তন্ময় মল্লিক: নোট দিয়ে ভোট কেনা কি তাহলে আইনসিদ্ধ হয়ে গেল? বিহারের নির্বাচন এই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ভোটের মুখে মহিলাদের ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। বিরোধীরা নির্বাচনী বিধিভঙ্গের অভিযোগ জানিয়েছিল। কিন্তু, কমিশন আমল দেয়নি। নির্বাচন ঘোষণার পরে টাকা দিলেও মন্ত্রিসভা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সুবাদে এটা নাকি ‘অন গোয়িং প্রজেক্ট’। নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে শেষ কথা বলার হক একমাত্র কমিশনেরই আছে। একটা সময় ক্রিকেট মাঠেও আম্পায়ারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ছিল। আম্পায়ার ভুল আউট দিলেও ব্যাটসম্যান মাঠ ছাড়তে বাধ্য হতেন। তাতে উঠত বারোজনে খেলে ম্যাচ জেতার অভিযোগ। তবে, এখন সেটা হয় না। সৌজন্যে থার্ড আম্পায়ার। অনেকে বলছেন, বিজেপি ম্যাচ জিতছে। কিন্তু হজম করতে হচ্ছে ‘বারোজনে’ খেলার কটাক্ষ। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন ব্যবস্থাতেও কি ‘থার্ড আম্পায়ার’ আবশ্যক হয়ে পড়ছে!
বিহারের নির্বাচনে বিপুল সাফল্য পেয়েছে এনডিএ জোট। এই সাফল্যের জন্য রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা নীতীশ কুমারের মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনাকেই সবচেয়ে বেশি নম্বর দিচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচনের মুখে মহিলাদের ১০ হাজার টাকা দেওয়ায় খেলা ঘুরে গিয়েছে। টাকা দেওয়ার কারণেই মহিলা ভোটদানের হার বেড়ে ৭১ শতাংশ হয়েছে। সেই মহিলাদের একটা বড়ো অংশের সমর্থন গিয়েছে এনডিএ জোটের দিকে।
বিহারের কত মহিলা ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন, তা সরকারিভাবে জানানো হয়নি। তবে লক্ষ লক্ষ মা-বোন এই টাকা পেয়েছেন। প্রশান্ত কিশোরের দল জন সুরাজ পার্টির দাবি, সংখ্যাটা প্রায় দেড় কোটি। দাবি সত্যি হলে এই খাতে সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। সেটাও নাকি দেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকায়। এককথায়, নীতীশ কুমার ঋণ করে ঘি খাওয়ার পরিকল্পনা আগেই করে রেখেছিলেন। ঘিয়ের স্বাদ যে তিনি চেটেপুটে উপভোগ করেছেন, সেটা বলাই বাহুল্য।
ভোট হয় নোটে। এমন একটা কথা চা বাগান, কোলিয়ারি, বস্তি এলাকায় বহু বছর ধরে চালু আছে। মূলত নির্বাচনের কয়েকদিন আগে ক্যাশ বিলি শুরু হয়। তা আটকাতে সতর্ক থাকে সমস্ত রাজনৈতিক দল। প্রতিপক্ষ দল যাতে নোট দিয়ে ভোট ম্যানেজ করতে না পারে, তারজন্য বহু জায়গায় রাতপাহারাও দেয়। নির্বাচন কমিশনও ভোটে টাকার খেলা বন্ধ করতে চায়। তারজন্য প্রতিটি নির্বাচনের আগে ব্যক্তিগতভাবে সর্বাধিক কত টাকা সঙ্গে রাখা যাবে, তা ঠিক করে দেয়। তার জন্য নাকা চেকিং হয়। তল্লাশির সময় কোটি কোটি টাকা উদ্ধারও হয়। দেশজুড়ে এই ঘটনা ঘটে।
নির্বাচন কমিশনের নজর থাকে নতুন কাজ শুরুর দিকেও। সরকার যাতে ভোটারদের প্রভাবিত করতে না পারে, তারজন্যই নতুন কোনও কাজ করতে দেওয়া হয় না। নির্বাচনী বিধি লাগু হলে জনপ্রতিনিধিরা সরকারি প্রকল্পে যোগ দিতে পারেন না। নতুন রাস্তা, ড্রেন নির্মাণ করা যায় না। তাতে উন্নয়ন ব্যাহত হয়। বিশেষ করে বাংলায়। কারণ এখানে ভোট হয়
সাত আট দফায়। ভোট চলাকালীন খরা পরিস্থিতি তৈরি হলেও নলকূপ বসানো যায় না। টিউবওয়েল বসাতে গেলে নিতে হয় কমিশনের অনুমতি। অবাধ
ও নিরপেক্ষ ভোটের স্বার্থেই কমিশন এই সমস্ত বিধি চালু করেছে। সমস্ত রাজনৈতিক দল তা মেনে চলে। কিন্তু কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করেই বিহারের নির্বাচনের মুখে মহিলাদের এককালীন ১০ হাজার টাকা দেওয়া হল। অথচ কমিশন নীরব। এটা কি বজ্র আঁটুনির ফস্কা গেরো, নাকি নিজের বেলায় আঁটিসাঁটি পরের বেলায় দাঁত কপাটি?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখনই কোনও সামাজিক প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন তখনই বিরোধীরা তাকে ‘ডোল পলিটিক্স’ বলে কটাক্ষ করেছেন। বিজেপি প্রতিটি প্রকল্পকে তীব্র আক্রমণ করে গিয়েছে। তবে, তাদের সবচেয়ে বেশি রাগ হয়েছিল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার চালু করায়। বঙ্গ বিজেপি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে ‘ভিক্ষে’ বলে কটাক্ষ করেছিল। কেউ কেউ আবার লাইনে দাঁড়ানো মহিলাদের ভিখারির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এখন সেই বিজেপিই বলছে, বাংলায় ক্ষমতায় এলে তাঁরা মহিলাদের তিন হাজার টাকা অনুদান দেবে।
তবে বিহারের মহিলা রোজগার যোজনার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা সামাজিক প্রকল্পগুলির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নীতীশ কুমার এই টাকা দিয়েছেন এককালীন। পরের বছরেও দেবেন, এমন কথা জানাননি। কিন্তু বাংলায় কোনও ‘তৎকাল প্রকল্প’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চালু করেননি। চালু করা কোনও প্রকল্প বন্ধ হয়নি। শুধু তাই নয়, সরকারি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা যাতে বেশি সংখ্যক মানুষ পায় তারজন্য ক্যাম্প পর্যন্ত করা হয়। সামাজিক প্রকল্পের টাকায় বহু মা, বোন সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালান। তাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কারও চোখে ‘ডোল’ হলেও বহু পরিবারের কাছেই তা উত্তরণের সোপান।
‘ভোটের রাজনীতিতে এক ভয়ংকর প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ভোটের জন্য মানুষকে বিনা পয়সায় রেবড়ি (মিষ্টি) খাওয়ানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। কিন্তু এভাবে সরকারি টাকা ধ্বংস করে ভোট কেনা হলে রাস্তাঘাট, এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির টাকা মিলবে কীভাবে?’ কথাগুলি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। সময়টা ২০২২ সালের জুলাই মাস। উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ডে এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছিলেন, রাজনীতিতে দান খয়রাতির সংস্কৃতি দেশের জন্য বিপজ্জনক। তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের নাম নেননি। তবে, লক্ষ্য যে বিরোধীরা ছিল, তাতে কোনও সংশয় নেই। বিজেপি নেতৃত্ব বারবার ঘোষণা করেছে, তারা ভোটের জন্য রেউড়ি রাজনীতি করবে না। কিন্তু বাস্তবে কী দেখা যাচ্ছে? বিজেপি ও তার জোট সরকারের ক্ষমতা দখলের অস্ত্র হয়ে উঠছে তথাকথিত দান খয়রাতির রাজনীতি।
পরিসংখ্যান বলছে, ওড়িশায় সুভদ্র প্রকল্পের সুবিধা পান প্রায় এক কোটি মহিলা। খরচ হয় প্রায় সাড়ে আটশো কোটি টাকা। মহারাষ্ট্রে লড়কি বহিন যোজনায় প্রায় আড়াই কোটি মহিলা সুবিধা পান। সরকারের ব্যয় হয় দেড় হাজার কোটি টাকা। এছাড়া মধ্যপ্রদেশে প্রায় এক কোটি ৩০ লক্ষ মহিলার জন্য এক হাজার আড়াইশো কোটি টাকা এবং অসমে প্রায় ৪০ লক্ষ মহিলার জন্য সরকার খরচ করে এক হাজার আড়াইশো কোটি টাকা।
এখন প্রশ্ন হল, একদিন যাকে প্রধানমন্ত্রী ‘রেউড়ি রাজনীতি’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন এখন তাকেই বিজেপি আঁকড়ে ধরছে কেন? এর কারণ নরেন্দ্র মোদির দেওয়া অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই পূরণ হয়নি। সুইস ব্যাঙ্কে গচ্ছিত ভারতীয়দের কালো টাকা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। বছরে দু’কোটি বেকারের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ বেকারত্ব শিখর ছুঁয়েছে তাঁরই আমলে। ব্যাংক সংযুক্তিকরণের জেরে চাকরির রাস্তা সঙ্কুচিত হয়েছে। রেলে লক্ষ লক্ষ পদ ফাঁকা রয়েছে। নিয়োগ হচ্ছে না। সেনা বাহিনীতেও একই অবস্থা। জঙ্গি মোকাবিলার উদ্দেশ্যেই হয়েছিল নোটবন্দি। অথচ তাঁরই আমলে একের পর এক জঙ্গিহানার ঘটনা ঘটেছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে মোবাইল নম্বর যুক্ত করা বাধ্যতামূলক হয়েছে। তাতে সাধারণ মানুষের কতটা সুবিধে হয়েছে বলা কঠিন। কিন্তু সাইবার প্রতারকরা নিমেষের মধ্যে অ্যাকাউন্টে থাকা লক্ষ লক্ষ টাকা হাওয়া করে দিচ্ছে।
সরকার মহিলাদের টাকা দিলে তাকে সাধুবাদ জানানোই উচিত। কিন্তু সেটা ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের রাজ্যে হলে প্রশ্ন তো উঠবেই। কারণ বিজেপি এমনভাবে প্রচার করে, ডাবল ইঞ্জিন সরকার মানেই সব সমস্যা থেকে মুক্তি। বেকারের চাকরি হবে। কোনও অভাব থাকবে না। দুর্নীতি থাকবে না। খুলে যাবে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত। তা সত্ত্বেও ভোটে জেতার জন্য ‘রেউড়ি’ রাজনীতিতেই ভরসা কেন? আসলে দিন যত যাচ্ছে বিজেপির গিমিকের রাজনীতি মানুষের কাছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদিও বুঝেছেন, স্বপ্নের ফানুস উড়িয়ে মানুষকে খুব বেশি দিন বোকা বানিয়ে রাখা যাবে না। তাই জেতার জন্য তিনি যে ‘রেউড়ি’ রাজনীতির বিরোধিতা করেছিলেন তাকেই আঁকড়ে ধরছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেখানো পথ তাঁকে অনুসরণ করতে হচ্ছে। জওহরলাল নেহরুর রেকর্ড ছোঁয়া মোদিজির জীবনে এর চেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে!