Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সারদা মায়ের জগদ্ধাত্রী পুজো

মা জগাই, আসছে বছর আবার এসো। আমি তোমার জন্য সারা বছর ধরে সব জোগাড় করে রাখব। —প্রতিমা বিসর্জনের সময় মা জগদ্ধাত্রীর কানে মুখ রেখে এই প্রার্থনাই জানিয়েছিলেন শ্যামাসুন্দরী দেবী, মানে শ্রীশ্রীমা সারদা দেবীর মাতা। শ্যামাসুন্দরী দেবী স্বপ্নাদিষ্ট হয়েই তাঁদের জয়রামবাটির ভিটেতে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা করেন।

সারদা মায়ের জগদ্ধাত্রী পুজো
  • ২৯ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: মা জগাই, আসছে বছর আবার এসো। আমি তোমার জন্য সারা বছর ধরে সব জোগাড় করে রাখব। —প্রতিমা বিসর্জনের সময় মা জগদ্ধাত্রীর কানে মুখ রেখে এই প্রার্থনাই জানিয়েছিলেন শ্যামাসুন্দরী দেবী, মানে শ্রীশ্রীমা সারদা দেবীর মাতা। শ্যামাসুন্দরী দেবী স্বপ্নাদিষ্ট হয়েই তাঁদের জয়রামবাটির ভিটেতে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা করেন। পরবর্তীকালে অক্ষয়চৈতন্য মহারাজ পঞ্জিকা ঘেঁটে সিদ্ধান্ত করেন যে, সেখানে এই পুজোর শুরু ১২৮৪ বঙ্গাব্দ বা ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে। 

Advertisement

এই পুজোর ইতিবৃত্ত বেশ চমকপ্রদ। শ্রীশ্রীমা-ই শুনিয়েছেন সেই কাহিনি। গ্রামে বারোয়ারি কালীপুজো হতো। তার জন্য চালের জোগান দিতেন শ্যামাসুন্দরী দেবী। কিন্তু একবার (১৮৭৭) নব মুখুজ্যে নামে এক ব্যক্তি ‘আড়াআড়ি করে’ সেই চাল দিতে দিলেন না। সেই দুঃখে শ্যামাসুন্দরী দেবী সারারাত কাঁদলেন: কালীর জন্যে চাল করেছি, আমার চাল নিলে না! এই চাল খাবে কে? এ তো অন্যরাও খেতে পারবে না।
সেই রাত্রে দেবী জগদ্ধাত্রী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিলেন। লাল রং তাঁর! দরজার ধারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছেন। দেবীই শ্যামাসুন্দরীকে ডেকে তুলে আশ্বস্ত করলেন, কাঁদছ কেন? ওই চাল আমিই খাব। তোমার ভাবনা কী? আমি জগদম্বা, জগদ্ধাত্রীরূপে তোমার পুজো নেব। সকালে মেয়েকে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, আরে সারদা, লাল রং, পায়ে পা ঠেসান দিয়ে ও কী ঠাকুর? শ্যামাসুন্দরী দেবী অতঃপর সংকল্প ঘোষণা করেন, আমি জগদ্ধাত্রী পুজো করব। এই প্রসঙ্গে শ্রীমা ভক্তদের কাছে বলেন, জগদ্ধাত্রী পুজো করব, জগদ্ধাত্রী পুজো করব—তাঁর একটা বাই হয়ে গেল! ওই পুজোর আয়োজনের সুন্দর বর্ণনা পাওয়া গিয়েছে শ্রীমায়ের মুখেই। বিশ্বাসদের কাছ থেকে 
দু-আড়া (প্রায় ১৩ মণ) ধান আনা হল। কিন্তু বৃষ্টির বিরাম নেই। শ্যামাসুন্দরী দেবী বললেন, মা, কী করে তোমার পুজো হবে! ধানই শুকোতেই পারলাম না। শেষটায় মা জগদ্ধাত্রী এমন রোদ দিলেন যে, চারিদিকে বৃষ্টি হলেও তাঁর চাটাইয়ে রোদ! কাঠ 
জ্বেলে সেঁকে সেঁকে মূর্তি শুকনো করা হল। রং দেওয়া হল। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণকে এই পুজোর খবর পাঠানো হল। তিনি জয়রামবাটিতে আসতে না-পারলেও পুজোর খবর শুনে খুব খুশি হলেন। শ্রীশ্রীঠাকুর এও বললেন, বেশ বেশ, পুজো করগে। তোদের ভালো হবে। শ্রীমা জানাচ্ছেন, জগদ্ধাত্রী পুজো হল। দেশাম (দেশসুদ্ধ নিমন্ত্রণ) হল। ওই চালেই সব খরচপত্র কুলিয়ে গেল। কিন্তু শ্যামাসুন্দরী দেবীর আকাঙ্ক্ষা মিটল না। তাই বিসর্জনের সময়ই মা জগদ্ধাত্রী মূর্তির কানে কানে তিনি কাতর আর্জি রাখলেন, মা জগাই, আর বছর আবার এসো। আমি তোমার জন্য সমস্ত বছর ধরে সব জোগাড় করে রাখব। সারদা মা জানাচ্ছেন, পরের বছর তাঁর মা তাঁকে বললেন, দেখ, তুমিও কিছু দিয়ো, আমার জগাইয়ের পুজো হবে। শ্রীশ্রীমা প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, অত ল্যাঠা আমি পারব না। পুজো একবার তো হল। আবার কেন? 
কিন্তু এই কপট রাগ শ্রীশ্রীমা ধরে রাখতে পারেননি। সেই রাতেই দেবী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দেন। তিনজন এসে হাজির তাঁর কাছে! শ্রীশ্রীমা বলছেন, ওরে বাপ! সেই মনে পড়ছে, জগদ্ধাত্রী ও জয়া-বিজয়া সখী। তাঁরা শুধোচ্ছেন, আমরা কি তবে চলে যাব? কে তোমরা?—শ্রীশ্রীমা শুধাতেই জবাব পেলেন, আমি জগদ্ধাত্রী। শ্রীশ্রীমা তখন আর কী করবেন! বললেন, না, তোমরা কোথায় যাবে? তোমরা থাকো। তোমাদের যেতে বলিনি। অর্থাৎ জয়রামবাটিতে পুজো বজায় রয়ে গেল। শ্রীশ্রীমা জানাচ্ছেন, সেই থেকেই জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় তিনি বরাবর জয়রামবাটি চলে আসতেন। 
সংসারে লোকজনের বড়ো অভাব। পুজোর বাসনকোশন মাজতে মাকে আসতেই হতো। মাজামাজির হ্যাপা দূর করতে পরে যোগীন মহারাজ (স্বামী যোগানন্দ) অবশ্য কাঠের বাসনের ব্যবস্থা করে দেন। পরে সেখানে জগদ্ধাত্রী পুজোর জমির ব্যবস্থাও হয়ে যায়। শ্রীশ্রীমায়ের মাতৃদেবী ছিলেন যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। পুজোর সমস্ত জিনিসপত্র তিনি গুছিয়ে যাকে বলে একেবারে পরিপাটি করে রাখতেন। 
এই প্রসঙ্গে জানানো যায়, শ্রীশ্রীমায়ের একবার ভীষণ পেটের অসুখ হয়েছিল। ক্রমে তাঁর শরীর যায় যায় অবস্থা আর কী! দুর্বল শীর্ণকায় শরীর নিয়ে যেখানে সেখানে শুয়ে পড়তেন। উঠে বসার শক্তিটুকুও থাকত না। একদিন পুকুরের জলে নিজের এই চেহারা দেখে এতটাই বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন যে, মনে মনে বলছেন, আরে ছিঃ! এই দেহ তবে আর কেন? এখানেই দেহখানি থাক। দেহ ছাড়ি!
কেউ একজন দেখতে পেয়ে সারদা মাকে বাড়ি নিয়ে গেল। নিকটস্থ এক সিংহবাহিনী মন্দিরে গিয়ে তাঁকে হত্যে দেওয়ার পরামর্শ দেন তাঁরই এক ভাই। শ্রীশ্রীমা তাতে রাজি হয়ে তাঁর মায়ের সঙ্গে সেখানে যান। দেবী তাঁদের দেখা দিয়ে কিছু ওষুধও দেন। সেই ওষুধ প্রয়োগেই শ্রীশ্রীমা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠেন বলে জানান। সিংহবাহিনী যে বড়ো জাগ্রতা, এই বিশ্বাস এরপর তাঁর মধ্যে দৃঢ়মূল হয়। 
বস্তুত দ্বিতীয় বছর থেকে জয়রামবাটির জগদ্ধাত্রী পুজো অতি অভাবনীয়রূপে শ্রীশ্রীমায়ের নিজের পুজোয় পরিণত হয়। তিনি অন্য জায়গায় থাকলেও পুজোর সময় অবশ্যই জয়রামবাটি পৌঁছে যেতেন। কোনোবার কোনও কারণে তাঁর পক্ষে আসা অসম্ভব হলে অন্য লোক পাঠিয়ে পুজোর ব্যবস্থা করে ফেলতেন। যেমন ১৯০৪ সালে শ্রীশ্রীমা নিজে থাকতে পারেননি। সেবক আশুতোষ মিত্র এবং ভাই বরদাপ্রসাদকে কলকাতা থেকে জয়রামবাটি পাঠান। সাধ্যমতো খরচখরচাসহ পুজোর ব্যবস্থাও করেন তিনি। এই পুজো উপলক্ষ্যে বহু ভক্তও যেতেন সেখানে। যেমন ১৮৯১ সালে পুজোর সামগ্রীসমেত শরৎ মহারাজ এবং কয়েকজন ভক্ত গিয়েছিলেন। ১৯০৪ সালের আগে—সুধীর মহারাজ (স্বামী শুদ্ধানন্দ) এবং স্বামী সোমানন্দ জগদ্ধাত্রী পুজোয় জয়রামবাটি গিয়েছেন। তবে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত, স্থানীয় ভক্তের তুলনায় বাইরের ভক্তসমাগম কমই হতো। একটি বিবরণে পাওয়া যায়, ১৯০৯ সালে পুজোর সময় মা আক্ষেপ করছেন, ভক্তরা কেউ এলো না! 
অবশ্য তার অল্প পরেই একজন ভক্তকে নিয়ে স্বামী অরূপানন্দ সেখানে পৌঁছোন। 
শ্রীশ্রীমায়ের বাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোর বিশেষত্ব হল, সেখানে বরাবর তিনদিনের পুজো হয়। এর সঙ্গে সূচনাবর্ষের দিনক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রথমবার পুজোর পরদিন ছিল বৃহস্পতিবার। তাই শ্যামাসুন্দরী দেবী প্রতিমা বিসর্জন চাননি। সেদিনও যথারীতি পুজোপাঠ চলে। আবার তার পরদিন ছিল মাস পয়লা। ফলে সেদিনটিও বিসর্জনের পক্ষে প্রশস্ত ছিল না। তাই দেবী পুজো পেলেন সেদিনও। তার পরের দিন পুজো শেষে প্রতিমা নিরঞ্জন হয়।
সেই থেকেই জয়রামবাটিতে তিনদিনের জগদ্ধাত্রী পুজো হচ্ছে। কালীকৃষ্ণ মহারাজের (স্বামী বিরজানন্দ) লেখায় ১৮৯১ সালের পুজোর বিবরণ পাওয়া যায়। মায়ের বাড়িতে পুজো হয়েছিল ঢাক-কাঁসর বাদ্যের সঙ্গে ষোড়শোপচারে। দ্রব্যসম্ভার ও ভোগরাগে হয়েছিল মহাসমারোহ। দুই রাতে যাত্রাগান হয়েছিল। চারিদিকের গ্রাম ভেঙে লোক এসেছিল সেই পালা দেখতে। ডাকের সাজের জগদ্ধাত্রী প্রতিমাটি হয়েছিল বৃহৎ ও চিত্তাকর্ষক। প্রতিদিন সন্ধ্যারতি এবং মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোর সময় শ্রীশ্রীমা করজোড়ে দাঁড়িয়ে পুজো দেখতেন। কখনও কখনও চামর ব্যজন করতেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। দশমীতে আমোদর নদে বিসর্জনের দৃশ্য ছিল করুণ। শ্রীশ্রীমা এবং মেয়ে ভক্তগণ কেঁদে আকুল হতেন।  
প্রতিবছর প্রতিমা বিসর্জনের আগে দেবীর একটি কানের দুল খুলে রেখে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। শ্রীশ্রীমা ভক্তদের বলতেন, কানের একটা গয়না খুলে রাখবে, মা সেটা মনে করে আবার আসবেন। শ্রীশ্রীমা শেষবার পুজো করেছিলেন ১৯১৯ সালে। নির্দিষ্ট গয়নাটি খুলে প্রতিমার কানে কানে সারদামা বলেছিলেন, মা গো, আবার এসো। 
তাঁর অবর্তমানেও জয়রামবাটিতে এই পুজো যাতে স্থায়ীভাবে বজায় থাকে তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও শ্রীশ্রীমা করে গিয়েছেন।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ মাস্টারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, জগদ্ধাত্রী রূপের মানে জানো? 
ঠাকুরই উত্তর দিয়েছিলেন, যিনি জগৎকে ধারণ করে আছেন। তিনি না ধরলে, তিনি না পালন করলে জগৎ পড়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। মনকরীকে যে বশ করতে পারে, তারই হৃদয়ে জগদ্ধাত্রী উদয় হন।
তখন রাখাল মন্তব্য করেন, মন-মত্ত-করী!
কথার পিঠে ঠাকুর বললেন, সিংহবাহিনীর সিংহ তাই হাতিকে (করী) জব্দ করে রয়েছে।
দেবী জগদ্ধাত্রী বধ করেছিলেন করীন্দ্রাসুরকে। যুদ্ধের সময় মহিষাসুর নানারূপ ধরে দেবীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিল। অসুর হাতির রূপ ধরতেই দেবী চতুর্ভুজা হলেন। চক্র দিয়ে তিনি উড়িয়ে দিলেন হাতির মাথা। দেবীর বাহন সিংহের পায়ের কাছে ছিন্ন হস্তীমুণ্ডটি থাকে। এই কারণে দেবী জগদ্ধাত্রী করীন্দ্রাসুরনিসূদিনী নামে পরিচিত। দেবীর এটাই জগদ্ধাত্রী রূপ! জগদ্ধাত্রীর মূর্তির সঙ্গে মহিষাসুর নেই। উপবিষ্টা এই দেবীর সঙ্গে লক্ষ্মী-সরস্বতী, কার্তিক-গণেশও অনুপস্থিত। পরিবর্তে আছেন জয়া-বিজয়া। পূজাবিধি, বোধন বাদ দিয়ে, অনেকাংশে দুর্গাপুজোর মতোই। শোনা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ দীক্ষাদানের সময় সারদা মায়ের জিভে জগদ্ধাত্রী মন্ত্র লিখে দিয়েছিলেন। একবার স্বামী হরিপ্রেমানন্দ মাকে জগদ্ধাত্রী রূপে দেখে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। আবার ভক্ত চন্দ্রমোহন দত্ত একবার মায়ের জগদ্ধাত্রী রূপ দর্শনে ধন্য হন। স্বামী বিবেকানন্দ তো শ্রীমাকে সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রীই মনে করতেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ