Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ট্রাম্প-মোদি দোস্তিতে ভারত রক্ষা পাবে না

১২১৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা কর্তৃক স্বাক্ষরিত ম্যাগনা কার্টাকেই প্রথম অধিকার সনদ (চার্টার অফ রাইটস) বলে মনে করা হয়।

ট্রাম্প-মোদি দোস্তিতে ভারত রক্ষা পাবে না
  • ১৭ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ১২১৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা কর্তৃক স্বাক্ষরিত ম্যাগনা কার্টাকেই প্রথম অধিকার সনদ (চার্টার অফ রাইটস) বলে মনে করা হয়। বিশ্বের প্রথম পার্লামেন্ট বা সংসদ ‘আলথিং’ ১২৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আইসল্যান্ডে। প্রথম দুই কক্ষের আইনসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটেনে, ১৩৪১ সালে। কোনও একটি দেশের প্রথম লিখিত সংবিধান পাওয়া গিয়েছিল ১৬০০ সালে সান মারিনো সাধারণতন্ত্রের সৌজন্যে। ক্ষমতা পৃথকীকরণের মতবাদটি (দ্য ডকট্রিন অফ সেপারেশন অফ পাওয়ারস) ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কুর, ১৭৪৮ সালে প্রকাশিত স্পিরিট অফ ল’স বইতে সন্নিবেশিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের হাতেই কোনও একটি দেশের বিচার ক্ষমতা প্রথম ন্যস্ত হয়। সেটি ১৭৮৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনা।
হুমকির মুখে কল্যাণ
সাংবিধানিক ইতিহাসের মহৎ এবং সুশিক্ষাগুলি মার্কিন সংবিধানে মূর্ত হয়। ভারতের সংবিধান প্রণেতাগণসহ অনেক দেশই তার অনুলিপি করে নিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মুক্ত ও গণতান্ত্রিক দেশগুলি যুদ্ধ, দারিদ্র্য এবং রোগব্যাধির অবসান ঘটাবার মতো এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা সফলও হয়েছিল অনেকাংশে। যদিও নতুন ব্যবস্থা স্থানীয় কিছু যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারেনি, তবুও বলতে হবে যে, বিশ্ব এর আগে আট দশকের আপেক্ষিক শান্তি, অভূতপূর্ব বৃদ্ধি এবং ব্যাপক সমৃদ্ধির সাক্ষী হয়নি।
অতএব, এটি একটি বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে 
যে গত তিনবছরের পরিবর্তন এবং বিশেষ করে, 
গত ২০ জানুয়ারি পরবর্তী পরিবর্তন—বিশ্বকে একটি স্বার্থপর এবং স্বৈরাচারী ছাঁচে পুনর্গঠনের জন্য হুমকি দিচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদটি অনন্য। কারণ এর বিশাল কিছু নির্দিষ্ট এবং অনির্দিষ্টও কিছু ক্ষমতা রয়েছে। এসবের সাহায্যে আমেরিকাই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে, উইলিয়াম ম্যাককিনলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এলাকা সম্প্রসারণ করেছেন এবং সংযুক্ত করেছেন পুয়ের্তো রিকো, গুয়াম, ফিলিপাইন এবং হাওয়াইকে। উড্রো উইলসন এবং ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট বাকস্বাধীনতা দমন করেছিলেন এবং বিদেশি ও ভিন্নমতাবলম্বীদের আটক বা নির্বাসিত করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন এগজিকিউটিভ অর্ডারস। বারাক ওবামা মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই, ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা আইন (ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট) মোতাবেক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন লিবিয়ায়। মার্কিন মুলুকের অন্য প্রেসিডেন্টরাও তাঁদের পদের সীমাবদ্ধতা যাচাই করেছিলেন এবং তাঁরা পার পেয়েও গিয়েছিলেন দৃশ্যত অসাংবিধানিক কীর্তিকলাপ করে।
বিপর্যস্ত বিশ্ব ব্যবস্থা 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্পই সবার ঊর্ধ্বে। বিচ্যুতি এবং দুঃসাহসিক কাজকর্ম সত্ত্বেও, আট দশক যাবৎ আমেরিকাকে মুক্ত, গণতান্ত্রিক দেশগুলির নেতা মনে করা হয়েছে। দেশটি বিবেচিত হয়েছে বিশ্বব্যবস্থার ‘আন্ডাররাইটার’ (অন্যদের ঝুঁকির পরিমাপ যারা করে) হিসেবেও। একগুচ্ছ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছিল— শান্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং মানবাধিকারের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। তবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হওয়ার মাত্র আট সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘হু’ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। আমেরিকা তারপর হুমকি দিয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার সংসদ (ইউএনএইচআরসি) এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের ত্রাণ সংক্রান্ত সংস্থা (ইউএনআরডব্লুএ) থেকে বেরিয়ে যাবে কিংবা তাদের অর্থ প্রদান বন্ধ করে দেবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউএসএইড (মার্কিন অনুদান) বন্ধ করে দিয়েছেন। ওইসঙ্গে বিশ্বজুড়ে বন্ধ করে দিয়েছেন কয়েক ডজন কল্যাণমূলক কর্মসূচি। তিনি ন্যাটো ত্যাগ করতে পারেন এবং পরিত্যাগ করতে পারেন ইউরোপীয় মিত্রদেরও!
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এলন মাস্কের প্ররোচনায় পড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সরকারের কাঠামোটাই ভেঙে ফেলতে শুরু করেছেন। তিনি কয়েক হাজার কর্মীর চাকরি খেয়েছেন। এবার সম্ভবত সরকারের শিক্ষা বিভাগটাকেই লাটে তুলে দেবেন! 
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে বন্ধু শত্রুতে পরিণত হয়েছেন (প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি) এবং বন্ধুতে পরিণত হতে পারেন শত্রু (প্রেসিডেন্ট পুতিন)। ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 
৫১তম রাজ্য হিসেবে যুক্ত করার স্বপ্ন দেখেন। এমনকী, গ্রিনল্যান্ডকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগদানের জন্য সরাসরি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন! তিনি অশুভভাবে আরও বলেছেন যে, ‘আমরা যেকোনোভাবে এটি নেব।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প শত্রু (চীন) এবং বন্ধুর (ভারত) মধ্যে কোনও পার্থক্য করেননি এবং চুক্তি করতে ইচ্ছুক। তিনি অহংকার করে বলেন, ‘আমি সারা জীবন চুক্তি করেছি।’ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে অপমানিত এবং তাড়িয়েও দিয়েছিলেন। ‘সম্ভবত তিনি যখন গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলির জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত’ তখন ফের আমন্ত্রণ জানান তাঁকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে বলেছেন ‘প্রতিশোধ’!
বিশ্বজুড়ে কালো মেঘ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন ‘ট্রানজাকশনাল’ প্রেসিডেন্ট এবং একজন ‘কনফেসড ডিলমেকার’কে সঙ্গে নিয়ে দুনিয়া কোথায় পৌঁছবে? ভারতের উপরেই-বা এর কী প্রভাব পড়বে?
বিশ্বের জন্য, স্বৈরাচারী শাসকরা একটি ক্লাব গঠন করবেন। তাতে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন এবং জি জিনপিং। তাঁরা নানা অঞ্চল দখল করবেন। যেমন আমেরিকার নজরে পানামা খাল, কানাডা, গ্রিনল্যান্ড এবং গাজা। রাশিয়া ইতিমধ্যেই ক্রিমিয়া, আবখাজিয়া এবং দক্ষিণ ওসেটিয়া দখল করেছে। পুতিন এখন চান ইউক্রেন এবং সম্ভবত জর্জিয়াকে। আর চীন? তিব্বত এবং হংকংকে জোরপূর্বক তাদের মানচিত্রে জুড়ে নেওয়ার পর হাত বাড়িয়ে আছে তাইওয়ান, ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং দক্ষিণ চীন সাগর ও সংশ্লিষ্ট দ্বীপপুঞ্জের দিকে। এগুলি চীনের সঙ্গে সংযুক্ত করার ইচ্ছা তারা গোপনও করেনি। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন—এই তিনটি দেশ বিশ্বকে তাদের ‘এরিয়াজ অফ ইনফ্লুয়েন্স’-এ ভাগ করে নেবে। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রভাবিত অঞ্চলের সম্পদ লুণ্ঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে তারা। তখন ভারতের সামনে ঝুঁকি হয়ে উঠবে চীন এবং আমেরিকা বা রাশিয়া কেউই ভারতকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না।
ভারতের জন্য, দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 
কাছ থেকে আরও সামরিক সরঞ্জাম কিনতে বাধ্য 
হবে। ভারতও কম শুল্কে আমেরিকা থেকে 
আরও পণ্য আমদানি করতে বাধ্য হবে। আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যে টেনশন হ্রাসের মানে একটাই, রাশিয়ার তেল আর সস্তায় ভারত পাবে না। 
ভারতের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার জন্য ‘ব্রিকস’ সংগঠনকে প্ররোচনা দেওয়া হতে পারে। চীনের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হবে না ‘কোয়াড’। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তাদের ‘কমন প্যাটরন’ বা সাধারণ 
মুরুব্বি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক-যুদ্ধ শুরু করলে তাতে উল্টে যাবে নিয়মতান্ত্রিক বিশ্ব বাণিজ্য। 
পরিণামে ধ্বংস হয়ে যাবে ভারতের অর্থনীতি। জার্মানি ও ফ্রান্স যেমন বুঝতে পেরেছে, নিজেকেই রক্ষা করতে হবে ভারতকে।
নরেন্দ্র মোদি হয়তো ভাবতে পারেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব দিয়ে ভারত রক্ষা পাবে। কোনও চান্স নেই। ট্রাম্প সাহেব একজন ভয়ানক স্বার্থপর এবং অহংকারী ব্যক্তি। এমনকী বিশ্ব অর্থনীতিকে তিনি ধ্বংস করে দিলেও তাঁর কিছু যায় আসে না। এর পরিণাম দেখার জন্য চারটি বছর অপেক্ষা করতে হবে পৃথিবীকে।

Advertisement

 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ