Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘পেশেন্ট পার্টি’ ডাক কি আদৌ সম্মানের?

‘‘আমাদের মাস্টারমশাইরা শেখাতেন, বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কীভাবে কথা বলবে। ভাই, বোন, দাদা, দিদি, কাকা, জ্যাঠা, এমনকী বাবা, মা এই সম্বোধনেও আমরা ডাকতে শিখেছি রোগীদের।

‘পেশেন্ট পার্টি’ ডাক কি আদৌ সম্মানের?
  • ২৩ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বজিৎ দাস: ‘‘আমাদের মাস্টারমশাইরা শেখাতেন, বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কীভাবে কথা বলবে। ভাই, বোন, দাদা, দিদি, কাকা, জ্যাঠা, এমনকী বাবা, মা এই সম্বোধনেও আমরা ডাকতে শিখেছি রোগীদের। শুধু শেখা কেন বলব, এমনটাই হওয়া উচিত সহজাত। রোগী না থাকলে আমরা কীসের ডাক্তার! এত ঠাট-বাট গাড়ি-বাড়ি, সবেরই তো উৎস সেই এক—রোগী! তাছাড়া তাঁরা তো এই সমাজেরই মানুষ। অচেনা লোকের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলে, কথা বললে, আমরা কী বলে ডাকি? বয়স বুঝে দাদা বা ভাই, দিদি বা বোন বলি না? এটাই তো বাংলার সংস্কৃতি? আমাদের বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকেই শেখা। আর এখানে ‘পেশেন্ট পার্টি’ শব্দটার কোন‌ও জায়গা নেই।’’ বলছিলেন ‘ডাক্তারদের ডাক্তার’ বলে পরিচিত নব্ব‌ই ছুঁই ছুঁই ফিজিশিয়ান ডাঃ সুকুমার মুখোপাধ্যায়।

Advertisement

সুকুমারবাবুর কথায়, ‘‘কীভাবে রোগীর বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে হবে, শেখানো দরকার আছে ডাক্তারদের। আর তা শেখাতে হবে এমবিবিএস কারিকুলামের মধ্যেই। ‘পেশেন্ট পার্টি’ কোন‌ও সম্বোধন হতে পারে না। বাড়ির লোক বলে ডাকো। কাকা, জ্যাঠা, ভাই, বোন, দিদি, কাকিমা বলে ডাকো, খুব কেতাদুরস্ত হলে, ‘রিলেটিভস’ বলতে পারো। দরকার হলে চিন্তা করো নতুন সম্মানজনক কোনও সম্বোধনের কথা ভাবো। কখনও ‘পেশেন্ট’, কখনও ‘পার্টি’—এগুলো ডাকার ধরন হল?’’
আসা যাক ‘পেশেন্ট’ শব্দের উৎস সন্ধানে। তাহলে হয়তো আমরা বুঝতে পারব, রোগীদের আর একটু বেশি সম্মান‌ই প্রাপ্য। ‘পেশেন্ট’ (patient) শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘patiens’ বা ‘পাতিয়েন্স‌’ থেকে। অর্থ হল—আমি ভুগছি বা কষ্ট পাচ্ছি বা যন্ত্রণায় আছি—‘I am suffering’। যিনি কষ্ট পাচ্ছেন, যিনি যন্ত্রণা পাচ্ছেন, যিনি ‘পেশেন্ট’—রোগী, তাঁকে সম্বোধন করা হচ্ছে ‘পেশেন্ট’ বলেই। আর তাঁর বাড়ির লোকজন এলে বলা হচ্ছে ‘পার্টি’ বা ‘পেশেন্ট পার্টি’। এত অব্দি কোন‌ও ভুল নেই। বলতেই পারেন, পেশেন্ট’কে ‘পেশেন্ট’ বলেই ডাকব। নয়তো কী বলে ডাকব? 
আসলে সমস্যাটা সম্ভবত ‘পেশেন্ট’ বলে ডাকা নিয়ে নয়। ডাকার ধরন নিয়ে। অধিকাংশ সময়ই ‘পেশেন্ট’ কিন্তু চিকিৎসককে সম্মোধন করছেন‌ ‘স্যর’ বলে। ‘স্যর’ অর্থাৎ মহাশয়। পুরুষ হলে ‘ডাক্তারবাবু’, মহিলা হলে ‘ম্যাডাম’ বা মহাশয়া। রীতিমতো সম্মানের সঙ্গে। তবে ব্যতিক্রম‌ও আছে। কিন্তু সিংহভাগ চিকিৎসক যে রোগীদের সম্মোধনের বেলায় ব্যতিক্রমটাই সাধারণ করে রেখে ছেড়েছেন। 
নিজের পেশার মানুষজনের সঙ্গে কথোপকথনে ‘দুটো পেশেন্ট আছে’, ‘একটা পেশেন্ট আছে’, ‘দশটা পেশেন্ট আছে’, ‘পেশেন্টটা’কে একটু দেখে আসি, ‘পেশেন্টটা’ খারাপ আছে এইসব তো আকছার বলেন‌ই, বাড়ির লোকজনকে সিংহভাগ ক্ষেত্রেই সম্বোধন করেন ‘পার্টি’ বা ‘পেশেন্ট পার্টি’ ডাকে। যেন আজব কিসিমের কোন পশু-পাখি অথবা জন্তু এসেছে! রাজনৈতিক দল না হয়েও বাড়ির লোকজনকে ‘পার্টি’ বা বাড়ির লোকজনের রাজনৈতিক দল অথবা ‘পেশেন্ট পার্টি’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে! তাঁরা কিন্তু সিংহভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসককে সম্বোধন করার বেলায় কম মর্যাদা দেন না। 
তাহলে সমস্যাটা কোথায়? কঠিন পরীক্ষা এবং ততোধিক কঠিন পাঠক্রমে কৃতকার্য হওয়ায় বহু চিকিৎসক কি ধরেই রেখেছেন, রোগী যেমনই হন না কেন, যে পেশা থেকেই আসুন না কেন—মেধা, বুদ্ধি, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, হয়তো 
বা অর্থে আসলে তাঁদের থেকে তলার সারিতে? তাই যেন তেন সম্মোধনে তাঁদের ডাকা যেতেই পারে? বা হাসপাতালে যখন এসেছেন, তখন তাঁরা চিকিৎসকদের করুণাপ্রার্থী? কোন‌ও বাড়ির লোক যদি, কোন‌ও রোগী যদি চিকিৎসকের সঙ্গে কথোপকথনের সময়, ‘হ্যাঁ ডাক্তার’, ‘হ্যাঁ ডাক্তার’, ‘আচ্ছা ডাক্তার’ এইভাবে বলতে থাকেন, ‘টি’, ‘‘টা’, ‘খানি’, ‘খানা’ অব্যয় মুহূর্তে মুহূর্তে ব্যয় করেন, ডাক্তারদের ভালো লাগবে কি?
বছর কয়েক আগে লখনউ-র কিং জর্জস মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় চিকিৎসকদের দুটি বিষয়ে দুর্বলতা দূর করবার জন্য। একটি হল, ‘অ্যাটিটিউড’। অন্যটি ‘কমিউনিকেশন’। দুয়ে মিলে ‘অ্যাটকম’। 
বাড়ির লোকজনকে রোগীর মৃত্যুসংবাদ দেওয়া হবে কীভাবে, হঠাৎ তৈরি হওয়া ক্ষোভ বা উত্তেজনা প্রশমিত করবার উপায় কী, কোনও কঠিন রোগের কথা কীভাবে জানাতে হবে—এই সমস্ত কৌশল শেখানো শুরু হয়েছে শিক্ষক চিকিৎসকদেরই। তাঁরা শিখছেন, ট্রেনার তৈরি হচ্ছেন। নিজ নিজ রাজ্যে গিয়ে আবার অন্য চিকিৎসকদের শেখাচ্ছেন। 
রোগীকে বোঝানোর বেলায় ‘চুপ’ করে থাকা আর যাই হোক আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভালো চিকিৎসকের লক্ষণ 
হতে পারে না। আমার উচ্চশিক্ষা আছে, তাই ভালো জনসংযোগের ক্ষমতা না থাকলেও চলবে, ডিগ্রি দেখে সুস্থ হয়ে যাবেন রোগীরা, সেই দিন গিয়েছে। তার মানে যে দুরন্ত বলিয়ে-কইয়ে হতেই হবে, রোগী দেখলেই কথার 
ফুলঝুরি ছুটবে, এমনটা কোনও রোগীই চান না সম্ভবত। তাঁরা চান, ডাক্তারবাবু বা ডাক্তার ম্যাডাম যেন সময় 
নিয়ে ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবার পর রোগটি চিহ্নিত বা নিদেনপক্ষে অনুমান করতে পারেন। যতটা সম্ভব কম টেস্ট বা রক্তপরীক্ষা করতে দেন। এবং কী অসুখবিসুখ হয়েছে বা হতে পারে, সুন্দর করে তা বুঝিয়ে বলেন। আরেকটি বিষয় পেলে সব পাওয়াই পূরণ হয়। সেটি হল ভালো ব্যবহার, দুটো মিষ্টি কথা, ভরসা জোগানো, রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের আত্মবিশ্বাস দেওয়া। 
কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছে, বহুক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস দেওয়া পরের কথা, যাঁদেরকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকদের রুজি-রুটি, যেন-তেন প্রকারে তাঁদেরকে সম্বোধন করা হচ্ছে। বহু সার্জন তো আরও একধাপ এগিয়ে। রোগী মানে তাঁদের কাছে ‘কেস’। দু’জন সার্জনের কথোপকথন শুনলে স্পষ্ট হয়ে যাবে, তাঁদের একাংশ রোগীকে কী চোখে দেখেন! ‘আমার দুপুর আড়াইটায় একটা কেস আছে,’ ‘রোববারে’ও কেস করা ছাড়ছিস না! ‘আজকে ১২ নম্বর কেস হল!’ মানেটা পরিষ্কার, রোগীর কাছে জীবনমৃত্যুর প্রশ্ন হলেও, চিকিৎসকদের একাংশের কাছে তা নেহাতই সংখ্যা ছাড়া কিছুই নয়!
অথচ এই ‘সংখ্যা’ না থাকলে মেডিকেল কলেজগুলির ঝাঁপ বন্ধ করে দিতে হতো। প্রাইভেট হাসপাতালগুলির ব্যবসাই বন্ধ হয়ে যেত। আরও কী কী হতো আর হতে পারত, কমবেশি সকলেই জানেন। কারণ, আউটডোর চলাকালীন সিনিয়র চিকিৎসকরা এই সংখ্যাদেরকেই এক এক করে ডেকে দেখাতে দেখাতে রোজ দেন জুনিয়রদের প্রশিক্ষণ! তাই তাঁরা না থাকলে ডাক্তাররা নিজেদের ডাক্তারি পড়াশোনাই বা কীভাবে শেষ করতেন আর কীভাবেই বা তাঁরা ভবিষ্যতের ডাক্তার তৈরি করতেন? 
এই সংখ্যাটা আছে বলেই বোধহয় অনেকের ৪০০-৫০০ টাকা থেকে ৪-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চেম্বারে রোগীপিছু ফিজ নিয়ে গাড়ি এবং বাড়ি পাল্টানো চলছে। নিরাপত্তার সঙ্গত দাবি নিয়ে যখন চিকিৎসকরা রাস্তায় নামেন, ধর্মঘট করেন, তখনও তো কোনও রোগী চিকিৎসকদের একাংশের তরফ থেকে তাঁদের প্রতি সম্মানের অভাব নিয়ে সোচ্চার হন না? বলেন না ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’! 
চাষাভুষো হলে, দিনমজুর হলে, অন্য পেশার মানুষ হলে, তাঁদের কি সম্মান পাওয়ার  হক নেই! চিকিৎসকদের কাছে তাঁরা কি শুধুই কেস? ‘সংখ্যা’ বা ‘পার্টি’ হিসেবে পরিচিত হতে থাকবেন? 
অনেকে বলবেন, নামে কী বা আসে যায়? আবার নামে যে অনেক কিছু যায় আসেও!
হ্যাঁ, এমন চিকিৎসক নেই, তা নয়। বহু আছেনও। বেশি দূরে নয়, বেশি ঝাঁ চকচকে জায়গায় নয়, ঘাম-রোদ-ঝড়-জল-বৃষ্টির সঙ্গে যুঝতে থাকা গরিব-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তদের সরকারি হাসপাতালে (কিছু কিছু বেসরকারি ক্ষেত্রেও) এমন অসংখ্য চিকিৎসক আছেন, যাঁরা পেশা নয়, আর্থিক জোর নয়, প্রথাগত শিক্ষা-দীক্ষা, সামাজিক অবস্থান নয়, রোগী মাত্রেই বয়স বুঝে গভীর সম্মানের সঙ্গেই মা-বাবা, কাকা, জেঠা, ভাই, বোন সম্বোধন করেন বিনা দ্বিধায়। বিন্দুমাত্র দেখনদারি ছাড়াই তা করেন এবং মাছের বাজারের চেহারা নেওয়া আউটডোর ইনডোরের অতিব্যস্ততার মধ্যেও তা করেন। সবচেয়ে পজিটিভ ঘটনা হল, হাল না ছাড়া, ভেঙে না পরা ব্যাপার হল, যাঁরা এই সম্মান দিচ্ছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ কিন্তু কমবয়সি, আজকের দিনের তরুণ চিকিৎসকই। ‘মা, তুমি ঠিক ভালো হয়ে যাবে, দেখো!’ ‘কাকা, তোমার চিন্তা কীসের, আমরা তো আছি!’ এই ভরসার কথায় বড় জোর আছে। হ্যাঁ, বড্ড জোর আছে, ওষুধপত্র খাওয়ার পরও। আসুন, আমরা সেইসব চিকিৎসকের কথা মনে রেখেই, হৃদয়ে রেখেই, তাঁদের দেওয়া কনফিডেন্সকে পাথেয় করে রোগের সঙ্গে যুদ্ধ-লড়াই বজায় রাখি। যে যাই বলুন, আজও দিনের শেষে টাকা-পয়সা নয়, শেষ কথা হল ভালো ব্যবহার। টাকার ঝনঝনানি তাতে মরচে ফেলতে পারেনি। কোনওদিন পারবেও না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ