Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ঋণের ফাঁদে ভারতবাসী

চার্বাক দর্শনে পার্থিব সুখভোগের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ওই জীবনদর্শনে এমনও বলা হয়েছে, সামর্থ্য এই মুহূর্তে কম থাকলেও ভোগে দাঁড়ি দেওয়া যাবে না।

ঋণের ফাঁদে ভারতবাসী
  • ৫ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

চার্বাক দর্শনে পার্থিব সুখভোগের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ওই জীবনদর্শনে এমনও বলা হয়েছে, সামর্থ্য এই মুহূর্তে কম থাকলেও ভোগে দাঁড়ি দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে ঋণ করেই কাঙ্ক্ষিত বস্তু সংগ্রহ ও ভোগ করতে হবে। এজন্য বলা হয়েছে, ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’। আবার মহাভারতে আমরা পাচ্ছি বিপরীত দর্শন। সেখানে বকরূপী ধর্মের কাছে ‘সুখী’ ব্যক্তির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, যে ব্যক্তির ঋণ নেই এবং যিনি নিজের দেশে বাস করেন ও দিনান্তে শাকান্ন খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারেন তিনিই প্রকৃত সুখী। অর্থাৎ ঋণমুক্ত জীবনকেই সুখানুভবের শ্রেষ্ঠ পন্থা নির্দেশ করা হয়েছে মহাভারতে। স্বভাবতই, স্ববিরোধী তত্ত্ব-দর্শনের জাঁতাকলে পড়ে আছে সাধারণ মানুষ। তারা অত শত বোঝে না। তারা মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যে নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারলেই বর্তে যায়। তার জন্য তাকে ঘোরাফেরা করতে হয় সীমিত আয়ের বৃত্তের মধ্যে। ওই টাকার ভিতরেই তাকে খাদ্য বস্ত্র চিকিৎসা শিক্ষা স্বাস্থ্য বিনোদন সামাজিকতা প্রভৃতি সবই সামলাতে হয়। স্বাস্থ্যকর একটা বাসস্থানও তার ন্যূনতম চাহিদা। এজন্য হয় তাকে ভাড়া বাড়িতে থাকতে হয় কিংবা কিনতে হয় নিজের বাড়ি/ফ্ল্যাট। কিন্তু সবটাই সীমিত আয়ে একলপ্তে করে ফেলা অসম্ভব। এজন্য সাধারণ মানুষ কিছু সঞ্চয়ও করে। ক্রমপুঞ্জিত সঞ্চয় ভেঙেই সাধারণ মানুষকে স্থায়ী সম্পদ কিনতে হয়। 

Advertisement

মোট সঞ্চয় দিয়েও ঘরবাড়ি কেনা কষ্টকর। এজন্য মানুষকে কিছু ঋণ নিতে হয়। এছাড়া রয়েছে দুঃসময়ের ভ্রূকুটিও। দুঃসময় বলেকয়ে আসে না। ফলে সেই অস্বাভাবিক দিনের মোকাবিলাতেও সাধারণ মানুষ ধারদেনায় জড়িয়ে পড়তে পারে। এই যেমনটা হয়েছে বছরকয়েক আগের করোনাকালে। আর বিশ্বায়নের যুগ যেন চার্বাক দর্শন দ্বারাই চালিত। ফলে এই সময়কালে ঋণ ছাড়া চলার কথা ভাবাই যায় না। ঋণ কোনও দানসত্র নয়, ঋণ পাওয়া যায় সময়মতো পরিশোধের শর্তেই। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যদি সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ঋণ করে ফেলেন গোলটা বাধে তখনই। শরতের উঁকিঝুঁকিও যে ঋণজর্জর জীবনে সুখ বয়ে আনে না, তা কবি বুদ্ধদেব বসু শুনিয়েছেন সবিস্তারে। মানুষ সবই জানে। তবু তাকে ঋণের ফাঁদে পড়তেই হয়। আজকের ভারতবাসীও তার ব্যতিক্রম নয়। রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআই) জানাচ্ছে, কোভিড পূর্ববর্তী সময়কালের নিরিখে দেশবাসীর আর্থিক দায় বা ধারদেনার হার ১০২ শতাংশ বেড়েছে! সেখানে সম্পদ তৈরির হার বেড়েছে কতটা? ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ধারদেনা বৃদ্ধির হার দ্বিগুণেরও বেশি! এই পরিসংখ্যান ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল, অর্থাৎ গত ছ-বছরের। লক্ষণীয় যে, দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) নিরিখেও সম্পদ বৃদ্ধির হার কিন্তু কমেছে এবং লাফিয়ে বেড়েছে আর্থিক দায়। নরেন্দ্র মোদির নতুন ভারতে ব্যাংকঋণ নেওয়া অনেক সহজ হলেও ডাউন পেমেন্ট করতে হয় আগের মতোই। এবার টান পড়ছে সেখানেও। স্রেফ এই কারণেই, গড়ে এক একটি পরিবারের ঘাড়ে দেনার বার্ষিক গড় পরিমাণ সম্পত্তি তৈরির দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সর্বদা ক্রেডিট ইকোনোমির পক্ষে সওয়াল করেন। অর্থাৎ, মানুষ যত ভোগ্যপণ্যে খরচ করবে, ততই জিনিসপত্রের চাহিদা বাড়বে। আর সেই নিরিখে বাড়বে উৎপাদন। তখনই বাজার অর্থনীতিতে টাকার বেশি হাতবদল হবে বা অধিক মাত্রায় আবর্তিত হবে টাকা। কিন্তু প্রায় দেড়শো কোটি মানুষের ভারতে এই অঙ্কের উত্তর মিলছে কই! 
এর প্রধান কারণ বৈষম্য। বৈষম্য সারা পৃথিবীর এবং সর্বকালের সমস্যা। বৈষম্যই সমস্ত সামাজিক ব্যাধির জনক। তাই সমাজব্যবস্থা বদলের প্রধান লক্ষ্য হল—বৈষম্য হ্রাস এবং ক্রমে বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের দিকে অগ্রগমন। কিন্তু দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরও পৃথিবী বৈষম্য দূর করতে সমর্থ হয়নি। দিকে দিকে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েও কল্যাণকামী রাষ্ট্রগঠন থেকে এই পৃথিবী বহু দূরেই অবস্থান করছে। রকমারি বৈষম্যে দীর্ণ সমাজব্যবস্থার ঊর্ধ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি আমাদের ‘মহান’ ভারতও। এখনও এদেশের ৮০ কোটি মানুষ খাদ্যের জন্য রেশনের ভরসায় থাকে। বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রভৃতি না পেলে বহু মানুষের বেঁচে থাকা কঠিন হয়। কয়েক কোটি মানুষ এখনও গৃহহীন। বেশিরভাগ মানুষ স্বাস্থ্যবিমাসহ যাবতীয় বিমার আওতার বাইরে। দু-বেলা দু-মুঠো খাওয়ার জন্য কয়েক কোটি শিশু স্কুলছুট, এমনকি শ্রমিকের জীবন বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে, ধনাঢ্য ব্যক্তির সংখ্যাবৃদ্ধিতে প্রতিবছর আমেরিকা, ইউরোপ, এমনকি এশিয়ার ধনী দেশগুলিকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে এই ভারতই। তার ফলে ধনসম্পদ প্রতিনিয়ত বেশি বেশি করে কুক্ষিগত হচ্ছে কয়েকটি ব্যক্তি ও পরিবারের পরিধিতে। আর এরই অনিবার্য কুফল ভুগছে গরিব এবং মধ্যবিত্ত ভারতবাসী। তারা ঋণে ডুবছে তো ডুবছেই! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ