পি চিদম্বরম: বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কে ভারতের ভয়ানক গোঁড়ামি ছিল। বিশেষ করে আমদানি বিরোধিতায় অনায্য মনোভাব পোষণ করত, যাকে ইংরেজিতে ‘লুডাইট অ্যাটিটিউড’ বলে, সেটা ছিল। আমাদের নির্জোট সম্মেলন (নন-অ্যালায়েন্ড মুভমেন্ট বা সংক্ষেপে এনএএম বা ন্যাম), সাউথ-সাউথ (অর্থাৎ সাউথ সাউথ কোঅপারেশন, যেটি উন্নয়নশীল দেশগুলির ভিতরে সহযোগিতার নীতি সূচিত করেছে) প্রভৃতি ছিল। তা সত্ত্বেও আমরা বৈদেশিক বিষয়ে ‘বিশেষ সতর্ক’ ছিলাম। আমাদের এই বিশেষ সতর্কতার মধ্যে ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিদেশি বিনিয়োগ। আমরা দরজা বন্ধ রেখেছিলাম এবং সেগুলি খুলে দেওয়ার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিলাম চার দশক যাবৎ। আমরা আমদানি ও রপ্তানির জন্য ভয়ংকর নিয়মাবলি লিখেছিলাম: সবকিছুর জন্যই লাইসেন্স এবং পারমিট গ্রহণ জরুরি ছিল। এছাড়া বেশিরভাগ আমদানি, এবং কিছু রপ্তানি রাষ্ট্র পরিচালিত কর্পোরেশনের মর্জিনির্ভর করে রাখা হয়েছিল। আমাদের আমদানি ও রপ্তানির প্রধান নিয়ন্ত্রক (চিফ কন্ট্রোলার অফ ইমপোর্টস অ্যান্ড এক্সপোর্টস) নামে একজন কর্মকর্তা ছিলেন, সারা দেশেই ছড়িয়ে থাকত তাঁর কর্মকর্তাদের একটি বাহিনী। ওই বাহিনীর এক ও একমাত্র কাজ ছিল আমদানি ও রপ্তানির জন্য লাইসেন্স ইস্যু করা। এটি একটি ‘লাভজনক ব্যবসা’ ছিল। কিন্তু কেউই স্পষ্ট করে এই প্রশ্ন করতে পারেননি যে, ‘ঠিক আছে, আমরা না-হয় বুঝতে পারি কেন আমাদের আমদানির নিয়ন্ত্রক আছেন, কিন্তু আমাদের রপ্তানির জন্যও নিয়ন্ত্রক রাখতে হচ্ছে কেন?’
সূচনা
গৃহীত পলিসিতে রপ্তানি বাড়েনি। রপ্তানিমুখী ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরও তৈরি হয়নি তাতে। স্বভাতই সমৃদ্ধ হয়নি বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার। ইতিমধ্যে, ভারতের স্তরে অবস্থানকারী বেশ কয়েকটি দেশ ওপেন ইকনমি বা মুক্ত অর্থনীতি বেছে নিয়েছিল। মুক্ত বাণিজ্যে অংশগ্রহণের অনুমতিও দিয়েছিল তাদের দেশকে। তার দরুন দ্রুত ধনী হয়ে উঠেছিল দেশগুলি।
বিভিন্ন কারণে ভারতীয় অর্থনীতি ১৯৯০-৯১ সাল নাগাদ আর্থিক সংকটের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল। অর্থনৈতিক সংস্কার গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল ভারত। জোর দিয়েছিল বাণিজ্য নীতি সংস্কার, শিল্প নীতি সংস্কার এবং ফিসকাল ডিসিপ্লিন বা আর্থিক শৃঙ্খলার উপর। তার সুবাদে সংকটের প্রান্ত থেকে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিলাম আমরা। একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির পথে চলে এসেছিল ভারতীয় অর্থনীতি। আমরা ট্যারিফ বা শুল্ক কমিয়েছি। ২০১৩ সালের মধ্যে তা গড় ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। এছাড়া শুল্কের বাইরে যেসব বাধা ছিল সেগুলিও কমানো হয়েছে। আমরা জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড বা গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। তার ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হয়েছি আমরা। আমরা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছি। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, ভারতীয়রা মেনে নিয়েছে যে আমাদের অর্থনীতিকে একটি মুক্ত অর্থনীতি হয়ে উঠতে হবে।
মিডল গেম
তবে দুর্ভাগ্য এই যে, যখন উন্নয়নশীল দেশগুলি একটি মুক্ত অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে, তখন আসল মুক্ত অর্থনীতিগুলি হয়ে উঠেছে ‘প্রোটেকশনিস্ট’ বা ‘সংরক্ষণবাদী’। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একেবারে সেটাই!
সাময়িক সংকট প্রতিরোধের পদক্ষেপ এক জিনিস, আর সুরক্ষাবাদকে সরকারি অর্থনৈতিক নীতির মর্যাদায় উন্নীত করা আর এক জিনিস। ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টতই উচ্চ শুল্ক, অস্বচ্ছ নন-ট্যারিফ ব্যবস্থা, আমদানি নিরুৎসাহিতকরণ, প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারসাম্যের বাণিজ্য এবং আমেরিকান কোম্পানিগুলিকে আমেরিকার বাইরে তাদের কারখানা স্থাপন না-করার হুমকি দেওয়ার পক্ষে। তিনি বিশ্বাস করেন যে ‘শুল্ক’ তার ইচ্ছা পূরণ করবে। নীতি নির্ধারণে অদ্ভুত কিছু কারণ অন্তর্ভুক্ত করেছেন তিনি। যেমন—রিপাবলিকানপন্থী রাজ্যগুলির প্রতি পক্ষপাতিত্ব। কানাডার নেতাদের বিরুদ্ধাচরণ। আমেরিকান অর্থনীতি আর আমেরিকানদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না—এমন এক মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন। আরও উদ্ভট দাবি যে, উচ্চ শুল্কের বোঝা রপ্তানিকারকদেরই বহন করতে হবে, আমেরিকান কনজ্যুমার বা ক্রেতারা তা বইবেন না। প্রমাণিত অর্থনৈতিক সত্যগুলিকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—বৈষম্য, স্পেশালাইজেশন, শ্রম বিভাজন, সাপ্লাই চেইন না সরবরাহ শৃঙ্খল প্রভৃতি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প পাগলের মতোই জোর দিয়ে বলেছেন যে আমেরিকান কোম্পানিগুলিকে তাদের উৎপাদন অবশ্যই আমেরিকায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি এটিকে ‘রি-শোরিং’ বলছেন। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার কথা বলা সহজ কিন্তু বাস্তবে তা করা কঠিন’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘‘সিঙ্গল ভার্টিকালি-ইন্টিগ্রেটড ম্যানুফ্যাকচারার’দের দিন অনেক আগেই গত হয়েছে। আগে এই ধরনের সংস্থা একটি ফিনিশড প্রোডাক্ট তৈরির সবক’টি ধাপ একাই সামলাত এবং সুসম্পন্ন করত। তার মধ্যে পণ্যের নকশা তৈরি থেকে যাবতীয় কাঁচামাল জোগাড়, বিভিন্ন পার্টস প্রস্তুত এবং সেসব অ্যাসেম্বল করাসহ সব কাজই পড়ত। প্রযুক্তি খুবই জটিল, এবং এক জায়গায় প্রয়োজনীয় সমস্ত দক্ষতার সমাবেশ ঘটানো অসম্ভব।’ জেফ্রি স্যাকস ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একজন ‘আনসফিসটিকেটেড’ ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি একবিংশ শতকে উৎপাদনের জটিলতা বোঝেন না এবং বুঝতেও পারেন না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক আরোপকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন যাতে নতিস্বীকার করে নেওয়া দেশগুলিকে (যেমন অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া) ‘পুরস্কৃত’ করা যায় এবং উন্নতশির দেশগুলিকে (যেমন কানাডা, ফ্রান্স, ইউকে, ব্রাজিল) ‘শাস্তি’ দেওয়া যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার উপর উচ্চ শুল্ক এবং ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ বেস ট্যারিফ (কিছু ছাড় এবং বিলম্বিত প্রভাবসহ) আরোপ করার আগে পর্যন্ত ভারত ‘অনিশ্চিত’ তালিকায় ছিল। ভারতের ক্ষেত্রে বিবেচ্য রাশিয়ার খনিজ তেল কেনার জন্য জরিমানার বিষয়টি। ‘আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব’—এই প্রসঙ্গে ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল এটাই।
সম্ভাব্য পরিণতি
ভারত কোনোভাবেই নত হতে পারে না। ভারতেরও গোঁ ধরার প্রয়োজন নেই। প্রক্রিয়াটি যতই দীর্ঘ আর বেদনাদায়ক হোক না কেন, আলোচনার জন্য আমাদের ইচ্ছা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ককে তাঁর হাতিয়ার করার যে কাণ্ড করে চলেছেন অর্থনীতির নিয়মই তাঁকে তা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। আমেরিকাবাসীরা ব্যবহার করেন এমন অজস্র জিনিসপত্রের দাম ট্রাম্পের চাপানো উচ্চ শুল্কের সৌজন্যে ভয়ানক বেড়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রে বৃদ্ধি পাবে মুদ্রাস্ফীতি। আমেরিকান কোম্পানিগুলিকে সেদেশে ফেরাবার গোঁয়াতুর্মি উল্টো ফলদায়ক হবে। এইভাবে কর্মসংস্থান বাড়বে না। আরও মারাত্মক যেটা হবে তা হল—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃদ্ধির হার অনিবার্যভাবে কমে আসবে। ২০২৬ সালের ‘মিড-টার্ম ইলেকশন’ ট্রাম্প সাহেবের দম্ভ দমিয়ে দিতে পারে।
ভারতের দিক থেকে বলতে হবে যে, সীমিত সংখ্যক রপ্তানি পণ্য এবং গুটিকয়েক রপ্তানি বাজার নিয়ে ‘সন্তুষ্ট’ এক ‘অলস’ রপ্তানিকারক দেশ হয়ে থাকা ভারতের চলবে না। আমাদের রপ্তানিকারকদের উপর থেকে ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ তুলে নিতে হবে। অবশ্যই বড় করতে হবে আমাদের পণ্যের ঝুড়িটা। আন্তরিকতার সঙ্গে নতুন বাজারের সন্ধান করতে হবে আমাদের। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছিলাম। নতুন বাজার এমনভাবে ধরতে হবে যাতে সেখানেই ওই পরিমাণ পণ্য আমরা বেচে আমেরিকার ঘাটতিটা পুষিয়ে নিতে পারি। আমাদের অবশ্যই বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) নিয়মগুলি উদার করতে হবে। ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য স্বল্পমেয়াদে ইনসেনটিভ দিতে হবে। রপ্তানিকারকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আমরা বিনিময় হার সামঞ্জস্য করার কথা (অ্যাডাজাস্টিং দি এক্সচেঞ্জ রেট) বিবেচনা করতে পারি, যদিও তা আমদানির খরচ বাড়িয়ে দেবে। সমস্ত অপ্রয়োজনীয় আমদানি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
বৈদেশিক সম্পর্কের প্রাথমিক শিক্ষা হল, যদি কেউ নত হয়, হাঁটু গেড়ে বসে এবং হামাগুড়ি দেয়, তাহলে তাকে মাটিতে ফেলেই লাথি মারা হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর দোস্তিতে নরেন্দ্র মোদি এই শিক্ষাটি ভুলে গিয়েছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে, প্রতিরোধের লক্ষণও পরিস্ফুট। ভারতের তরফে আমেরিকাকে জানাতে হবে যে, ভারত মাথা উঁচু করেই দাঁড়াবে। ভারত তার স্বার্থ রক্ষা করবে। একইসঙ্গে ভারত থাকবে ন্যায়সংগত বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত। প্রক্রিয়া যত কঠিনই হোক না কেন, আলোচনা এবং চুক্তি সম্পাদন করতেও প্রস্তুত থাকব এই দেশ।


