


আধুনিক রান্নাঘরে সহায় এখন ইনডাকশন কুকটপ। তার ব্যবহারের সুবিধে জেনে নিন। কেনার আগের সতর্কতা বিষয়ে সচেতন হন।
ঘটনা ১:
বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে আলাদা সংসার পেতেছে অনুমিতা। বাবা মা, শ্বশুর শাশুড়ি, আত্মীয় সকলেই কাছাকাছি থাকেন। তবু এই সমস্যার সমাধান কারো কাছে নেই! গোলটা বেঁধেছিল শখ করে রান্নাঘরে ঢুকেই। সরষে-পোস্ত চিংড়ি রান্না করবে বলে উপকরণ সব রেডি। এদিকে গ্যাস শেষ। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে হুট করে গ্যাস পাওয়াও অসম্ভব। ডিলারকে ফোন করতেই সে সাফ জানিয়ে দিল এপ্রিলের আগে গ্যাসের বুকিং-ই করতে পারবে না অনুমিতা। তাহলে উপায়? শ্বশুরবাড়ির সকলকে প্রথমবার এত শখ করে একটা পদ খাওয়াবে ভাবল, সেটাই হবে না! অনুমিতার মনখারাপ বুঝে তখন ওর শাশুড়ি ফোনে মনে করালেন বিয়েতে পাওয়া ইনডাকশন কুকারের কথা। তাতেই সেদিনের রান্না সহজে সেরে ফেলল অনুমিতা।
ঘটনা ২:
বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে মায়ের কাছে কুলফি খাওয়ার আবদার জুড়ল ঝিমলি। তাও আবার কেনা কুলফিতে চলবে না, মায়ের রান্না করা ঘরোয়া কুলফিই চাই। এদিকে মা পড়লেন মহা সমস্যায়। কুলফি বানাতে বহুক্ষণ সময় লাগে। এই গরমে গ্যাসের ধারে অতক্ষণ দাঁড়ালে বুঝি গলেই যাবেন তিনি! অথচ মেয়ের আবদারও ফেলা দায়। এমন সময় মুশকিল আসান করলেন গৃহকর্তা। বললেন, আরে, ইনডাকশন আছে তো! পাখার তলায় ইনডাকশন রেখে রান্না করলে গরম লাগার কোনো প্রশ্নই নেই।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সিলিন্ডারের অপ্রতুলতার সময়ে ঘরে ঘরে ইনডাকশন কুকটপের কদর বেড়েছে। গেরস্থ এখন নতুন করে ভরসা করছে ইন্ডাকশনে।
গুণগাথা
ইনডাকশন কুকটপের গুণের অন্ত নেই। প্রথমত, এই যন্ত্র যে কোনো জায়গায় রেখে চালানো যায়। চাই শুধু একটা প্লাগ পয়েন্ট। দ্বিতীয়ত, এই যন্ত্রটি ব্যবহার করাও সহজ। কয়েকটা টাচ বাটন, পাওয়ার বাটন এবং টেম্পারেচার বাটন আছে। তির চিহ্ন দিয়ে তাপমাত্রা বাড়ানো বা কমানোর নির্দেশ দেওয়া রয়েছে। এছাড়াও সেদ্ধ, প্রেশার কুক, ফ্রাই ইত্যাদি কিছু মোডও রয়েছে। আপনার রান্নার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মোডে যন্ত্রটি সেট করে তাপমাত্রা কমিয়ে বাড়িয়ে রান্না করতে পারেন। তৃতীয়ত, সরাসরি আগুনের সংস্পর্শে আসতে হয় না এই যন্ত্র ব্যবহার করার জন্য। ফলে অসাবধানে দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা কম। তাছাড়া সরাসরি আগুনের সংযোগ হয় না বলে রান্না পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও অনেকাংশেই কমে। এছাড়াও আগুনের সরাসরি ব্যবহার হয় না বলে তেল কালিও সে অর্থে পড়ে না। এর ফলে রান্নার পর সহজেই ইনডাকশন কুকটপ পরিষ্কার করে ফেলা যায়।
বাসন বিষয়ে সচেতন
ইনডাকশন ব্যবহার করতে গেলে কিছু সতর্কতাও মেনে চলতে হয়। এক্ষেত্রে ইনডাকশনের উপযোগী পাত্র ব্যবহার করতে হয়। ইনডাকশন কুকটপে একটা ম্যাগনেটিক প্লেট থাকে। ইলেকট্রিক কানেকশন দিলে সেই প্লেটটার মাধ্যমে এনার্জি বা তাপ সরবরাহ হয়। ফলে সেই ম্যাগনেটিক প্লেটের মাধ্যমে তাপ পাত্রে ঢুকতে পারে এমন পাত্রই চাই রান্নার জন্য। সাধারণত এই যন্ত্রের মাধ্যমে রান্না করতে হলে এমন পাত্র কিনতে হয় যেগুলোর তলায় বৃত্তাকার নকশা কাটা থাকে। এই বৃত্তাকার নকশাই বাসনে তাপ সরবরাহ করতে সাহায্য করে। এই যন্ত্রের জন্য স্টিল, ননস্টিক, এনামেল কোটেড নানা বাসনই উপযুক্ত। আপনার পছন্দসই বাসনটি বেছে নিতে পারেন। ননস্টিক কড়াইয়ের কাচের ঢাকনা থাকলে তা দিয়ে রান্না করতেও কোনো সমস্যা হয় না। বাসন কেনার সময় তার তলায় বৃত্তাকারে নকশা রয়েছে কি না সেটা খেয়াল করে দেখে নেবেন। এছাড়া আর একটা বিষয়ও এই বাসনের ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ, তা হল তা বসানোর উপায়। পাত্রের তলাটা যেন ইনডাকশন কুকটপের উপর সেঁটে বসার মতো হয়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
সুবিধার কথা
ইনডাকশন কুকটপে রান্না করতে সময় কম লাগে। তার একটা কারণ এই যে, প্লাগে দিয়ে যন্ত্রটি চালানোর সঙ্গে সঙ্গেই তাপ সরবরাহ শুরু হয়ে যায়। ফলে বাসন বসানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা গরম হয়ে যায়। এর ফলে তেল গরম করতে কয়েক সেকেন্ড মাত্র সময় লাগে এবং রান্নাও হয় তাড়াতাড়ি। স্টেনলেস স্টিলের পাত্র যেমন এক্ষেত্রে রান্নার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, তেমনই আবার কিছু এনামেল কোটেড পাত্রও থাকে সেগুলো ব্যবহার করেও অনায়াসে রান্না করা যায়। সরাসরি আগুনের সংস্পর্শ থাকে না বলে নতুন রাঁধুনি থেকে অল্পবয়সি সকলেই ইনডাকশন ব্যবহার করতে পারেন নিশ্চিন্তে।
কী দেখে বাছবেন?
সাধারণত ইনডাকশন কুকটপের মাপ হয় ৬০ সেমি। যদি বড়ো পরিবারের হেঁশেলে উপযোগী করে তুলতে চান এই যন্ত্রটিকে তাহলে ৭৫ থেকে ৯০ সেমি পর্যন্ত মাপের যন্ত্র কিনুন। এই কুকটপের ওয়াটেজ সাধারণত ১০০০ থেকে ২০০০ হয়। যদি খুব দ্রুত রান্না করতে চান, বা তাড়াতাড়ি সেদ্ধ করতে চান তাহলে ৩৭০০ ওয়াট যুক্ত মেশিন কিনুন। কিছু কুকটপ আছে যাতে ‘অটো অফ’ ফিচার দেওয়া থাকে। এই ধরনের মেশিন কেনাই ভালো। তাতে অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে নিজে থেকেই মেশিন বন্ধ হয়ে যাবে। রান্না পুড়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না। মেশিনের গ্লাস টপ থাকলে তা ব্যবহারের পরে পরিষ্কার করতে সুবিধে হবে। এছাড়াও ইনডাকশন কুকটপে চাইল্ড লক আছে কি না, তাতে প্রিসেট করা মেনু বা মোড দেওয়া আছে কি না, যেমন ফ্রাই, বয়েল, প্রেশারকুক ইত্যাদি, এই সবই দেখে নেওয়া দরকার।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, রান্নাঘরটি ইনডাকশন কুকটপ ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত কি না, সেটা দেখুন। এই মেশিন চালাতে একটু বেশি পাওয়ার লাগে। ফলে সেই মতো রান্নাঘরেও ওয়্যারিং আগে থেকেই করে নিতে হবে। না হলে কিন্তু এই মেশিন কেনাই বৃথা।
বিশ্বায়নের হাত ধরে রান্নাঘরকে যান্ত্রিক করে তুলেছেন বহু তরুণী। কারণ তাঁরা মনে করেন, গ্যাসের খোলা আগুনে রান্নার কিছু সমস্যা রয়েছে। তার চেয়ে বরং বৈদ্যুতিন সরঞ্জামই ভালো। তাই গ্যাস সিলিন্ডারের এই আকালে ইন্ডাকশন কুকটপ হতেই পারে হেঁশেলের উপযুক্ত বন্ধু।
কমলিনী চক্রবর্তী