ভারতের শতাধিক কোটি মানুষ গরিব এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্গত। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের ওঠানামায় তাদের জীবনযাপন বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। কারণ তাদের হাতে বাজে খরচ করার মতো কানাকড়িও থাকে না। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মাস তাদের রীতিমতো হিসেবনিকেশ করে চলতে হয়, না-হলে মাসের শেষে পড়তে হয় মস্ত সমস্যায়। এত মানুষের সমস্যার মূল কারণ—কম রোজগার। বহু পরিবারেই এক বা একাধিক বেকার যুবক-যুবতি। চাকরিজীবীসহ যারা রোজগেরে তাদের প্রকৃত মজুরি অনেক বছর যাবৎ স্থির হয়ে আছে, ভোগব্যয় বৃদ্ধির উপযোগী করে আয় বাড়ছে না। এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে ভালো থাকার জন্য গৃহস্থকে একটু চালাকির আশ্রয় নিতে হয়। প্রকৃত আয় যখন থমকে থাকে অথচ বেড়ে যায় জিনিসের দাম তখন গৃহস্থকে খরচ কমাতে হয়। খরচ কমানোর জন্য তারা প্রয়োজনীয় জিনিসও কম পরিমাণে কেনে অথবা কোনও কোনও আইটেম বাদ রেখেই দিন বা মাস চালিয়ে নেয়। জরুরি প্রয়োজনেও ট্যাক্সি, রিকশা প্রভৃতি চড়ে না। এড়িয়ে চলে এসি বাস এবং ট্রেনে উচ্চ শ্রেণিতে ভ্রমণ। এমনকী নিতান্ত জীবনসংশয় উপস্থিত না-হলে ডাক্তার দেখানো বা চিকিৎসা পরিষেবা গ্রহণের সঙ্গেও আপস করে তারা।
অর্থনীতিবিদরা হিসেব করে দেখেছেন, গৃহস্থের দায়ে পড়ে এই কৃচ্ছ্রসাধনের অত্যন্ত বিরূপ প্রভাব পড়ে উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বাজারের উপর। জিডিপি এবং আর্থিক বৃদ্ধি নিয়ে আরবিআই, এসবিআই, আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক প্রভৃতির পূর্বাভাস ফেল করে। দেশের অর্থমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রীর লম্বাচওড়া ভাষণ দিনের শেষে চুপসে যায়। সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে শাসক দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। আমাদের দেশে রাজ্যে রাজ্যে এবং কেন্দ্রে সরকার তৈরি হয় বহু দলীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। সেখানে প্রতিটি নির্বাচনে শাসককেও দেশবাসীর মুখোমুখি হতে হয়। তখন এই অর্থসংকটের দায় মেনে নেওয়া ছাড়া সরকারের উপায় থাকে না। হাজার চাতুরি করেও পার পায় না শাসক দল। লোকসভা নির্বাচন এখনও বেশ দূরে। কিন্তু বিহার, বাংলা, অসম, কেরল ও তামিলনাড়ু রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে—আগামী নভেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে। এই রাজ্যগুলিতে শাসকের জয়-পরাজয় আগামী লোকসভা নির্বাচনের জন্য বিরাট ইঙ্গিত রেখে যাবে। তাই মোদি সরকার মানুষের মনজয়ে এখন মরিয়া। দেশে জিএসটি চালু হয়েছিল আট বছর আগে। এই গুরুত্বপূর্ণ কর সংস্কার তড়িঘড়ি করতে গিয়ে গোটা সিস্টেমটাই রয়ে যায় ভুলে ভরা। তার চরম মাশুল গুনেছে দেশবাসী, পরিণামে সাড়ে সর্বনাশ হয়েছে অর্থনীতির। মান্য অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন। সংসদে বিরোধী দলগুলি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক মুখ্যমন্ত্রীও দাবি করেছিলেন জিএসটি নামক ‘কর-সন্ত্রাস’ থেকে দেশবাসীকে রেহাই দিতে হবে। জিএসটি সংস্কার করে কর হার নামিয়ে আনতে হবে মানুষের সহ্যসীমার মধ্যে। কিন্তু মোদি সরকার দীর্ঘদিন তাতে কান দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। কিন্তু একাধিক রাজ্যে ভোটের মুখে অর্থনীতির নৌকা ভয়ানক টলমল হতেই প্রমাদ গুনলেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার ভাষণে ‘দীপাবলির উপহার’ ঘোষণা করলেন নরেন্দ্র মোদি। কী সেই আনমোল তোফা? জিএসটির হারে ব্যাপক ছাড়। অবশেষে সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত কর ছাড় ঘোষণা কার্যকর হয়েছে ২২ সেপ্টেম্বর। কিন্তু বাজারে গিয়ে গৃহস্থ দেখছে, ব্যাপারটা ‘বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া’ মাত্র। জিনিসের দাম কমা নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী প্রচারে যে ঝড় তুলেছিলেন তার সঙ্গে বাস্তবের মিল কই? নয়া হারে জিএসটির বিলে ঝঞ্ঝাট মারাত্মক। বিশেষ করে রয়ে গিয়েছে প্রযুক্তিগত সমস্যা। কিছু ক্রেতার অভিজ্ঞতায় ধরা পড়েছে যে, পুরোনো স্টকের জিনিস আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। ফলত, বিভিন্ন বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই জিএসটি নিয়ে বাড়তি উৎসাহ উধাও। বিশেষ করে ছোটোখাটো জিনিসের জিএসটি রেট নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। ওষুধ এবং সারের দাম কমা নিয়েও বহাল রয়েছে সংশয়-জটিলতা। বহু বিভ্রান্ত ক্রেতার প্রশ্ন, জিএসটি ‘ছাড়’ প্রদানের ‘লোকসান’ পুষিয়ে নিতে কিছু ক্ষেত্রে জিনিসের খুচরো দাম (এমআরপি) বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে না তো? কেন্দ্রের নজরদারি কমিটি কি মানুষের দুর্ভোগ, বঞ্চনা এবং সংশয় নিরসনে আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হবে? না-হলে মোদিজি যাকে ‘সাশ্রয় উৎসব’ বলে জাহির করেছেন, সরকারিভাবে লোক ঠকানোর কারবারে পর্যবসিত হবে সেটাই। দেশবাসী কিন্তু এই জিনিস প্রত্যাশা করে না।