হিমাংশু সিংহ: ‘দয়া করে কাশ্মীরি বা মুসলিমদের টার্গেট করবেন না। আমরা শান্তি চাই। শুধু শান্তি চাই।’ কথাটা আমার নয়। কোনও নেতার নয়। সেনাকর্তারও নয়। পহেলগাঁওয়ের বর্বর জঙ্গি হামলায় যিনি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে যাঁর বিবাহিত জীবনে পূর্ণচ্ছেদ পড়ে গিয়েছে, সেই অসম সাহসী মহিলা হিমাংশী নারওয়ালের। নৌসেনার বাহাদুর লেফ্টেন্যান্ট বিনয় নারওয়ালের স্ত্রী। মাত্র দু’দিন আগে স্বামীর মৃতদেহের উপর বারবার আছড়ে পড়ার ছবি দেখে শোকে মুহ্যমান হয়েছিলাম আমরাও। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে হিমাংশী আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, দোষীদের শাস্তি দেওয়ার নামে আমরা যেন নিজেদের বিরুদ্ধে ছদ্ম যুদ্ধে অবতীর্ণ না হই। কিন্তু রাজনীতির কারবারিদের সেই শিক্ষা দেবে কে?
গত ১ মে দুপুর। সনাতনী ঐক্যমঞ্চের দুই কট্টর হিন্দু সদস্য বনগাঁয় রেল স্টেশনের বাইরে পাকিস্তানের পতাকা লাগাতে গিয়ে পুলিসের হাতে গ্রেপ্তার।
খবরটা শুনেই চমকে উঠেছিলাম। এদের রাজনৈতিক পরিচয় জেনে আরও বিস্মিত হয়েছি। এ তো পহেলগাঁওয়ের ঘটনার চেয়েও ভয়ঙ্কর! বিষ ছড়িয়ে হামলায় ঘি ঢালার উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। এই সুযোগে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করে মেরুকরণের অস্ত্রে শান দেওয়ার চেষ্টা। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বিধানসভার বাইরে একে একে ২৬টি পাক পতাকা সাজিয়ে জনৈক বিজেপি নেতার প্রতিবাদের লক্ষ্য সীমান্তপারের দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র পাকিস্তান নাকি এরাজ্যের বিরোধীরা। ওই নেতা প্রমাণ করেছেন, আগামী নির্বাচনে সংগঠন-শূন্য একটি দলকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে ‘যুদ্ধ জিগির’-এর আড়ালে রাজ্যের বিরোধী শক্তিই প্রত্যাঘাতের লক্ষ্য? ভোট রাজনীতির স্বার্থে একটা ধর্মসর্বস্ব রাজনৈতিক দল এতটা নীচে নামতে পারে!
পরের বছর ভোট বলে এই বঙ্গেই শুধু নয়, ডাবল ইঞ্জিন রাজ্য উত্তরপ্রদেশের আগ্রায় গরিব বিরিয়ানিওয়ালা গুলফাম অলি পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন পহেলগাঁওয়ের ঘটনার ‘বদলা’য়। চলন্ত ট্রেনেও আক্রান্ত হয়েছেন কেউ কেউ। ছোট থেকে বড় এমন ধর্ম-বিদ্বেষের ঘটনার বিরাম নেই। কোথাও জুটছে মার, কোথাও প্রাণ নিয়ে টানাটানি। সীমান্ত পেরিয়ে প্রত্যাঘাত হোক বা না হোক এই সুযোগে মুসলিম-বিদ্বেষ বাড়িয়ে ফায়দা লোটার আয়োজন সম্পূর্ণ। কিন্তু শনিবার সকালে এই লেখা যখন চলছে তখনও পর্যন্ত সরকারের হরেক কিসিমের বদলার হুঙ্কার শুনলেও চার পাকিস্তানি দুষ্কৃতী কার গাফিলতিতে ঢুকল এবং গত দুসপ্তাহ ধরে দক্ষিণ কাশ্মীরে সেনা ও আধা সেনার দিনরাত এক করে চিরুনি তল্লাশির পরও কেন, তাদের নাগাল পাওয়া গেল না? কেন, একটাও এনকাউন্টার পর্যন্ত হল না? এসবের উত্তর মেলেনি। তাহলে, আসল তথ্যটা কী? সরকার মানতে না-চাইলেও বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, পহেলগাঁওয়ের সন্ত্রাসবাদীরা পর্যটকদের খুন করার পর পরই অত্যন্ত সাবধানে যে পথ দিয়ে এসেছিল সেই পথেই নিরাপদে আবার সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। ভারতের প্রোঅ্যাক্টিভ নীতির জোরে কূটনৈতিকভাবে সিন্ধু জলচুক্তি বাতিল হয়েছে। আটারি সীমান্ত বন্ধ করা হয়েছে। পাকিস্তানিদের ভিসা বাতিল করে ওপারে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমাদের আকাশসীমায় এবং বন্দরে কোনও পাকিস্তানি বিমান কিংবা জাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পৃথিবীর শেষ প্রান্তে গ্রাউন্ড জিরোতে গিয়ে পাকিস্তানকে মেরে আসার কোনও প্রমাণ এখনও মেলেনি। এমন মারার কথা বলা হয়েছে যা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু কবে? কতদিনের অপেক্ষা তার হদিশ নেই কারও কাছে!
৩৬টা রাফাল, অগুনতি সুখোই, মিরাজ, অত্যাধুনিক এস ৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম নিয়ে শত্রু দেশকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে বটে, কিন্তু বালাকোটের মতো শেষে কিছু ‘পোড়া তালগাছ আর মরা কাক’ না যুদ্ধ জয়ের স্মারক হিসেবে দেখানো হয় দেশবাসীকে। দেশের সরকারকে আমরা ষোলোআনা বিশ্বাস করি। তবু বলতেই হচ্ছে, বালাকোটের পর একজনও পাকিস্তানি সেনার মরদেহ কিন্তু দেখতে পাইনি। এবারও সেই রকমই কিছু অপেক্ষা করছে? সংশয় কিন্তু পুরোমাত্রায় রয়েছে। ভারতের সেনার সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। আধা সেনা ১৬ লাখ। মোট ৩১ লাখ আধুনিক যোদ্ধা তৈরি। পাকিস্তানের সেনা সংখ্যা সাড়ে ৬ লক্ষ। আড়াই লক্ষের কিছু বেশি আধা সেনা। কোনও তুলনাতেই আসে না। সমরসজ্জাও আহামরি কিছু নয়। শুধু হিন্দুত্ববাদীরাই নয়, গোটা দেশ বদলার জন্য প্রহর গুনছে। কিন্তু এই পাল্টা আঘাত ঘিরে ‘জিঙ্গোইজম’ যেন আসন্ন নির্বাচনে বিরোধীদের পর্যুদস্ত করার অস্ত্র না-হয়। সত্যিকারের সবক শেখানোর ব্লু-প্রিন্টের বাস্তব রূপায়ণ দেখতে চায় দেশের মানুষ। হিন্দুদের বেছে বেছে মারার কোনও ক্ষমা নেই। গোটা দেশ এই লড়াইয়ে মোদি সরকারের পাশে। কিন্তু বদলার লক্ষ্য যেন শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানই হয়। যুদ্ধের সুযোগে বিরোধীদের টার্গেট করে মেরুকরণের আদিম মনোবৃত্তিতে হাওয়া দেওয়াও সমান অপরাধ। দেশের মানুষের সজাগ দৃষ্টি কিন্তু সেদিকেই নিবদ্ধ। আর নিবদ্ধ বলেই ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে শুরু করেছে। উরির সেনা শিবিরে হামলার ঘটনার তারিখ ছিল ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯। মোদি সরকার সার্জিকাল স্ট্রাইক করেছিল দশদিনের মধ্যে। ২৯ সেপ্টেম্বর। পুলওয়ামায় পাকিস্তানি সেনার মদতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ৪০ জন জওয়ান। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। বালাকোটে ভারতীয় সেনা প্রত্যাঘাত করে ১২ দিনের মাথায় ২৬ ফেব্রুয়ারি। এবার পহেলগাঁওয়ের নারকীয় ঘটনা ঘটেছে ২২ এপ্রিল। ১২দিন অতিক্রান্ত হলেও শুধুই হুঙ্কার চলছে। সত্যি যুদ্ধ হবে কি না নাকি এভাবেই চলবে তা এখনও ধোঁয়াশায় ঘেরা।
এটা কিন্তু ভুল ধারণা যে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভ করলেই পরের এক দশক নির্বাচনে আর শাসক দলকে ভাবতে হয় না। পৃথিবীর ইতিহাসে কিন্তু তার সমর্থন মেলে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জয়লাভের পরও চার্চিল ভোটে হেরে গিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর দলের লোকেরা তো বটেই বিরোধীরা পর্যন্ত ‘দেবী দুর্গা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু এর কয়েকবছরের মধ্যেই তাঁর ভাবমূর্তি তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ১৯৭৫ সালের জুন মাসে গদি বাঁচাতে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনের পরিণাম তো সবারই জানা। ইন্দিরার পরাজয় এবং দেশে প্রথম অকংগ্রেসি সরকারের ক্ষমতা দখল। একইভাবে ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধে জয়লাভের পর অটলবিহারী বাজপেয়ি সরকারের গ্রহণযোগ্যতাও খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পাঁচবছরের মধ্যেই ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে গোটা দেশকে চমকে দিয়ে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের হাতে ক্ষমতা যায়। কোনও যুদ্ধ না-করেই মনমোহন সরকারের মেয়াদ শুধু পাঁচবছর নয়, দশবছর স্থায়ী হয়েছিল।
এবার তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় অগ্নিপরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে ৫৬ ইঞ্চির নরেন্দ্র মোদি। তিনি অযোধ্যায় মন্দির নির্মাণ করে রামলালাকে ঘর দিয়েছেন, কিন্তু হিন্দুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারেননি। বেছে বেছে হিন্দুদের খুন করা হয়েছে পহেলগাঁওয়ের বৈসরণ উপত্যকায়। যে হিন্দুত্বকে চোখের মণির মতো রক্ষা করার শপথ নিয়ে ধূমকেতুর মতো একদশক আগে ২০১৪ সালে মোদি সরকারের ক্ষমতা দখল তা এক ক্রান্তিকালের সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁর ভাবমূর্তির যে বিনির্মাণ গত এক দশক ধরে গেরুয়া শিবির করে চলেছে তাতে ধাক্কা লেগেছে। কৃষকের আয় দ্বিগুণ হয়েছে বলে কৃষক মানতে চায় না। নোটবাতিলে কালো টাকা বিদায় নিয়েছে, একথা মানতে রাজি নয় কোনও অর্থনীতিবিদ। কোনও শিক্ষিত যুবক বলবে না মোদিজি সরকারি চাকরিকে সহজলভ্য করেছেন। আগামীতে ‘এক দেশ এক নির্বাচন’ চালু হওয়ার আগে পাকিস্তানের বিষ দাঁত মোদিজিকে ভাঙতেই হবে। নাহলে মনমোহনের মতো তাঁকেও দুর্বল প্রধানমন্ত্রী বলে দুয়ো দেবে দেশের সাধারণ মানুষ। অলক্ষ্যে হাসবে প্রয়াত মনমোহন সিংয়ের বিলীন হয়ে যাওয়া শরীর ও আত্মা। পরাজয়ের পর মনমোহন আক্ষেপ করেছিলেন, ‘ওয়ান ডে হিস্ট্রি উইল নট বি আনকাইন্ড টু মি’। আসলে জনসভায়, ভোট প্রচারে বাজার গরম করা ভাষণ দেওয়া যতটা সহজ, বাস্তবে করে দেখানো ততটাই কঠিন। বিশেষত সেই হুঙ্কার যদি হয় আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রে কোনও শত্রু দেশকে সবক শেখানোর প্রশ্নে, তাহলে তো কথাই নেই। বিশ্ব রাজনীতি এই মুহূর্তে দুটি পৃথক অক্ষে বিভাজিত। ইতিমধ্যেই এত বড় অপরাধের পরও চীন ও তুরস্ক দাঁড়িয়ে গিয়েছে ইসলামাবাদের পাশে। পাকিস্তানও তুরস্ক থেকে নতুন নতুন সমরাস্ত্র কেনার অর্ডার দিচ্ছে। যদিও তাতে তেমন কোনও বড় প্রতিবন্ধকতা ভারতের সামনে তৈরি হবে না। কারণ ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট যেখানে ৮০ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের সেখানে মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ইসলামাবাদের বন্ধু চীনের প্রতিরক্ষা বাজেট ভারতের প্রায় তিন গুণ। এই মুহূর্তে পৃথিবীর বৃহত্তম সমরাস্ত্র কিনিয়ে দেশগুলির মধ্যে ভারত অন্যতম। ফ্রান্সের সঙ্গে নতুন করে আরও ২৬টি রাফাল কেনার চুক্তিতে সই করেছে মোদি সরকার। কিন্তু চিন্তা একটাই, ইসলামাবাদের উগ্রপন্থী নিয়ন্ত্রিত সরকারের হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে। চাপে পড়লে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে যে তা ব্যবহার করা হবে না, এমন গ্যারান্টি দেবে কে? কারণ ২৫ কোটি জনসংখ্যার পাকিস্তানের কিছুই হারাবার নেই। যুদ্ধ হলে যা কিছু হারানোর তা ১৪০ কোটি জনসংখ্যার বিশ্বের চতুর্থ শক্তি ভারতেরই।
প্রশ্ন একটাই। যুদ্ধ হলেও সন্ত্রাসবাদ কি খতম হবে? প্রায় দু’মাস কারগিলের যুদ্ধ চলার পর অনেকে বলেছিলেন এবার বুঝি পাকিস্তানের শিক্ষা হবে। সন্ত্রাসবাদ চিরতরে শেষ হবে। হয়নি। উরি-বালাকোটের পরও সেই স্বপ্ন দূর অস্ত। পহেলগাঁওয়ের পর ভারত আবার শিক্ষা দিলেও দু-চার বছর পর আবার একই হামলার পুনরাবৃত্তি হবে। আমাদের কিছু নিরীহ সাধারণ নাগরিক ও জওয়ান হয়তো প্রাণ হারাবে। কিন্তু পাকিস্তানের আওয়াম, আইএসআই ও সেনার ভারত-বিদ্বেষ শেষ হবে না। এই অদ্ভুত মানসিক বিকৃতি নিয়েই প্রতিবেশী পাকিস্তান ধর্মান্ধতার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। আমরাও যেন সেই ট্র্যাপে না পড়ি। ভারত-বিরোধিতাই পাকিস্তানের রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। আমরাও যদি উন্নয়ন ও প্রগতিশীলতাকে ঘুম পাড়িয়ে ধর্মকে ভোট জেতার তাস হিসেবে ক্রমাগত ব্যবহার করি একদিন পাকিস্তানের মতোই দুরবস্থা হবে। সরকার ও বিরোধী দু’পক্ষকেই এই সহজ সরল কথাটা বুঝতে হবে। অন্যথায় শুধু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শই পরাজিত হবে না, বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের উজ্জ্বল উপস্থিতিও কলঙ্কিত হতে বাধ্য।