হারাধন চৌধুরী: রিপোর্টারি জীবনের গোড়ার দিকের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরু তখন। কাঁটাতার বেশিরভাগ সীমান্তে বসেনি। খবর সংগ্রহ করতে বেরিয়ে দেখতাম, প্রতিদিন শয়ে শয়ে লোক ওপার বাংলা থেকে প্রায় বিনাবাধায় এপারে চলে আসত। ফিরে যেত খুব কম জনেই। অনুপ্রবেশকারীদের বেশিরভাগই ছিল হিন্দু। এসআইআর ধুয়োয় দেখছি উলটপুরাণ! এপারে অনুপ্রবেশ আপাতত চাপা পড়ে গিয়েছে। উজান স্রোত। হাকিমপুর, আমুদিয়া, তারালি দিয়ে শয়ে শয়ে নারী-পুরুষ, সঙ্গে শিশুরা, আতঙ্কে ছুটছে ওপারে। বাংলাদেশের দিকে। মানে নিজের দেশে। বলা বাহুল্য, তাদের ৯৯ শতাংশই মুসলমান। এদেশের বিভিন্ন রাজ্যে ও শহরে শ্রমিকের কাজ করত। মেয়েরা পরিচারিকার কাজ করত বেশি। ছোটো ছেলেমেয়েরা শিশুশ্রমিক। পুরুষরা রিকশা চালাত কিংবা বিভিন্ন রাজ্যে নিযুক্ত ছিল পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে। এদেশে অনুপ্রবেশ—কারও দুবছর আগে তো কারও ২০-২২ বছর। তারা আধার কার্ড, রেশন কার্ড এমনকি ভোটার কার্ডও বানিয়ে ফেলেছিল। কারও কারও ছিল ভুয়ো বার্থ সার্টিফিকেট এবং পাসপোর্ট! ছেলেমেয়েরা কন্যাশ্রী, সবুজসাথি, রূপশ্রী প্রভৃতির সুবিধা পেয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকাও নিয়মিত পেত কেউ কেউ। স্বাস্থ্যসাথি অথবা আয়ুষ্মান ভারতেও আছে তারা। পিতৃদত্ত নাম-পদবি, এমনকি ধর্মীয় পরিচয় পালটেও ভারতের নাগরিক-নথি বানিয়ে ফেলেছে অনেকে। ভোটার লিস্টে নাম তুলে, ভোটার কার্ড বাগিয়ে একাধিকবার ভোটও দিয়েছে এরাজ্যে। এসব কোনও কষ্টকল্পনা নয়, সীমান্ত পেরিয়ে ওপার বাংলায় ফেরার সময় তারাই কবুল করেছে এই ‘অপরাধ-কাহিনি’ মিডিয়ার কাছে।
চলতি আট দশকে এই উপমহাদেশের তিন রাষ্ট্রে একটা ঠিকানা খুঁজে পেতে, ধর্ম বাঁচাতে কিংবা পেটের জ্বালায় সীমান্ত পেরিয়েছে কত মানুষ? ধরা পড়ে কতজন জেল খেটেছে কিংবা ডিটেনশন ক্যাম্পে কাটিয়েছে? এর সঠিক হিসেব কোনোদিন পাব না। এখনও কত মানুষের বিশ্বাস ‘ওপারেতে স্বর্গসুখ’? স্বাধীনতার নামাবলি গায়ে চাপিয়ে ভারতভাগ করা হয়েছিল। মহম্মদ আলি জিন্না লাভ করেছিলেন ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান। কিন্তু সেই সাধের মুসলিম রাষ্ট্র সিকি শতকও টেকেনি। ১৯৭১-এ দেশটি ভেঙে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’। অখণ্ডতা রক্ষার অজুহাতে পাকবাহিনী লক্ষ লক্ষ বাঙালির উপরে নির্মম অত্যাচার করে। ধর্ষণের শিকার হন অসংখ্য নারী। গণহত্যায় বিশেষ টার্গেট ছিল ছাত্রসমাজ এবং শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি।
পূর্ববঙ্গ স্বাধীনতা পেলেও তার সকল নাগরিককে সেখানে ফিরে পায়নি। একাত্তরের ভয়াবহ যুদ্ধের আবহ লক্ষ লক্ষ মানুষকে ছিন্নমূল করেছিল। তারা আশ্রয় নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসমসহ ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে। শেখ মুজিবুর রহমান ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বাংলাদেশ গঠন করলেও সকলে আশ্বস্ত হতে পারেনি। শরণার্থীদের বেশিরভাগই রয়ে গিয়েছিল ভারতে। তারা খুব ভুল করেনি। প্রমাণ? ১৯৭৫-এ ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল পাকপন্থীরা। খুব দ্রুত বদলে গেল সংবিধান। ‘সোনার বাংলা’ গ্রহণ করল ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’! রাষ্ট্র যখন একটি বিশেষ ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে তখন অন্যদের প্রতি তার মনোভাব পরিষ্কার হয়ে যায়। স্বভাবতই রাষ্ট্রের অবিচারের শিকার বহু মানুষ ফের ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করতে বাধ্য হল। ‘ওপারে করে দূর দূর.../ সারা গায়ে কাঁটাতারের ক্ষত/ সব হারানোর শোকে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত/ এপারে এলে বলে, ধুর!’
দেশের মানুষের সঙ্গেই যেখানে শত্রুতার নীতির চর্চা দিবারাত্র, সেখানে আর যাই হোক জনকল্যাণের কোনও ঠাঁই নেই। সত্যিই বাংলাদেশ পাঁচ দশকেও একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র হতে পারেনি। উগ্র মুসলিম মৌলবাদী শক্তি সোনার বাংলাকে প্রকারান্তরে এক নরকের চেহারা দিয়েছে। খেটে খাওয়া মুসলিম জনগণও সেখানে আর নিরাপদ এবং স্বস্তিবোধ করে না। যৎসামান্য জীবিকার তাগিদে তারা হাজারে হাজারে দেশত্যাগ করেছে। উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে। এসআইআর আতঙ্কে আজ যাদের পড়িমরি করে বাংলাদেশে পালাতে দেখছি, তারা বস্তুত ওই মানুষগুলিই।
এদের সম্পর্কে ভারতের রাজনীতির কারবারিদের একাংশের বক্তব্য, এই লোকগুলি এদেশের নিরাপত্তা এবং জনবিন্যাসের ভারসাম্যের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তাই এদের বিদায়ই কাম্য। বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপির এটা রাজনৈতিক স্লোগান এবং এজেন্ডাও বটে। এখন প্রশ্ন হল, এই লোকগুলি ভারতছাড়া হলেই কি আমাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে? বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যারা ক্ষমতাসীন তারা চরম ভারত-বিরোধী। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ওদেশে জাতীয় সংসদের নির্বাচন হতে পারে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে শেখ হাসিনার পার্টি আওয়ামি লিগ। সোজা কথায়, নির্বাচনের নামে আরও একটা প্রহসন খুব শীঘ্রই দেখতে পাবে ওপার বাংলা। ওই সরকার গঠনের আগে বাংলাদেশ জুড়ে ভারত-বিরোধিতার তীব্র প্রতিযোগিতা চলবে। ভারত ছেড়ে যাওয়া এই লোকগুলি যে সেখানে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হবে, তাতে সন্দেহ কী? হিন্দুসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বাংলাদেশে কতটা বিপন্ন বোধ করে, তা শুধু আমরা অবগত নয়, গোটা আন্তর্জাতিক মহলও জানে। এই লোকগুলির ফিরে যাওয়ার কাহিনি বাংলাদেশ জুড়ে পল্লবিত হল বলে! তার অবাঞ্ছিত ধাক্কা গিয়ে পড়বে সেদেশে বসবাসকারী মূলত হিন্দুদের উপর।
ভারতভাগের আট দশক পূর্তি অদূরে। এইসময়ে দাঁড়িয়েও তাই প্রশ্ন, বাঙালির এক বড়ো অংশকে কেন আজও একটা নিজের রাষ্ট্র দেওয়া গেল না? লক্ষ লক্ষ বাঙালি হয় পেটের দায়ে অথবা ধর্মরক্ষার তাগিদে রাষ্ট্রবিহীনই রয়ে গিয়েছে। মানবাধিকারের এই অবনমন, পদদলন আর কত সইবে এই উপমহাদেশ?
অসুখ একটু জটিল বা কঠিন হলেই লোকে চিকিৎসার জন্য ভারতে ছুটে আসে। ইএম বাইপাসের লাগোয়া একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল বস্তুত বাংলাদেশি রোগীদের পরিষেবা দিয়েই ফুলেফেঁপে উঠেছে। ভেলোর, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, মুম্বই, দিল্লিসহ আরও কিছু জায়গার নামি হাসপাতালও এই তালিকায়। হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশের বিদেশনীতি ভারত-বিরোধী হয়ে ওঠায় নিরাপত্তার বিষয়ে দিল্লি চিন্তিত। তাই বাংলাদেশি নাগরিকদের এদেশে ভিসা প্রদান অত্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি রোগীর সংকটে কর্পোরেট হাসপাতালগুলি। ওষুধ, ভালো পোশাক, প্রসাধনী দ্রব্য প্রভৃতির জন্য বাংলাদেশ ভারতের দিকেই চেয়ে থাকে। এছাড়া চাল, আলু, পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের জন্য বাংলাদেশ বিশেষভাবে ভারতনির্ভর। ভারত এসব পণ্য রপ্তানি কমিয়ে দিলেই জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য হয়ে ওঠে বাংলাদেশে।
পদ্মার ইলিশের জন্য আমাদের মন পড়ে থাকে। শুধু কি তাই? কত বাউল ফকির আখড়া ওপার বাংলায়। রবীন্দ্রস্মৃতিধন্য শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুরও। বর্ষবরণ উৎসব, একুশের বইমেলা। বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা প্রভৃতির গুণমুগ্ধ দর্শক-শ্রোতা এপার বাংলায় বিস্তর। বিশেষ কিছু সিনেমা তৈরি হয়েছে ইতিপূর্বে যৌথ প্রযোজনায়। কাজের সূত্রে অভিনেতা, অভিনেত্রী, শিল্পীদেরও যাতায়াত বেড়েছিল। শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী, রবীন্দ্রভারতীর বিভিন্ন বিভাগে পড়ার জন্য বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের আগ্রহ যথেষ্ট। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, লালন সাঁই, মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নজরুল, মুজতবা আলি, জীবনানন্দ, সত্যজিৎ, জগদীশচন্দ্র, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, ডাঃ দিলীপ মহলানবিশ, শেখ মুজিব, সুচিত্রা-উত্তম, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, কেসি নাগ, পিকে দে সরকার, শক্তি-সুনীল, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, হুমায়ুন আহমেদ প্রমুখ সমগ্র বাঙালির। তাঁদের জন্মস্থান কোন বঙ্গে সেটা বড়ো নয়। সারা পৃথিবীতে যেখানে যত বাঙালি আছে তাদের প্রত্যেকেরই প্রাণের মানুষ তাঁরা। দুই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং অন্যান্য সম্পদ এতটাই উন্নত যে তার তুলনামূলক বিচার আজ অর্থহীন। দুটিতেই সমগ্র বাঙালির অধিকার ও উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিকৃত ইতিহাসকে সামনে রেখে বাংলাদেশের কিছু উচ্চ ডিগ্রিধারী মূর্খ ইদানীং রবীন্দ্রনাথ এবং হিন্দু বিরোধিতায় চ্যাম্পিয়ন হতে মরিয়া। তাদের বক্তব্য, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নাকি বাঙালি মুসলিমদের উন্নতি চায়নি। কিন্তু তারা এই সত্য চেপে যায় যে, এই লোকগুলি এবং তাদের বাপ-ঠাকুর্দারা যেসব স্কুল-কলেজ ও উচ্চ প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন সেগুলির বেশিরভাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হিন্দু শিক্ষানুরাগীদের হাতে কিংবা পিছনে ছিল তাঁদের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষণা। বেশিরভাগ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যুবসমাজকে সুশিক্ষা দিয়েছিলেন অসংখ্য হিন্দু শিক্ষক, অধ্যাপক।
দেশভাগের অসারতাই তুলে ধরে এই ছবি। দেশভাগের ভিত্তি ধর্মীয় বিভেদ হয়ে থাকলে সমস্ত মুসলিম নাগরিক কেন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে তাদের স্বর্গরাজ্য ভেবে বসবাস করতে পারছে না? পাকিস্তানেও তো দিকে দিকে বিচ্ছিন্নতাবাদ ভয়ংকরভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে। একাধিক অঞ্চল আজ শাহবাজ শরিফ এবং আসিম মুনিরের জাঁতাকল থেকে বেরিয়ে বাঁচতে মরিয়া। তিন সংসার জোড়া লাগার আশু সম্ভাবনা দেখি না। কিন্তু সুসমন্বয়ের ভিত্তিতে তিনটি সুখী সুন্দর দেশ অবশ্যই হতে পারে। শত্রুতা ভুলে যথার্থ বন্ধু প্রতিবেশী হয়ে উঠতে হবে আমাদের। তার জন্য দরকার ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে আন্তরিক আস্থা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। এই আস্থা শুধু ভারতবাসীর তরফে হওয়াই যথেষ্ট নয়, সতীর্থ হতে হবে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশকেও। এর জন্য প্রেরণা খুঁজে নিতে হবে ইউরোপের ইতিহাস থেকে। এই দুই দেশে উগ্র ইসলামপন্থীদের দাপট যত বাড়বে তত দুর্বল হবে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি। ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা যদি বলে, মুসলিমরা ততক্ষণই ধর্মনিরপেক্ষ যতক্ষণ তারা সংখ্যালঘু—তা খণ্ডন করতে নিরপেক্ষ লোকজন কোন যুক্তি সাজাবে? পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মৌলবাদীদের কর্মকাণ্ড দেখে এই প্রত্যয় জাগে যে, তারা ভারতে মোহন ভাগবত, নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহদের এজেন্ডা পূরণে সহায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ! হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের পথে ভারতবাসীকে এগিয়ে দেওয়ার এর চেয়ে উত্তম উপায় আর কী হতে পারে? তারা ভুলে যায়, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যায় মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষ ভারতের বাসিন্দা। তাহলে তারা প্রত্যক্ষভাবে মুসলিমদেরই বেশি ক্ষতি করছে না কি?