Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আমেরিকার কাছে কখনও নতজানু হননি ইন্দিরা!

একাত্তরের ৪ নভেম্বর। হোয়াইট হাউসে পা রেখেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাঁকে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে পরবর্তী সব ঘটনা ছিল বিপর্যয়কর! নজিরবিহীন!

আমেরিকার কাছে কখনও নতজানু হননি ইন্দিরা!
  • ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: একাত্তরের ৪ নভেম্বর। হোয়াইট হাউসে পা রেখেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাঁকে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে পরবর্তী সব ঘটনা ছিল বিপর্যয়কর! নজিরবিহীন! 

Advertisement

তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার আগে থেকেই প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে জনসমক্ষে হাসিমুখে উপস্থিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ঝলমলে সেই রোদের সকালে হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ উঠোনে দুই নেতার চোখ–মুখ দেখে মনে হয়েছিল, বিদ্বেষের চাক্ষুষ প্রতিমূর্তি। দু’জনেই অস্বস্তি বোধ করছিলেন। হেনরি কিসিঞ্জার পরে লিখেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী যে নিক্সনকে এতটুকু পছন্দ করতেন না, সেটা তাঁর ‘শীতল অভিব্যক্তি’ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
অধ্যাপক গ্যারি জে বাস তাঁর ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম: নিক্সন, কিসিঞ্জার অ্যান্ড আ ফরগটেন জেনোসাইড’ বইয়ে লিখছেন, সেদিন রাষ্ট্রীয় নৈশভোজও উজ্জ্বলতা হারিয়েছিল। যদিও উৎসবের আবহ তৈরি করার পর্যাপ্ত আয়োজন ছিল। হাজির ছিল নিউ ইয়র্ক শহরের ব্যালে দল। ফার্স্ট লেডি প্যাট নিক্সন মেঝে পর্যন্ত দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন গাউন পরে এসেছিলেন। গোলাপি রঙের গাউনটিতে ছিল ১৯৭০-এর দশকের ফ্যাশনের ছাপ। সোনার কারুকাজ করা লাল শাড়িতে ইন্দিরা গান্ধীকে কিছুটা অনুজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। টক্সিডো স্যুটে নিক্সনকে বরং কিছুটা বেশি স্মার্ট দেখাচ্ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নিক্সন অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন বলে মনে হয়নি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ করেছিলেন, মার্কিন অফিসারদের মধ্যে দেশপ্রেমের ঘাটতি রয়েছে। নৈশভোজে বিদেশ দপ্তরের প্রস্তুত করা কোনও লিখিত বক্তব্য ছাড়াই উপস্থিত সাংবাদিকদের চমকে দিতে চেয়েছিলেন নিক্সন। বোঝাতে চেয়েছিলেন, বিদেশ নীতির ব্যাপারে তিনি কতটা পারদর্শী। অহঙ্কার করে বলেওছিলেন, ‘আমি বিশ্বের অন্য যে কারও চেয়ে ভালো শুভেচ্ছাবার্তা দিতে পারি, স্বাগত বক্তব্য দিতে পারি। আমি গোটা বিশ্বের সব জায়গায় গিয়েছি।...’
পরদিন সকালে ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও কিসিঞ্জার দু’জনেই নৈশভোজের অনুষ্ঠানে ইন্দিরা গান্ধী কী কী ভুল করেছেন, সেই খুঁত বের করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। হোয়াইট হাউসের স্টাফদের প্রধান এইচ আর হ্যালেডম্যানের কাছে অসন্তোষ প্রকাশ করে কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘বুঝলেন, গত রাতে ইন্দিরা গান্ধীর মাথা একেবারে খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউসে আমাদের আসার পর থেকে এখনও পর্যন্ত সেরা স্বাগত বক্তব্য দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। অতিসূক্ষ্ম, খুব চিন্তাশীল এবং উষ্ণ হৃদয়ের বক্তব্য। আর ইন্দিরা গান্ধী বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্টের কোনও প্রসঙ্গই তুললেন না, মিসেস নিক্সনের সঙ্গে তাঁর কী একটা বন্ধুত্বের কথা বললেন, এরপর সরাসরি পাকিস্তানের দীর্ঘ সমালোচনা শুরু করলেন। তুমি কি বলতে পারো, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে আগে এরকম কেউ করেছে কি না। অন্য কোনও দেশের সরকারকে এভাবে কেউ আক্রমণ করেছে?’ (অথচ, ইন্দিরা তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তানের নাম এড়িয়ে গিয়েছিলেন। শুধু বলেছিলেন ‘মধ্যযুগীয় স্বৈরশাসক’।)
নভেম্বরের ৫ তারিখ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ওভাল অফিসে আসার আগে কিসিঞ্জার দেখেন, নিক্সন খেপে উঠেছেন। প্রেসিডেন্ট বলেন, আমেরিকা এককভাবে ভারতকে যে পরিমাণ ত্রাণসহায়তা দিয়েছে, সেটা বাকি বিশ্ব সম্মিলিতভাবে যা দিয়েছে, তার থেকেও বেশি। তারপর তিনি রেগে ফেটে পড়েন আর চিৎকার করে বলতে শুরু করেন, ‘কেন তারা এই সহযোগিতার জন্য আমাদের কোনও কৃতিত্ব দেয় না?’ কিসিঞ্জার প্রেসিডেন্টের রাগ আরও তাতিয়ে দেন। বলেন, ‘মাননীয় প্রেসিডেন্ট, আমাদের এতটা রক্ষণাত্মক হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি না। কারণ, এই বেজন্মরা আমাদের সঙ্গে চূড়ান্ত বর্বর ও নিষ্ঠুর খেলা খেলছে।’ এই ছিল তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মুখের ভাষা! এই সেই কিসিঞ্জার, যিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বারবার ‘বিচ’ এবং ভারতীয়দের ‘বাস্টার্ড’ ও ‘সান অব বিচ’ বলতেও ছাড়েননি।
বৈঠকের আগে ইন্দিরা গান্ধীকে নিক্সন ৪৫ মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের প্রাক্তন অফিসার মহারাজ কৃষ্ণ রসগোত্রা বিবিসিকে বলেছিলেন, নিক্সনের উদ্দেশ্য ছিল মিসেস গান্ধীকে অপমান করা। তবুও সেদিন হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে ইন্দিরা গান্ধী বলে এসেছিলেন, ‘নৃশংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের মেরুদণ্ড সোজা রয়েছে, যথেষ্ট ইচ্ছেশক্তি এবং সম্পদ রয়েছে। সেই সময় পেরিয়ে গিয়েছে 
যখন শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গ হওয়ার কারণে ৩-৪ হাজার মাইল দূর থেকে কেউ ভারতীয়দের নির্দেশ দিত, তাদের ইচ্ছে চাপিয়ে দিত।’ চাণক্যর বুদ্ধি থাকলেও নানা ঘটনায় বোঝা যেত, ইন্দিরা ‘রোবট’ নন। ক্ষুরধার বুদ্ধির পাশাপাশি ছিল তীব্র আবেগ। আচরণে ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা। তাই কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘ইন্দিরা হলেন কোল্ড-ব্লাডেড প্র্যাকটিশনার অব রিয়্যাল পলিটিক।’
ওভাল অফিসে উত্তপ্ত ও দীর্ঘ বৈঠকে রিচার্ড নিক্সন ও ইন্দিরা গান্ধী যেন যুদ্ধে মেতে উঠেছিলেন। পরিবেশটা ছিল বিস্ফোরক। পাকিস্তান যে ক্রমাগত ‘ভারতবিদ্বেষী’ প্রচার চালাচ্ছে, ইন্দিরা গান্ধী ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটাই বলে এসেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখের উপর বলে এসেছিলেন, দেশটির জন্মের পর বিরোধী রাজনীতিকদের হয় জেলে পাঠিয়েছে, না হয় হত্যা করেছে। একই কারণে বালুচিস্তান কিংবা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে স্বায়ত্তশাসনের দাবি উঠেছে। পাকিস্তানি নেতারা যে ‘বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা’র মাধ্যমে বাংলার জনগণের সঙ্গে জঘন্য আচরণ করছে, সেটা বলতে গিয়ে তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়ে এসেছিলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে একত্র রাখার প্রচেষ্টা হবে অবাস্তব চিন্তা। স্বায়ত্তশাসনের চাপটা এখন অনেক শক্তিশালী। শেষ পর্যন্ত নিক্সন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানের ঐক্য বিনষ্ট হলে সেটা কারও জন্যই মঙ্গল হবে না। ভারত যদি বৈরিতা অব্যাহত রাখে, তবে তাদের অসম্ভব মূল্য চোকাতে হবে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কুৎসিত এই শেষ মুহূর্তটিতে নিক্সনের হুমকি যেন ওভাল অফিসের বাতাস কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ‘৭১-এর যুদ্ধে আমেরিকা যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল, কিন্তু ইন্দিরা দমে যাননি। বরং বলেছিলেন, আমার যা করার তাই করব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইয়াহিয়া-কিসিঞ্জার-নিক্সন ঠেকাতে পারেননি। 
আর আজ? ভারতের রাজনীতি ইন্দিরা যুগ থেকে আজ মোদি যুগে এসে পৌঁছেছে। অনেক পরিবর্তন এসেছে সমাজে, রাজনীতিতেও। একটা ব্যাপার এর মধ্যে স্পষ্ট— আজকের নেতৃত্বে যতটা না স্বতঃস্ফূর্ততা তার চেয়ে অনেক বেশি কৌশল। আবেগহীন মিডিয়া-কালচার গড়ে তোলা। যেখানে নেতার ‘মিথ’-কে নানা কর্পোরেট কৌশলে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু আসল সময় দৃঢ়তা দেখাতে না পারলে, দেশীয় রাজনীতিতে নিজের ‘মিথ’ বানিয়ে কী লাভ?
ভারতের প্রতি বিদ্বেষনীতিতে সেদিনের রিচার্ড নিক্সন আর আজকের ট্রাম্পের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। ট্রাম্প আজ অনেক বেশি উগ্র। অথচ, আজ আমেরিকার কাছে মাথা নত করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না ভারতীয় নেতারা। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বয়ান। যেখানে ট্রাম্প বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদি একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, স্যার আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি। উত্তরে আমি হ্যাঁ বলেছিলাম।’ পাশাপাশি শুল্ক প্রসঙ্গে এও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদি খুব ভালো মানুষ। তিনি জানতেন আমি খুশি নই। আমাকে খুশি করা গুরুত্বপূর্ণ। ওরা বাণিজ্য করুক। আমরা খুব দ্রুত ওদের উপর শুল্ক বাড়াতে পারি।’ এমনই তাচ্ছিল্যের সুরে ভারত সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে একটি কথাও শোনা যায়নি প্রধানমন্ত্রী 
নরেন্দ্র মোদির মুখে। ট্রাম্প এখন রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধের জন্য 
৫০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর হুমকি দিচ্ছেন। কিন্তু ভারতের বিদেশ মন্ত্রক তার তীব্র আপত্তি জানানোর সাহসও দেখাতে পারেনি। যেন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মুখের দিকে তাকিয়েই ভারতে বিদেশনীতি নির্ধারিত হয়!
যে ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য আমেরিকায় গিয়ে ভোটে প্রচার করেছিলেন মোদি, ভারতে এসে ট্রাম্পকে নিয়ে তাঁর আদিখ্যেতার অন্ত ছিল না, যে ট্রাম্পকে মোদি তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে জাহির করতেন, সেই ট্রাম্পই হয়ে উঠেছেন ভারতের সবচেয়ে বিড়ম্বনার কারণ। মোদি চেয়েছিলেন, ট্রাম্পকে ধরে আমেরিকার বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে দুনিয়াজুড়ে কেউকেটা হতে। আমেরিকার ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়ে বিশ্বগুরু হতে। তার জন্য আমেরিকার পাকিস্তান-প্রেমের ইতিহাস চর্চা না করে, মার্কিন বিদেশনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতের বিদেশনীতি দ্রুত বদলানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ট্রাম্পকে খুশি রাখার জন্য ট্রাম্পের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, মরজিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তার রেজাল্ট এখন হাতেনাতে পাচ্ছেন।
শুরুতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ ছিল চীনের বিরুদ্ধে, কালক্রমে সেটা যে 
ভারতের উপর আছড়ে পড়বে, নরেন্দ্র মোদিরা সেটা ভাবতেই পারেননি। বোঝেননি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কোনও স্থায়ী শত্রু-মিত্র নেই। তাদের স্বার্থে যখন যাকে যতটা প্রয়োজন ততটা ব্যবহার করবে। তারপর ছুড়ে ফেলতে দু’বার ভাববে না। ঠিক যেমন ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন— তাঁকে খুশি রাখা, তাঁর মরজিমাফিক চলা, ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম দেওয়া মোদির ভারতের দায়িত্ব। ভারতের স্বার্থ অপ্রাসঙ্গিক, ট্রাম্পের পছন্দে সায় দেওয়াই অগ্রাধিকার। এর জবাবে, মোদি কিন্তু নীরবই থেকে গিয়েছেন! বিরোধীদের অভিযোগ, আসলে আমেরিকার কাছে ‘নতজানু’ মোদিজির ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসই নেই! দেখে মনে হতেই পারে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে হয়তো কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে! 
আর এটাই ইন্দিরার সঙ্গে মোদির পার্থক্য। সেই পার্থক্য ছিল, পার্থক্য আছে এবং থাকবেও!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ