বিলিয়ে দেওয়া হয়। দখল করে নেওয়া হয় মহৎপুরের পুখুরিয়া গ্রামের চাষিদের রায়ত জমি।
গ্রামবাসীদের কথায়, নকশালদের দাপটে কার্যত ব্যাকফুটে চলে যান মহৎপুরের চাষিরা। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে চাপড়া ব্লকে কংগ্রেসের পঞ্চায়েত সমিতি তৈরি হলে পুনরায় তাঁরা অক্সিজেন পান। ২০১১ সালে রাজ্যজুড়ে পালাবদলের আঁচ পড়ে চরমহৎপুর ও মহৎপুরের জমি বিবাদেও। ক্রমশ চরমহৎপুর মৌজায় নকশালদের রাশ আলগা হতে থাকে। তবে মাঝেমধ্যে জলঙ্গির দু’পাড়ে চাষিদের মধ্যে বিবাদ লেগেই থাকত। তা বড় আকার ধারণ করে ২০১৪ সালে। হারানো রাশ ফেরাতে মরিয়া নকশালরা মহৎপুরের চাষিদের উপর চড়াও হয়। তখন দুই মৌজার মানুষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। প্রাণ যায় এক চাষির। এই ঘটনায় চরমহৎপুর ও মহৎপুরের ১২০০বিঘা জমি নিয়ে বিবাদ পুলিসের খাতায় নথিভুক্ত হয়। তৎকালীন এক পুলিস আধিকারিকের কথায়, ‘বিভিন্ন সময় অশান্তির জেরে ওই এলাকায় একাধিকবার ১৪৪ ধারা লাগু হয়েছিল। পুলিস ক্যাম্প বসানো হয়েছিল। পুলিসি টহলদারিও চলত।’
মহৎপুরের চাষিদের জন্য লড়ছেন তৃণমূল নেতা শাহিদুল শেখ। তিনি বলেন, ‘১৯৯২ সালে নকশালরা এই জমি দখল করে নিয়েছিল। তারপর আমরা লড়াই করে জমিতে চাষের সুযোগ পাই। কিন্তু আবার সেই অসাধু নকশালদের জন্যই ২০২১ সাল থেকে চাষবাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমাদের গ্রামের চাষিরা সরকারি জমিতে চাষ করতে চায় না। তারা যাতে ফের রায়ত জমিটুকুতে চাষ করার সুযোগ পায়, সেই চেষ্টাই আমরা করছি।’
মহৎপুরের চাষি লিয়াকত শেখ বলেন, ‘নিজের জমিতেই চাষ করতে পরি না। আমাদের এখানে সবাই চাষি পরিবার। সামনেই পাট চাষের মরশুম। এখন চাষ শুরু না করলে খুব সমস্যা হবে।’ (চলবে)