সমৃদ্ধ দত্ত: ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের পণ্যের উপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্কের হুমকি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীন সর্বাগ্রে যা করেছে বিগত কয়েকমাস ধরে, সেটি হল ক্রিটিকাল মিনারেলস আমেরিকায় পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। আর সেই কারণে ট্রাম্প যতই হুমকি হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন, চীন সম্পর্কে আর কোনও ধমক দেন না। বরং চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যে আলোচনা আমেরিকার চলছে, সেটির সময়সীমা ৯০ দিন করে দিয়েছেন। চীন সবথেকে বেশি কোন রপ্তানি খনিজ আমেরিকায় রপ্তানি করা বন্ধ করে দিয়েছে? গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম, অ্যান্টিমনি। এই তিন খনিজ কী কাজে লাগে? সেমিকন্ডাকটর, সোলার প্যানেল এবং ইলেকট্রনিক্স চিপস। একইসঙ্গে যে মিনারেলস ইলেকট্রিক ভেহিকল নির্মাণে সবথেকে বেশি দরকার এবং ব্যাটারি উৎপাদনে প্রয়োজন, সেই সাপ্লাই চেইন কঙ্গো, কানাডা, উগান্ডার মতো রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে যোগসাজশ করে আমেরিকাকে পাঠানো বন্ধ করেছে চীন। আগামী দিনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হল ক্রিটিকাল মিনারেলস। আমেরিকা সেই কারণেই ইউক্রেন দখল করে রাশিয়াকে সব ইউরেনিয়াম এবং অন্য ক্রিটিকাল মিনারেলস দখল করতে প্রাণপণে বাধা দিচ্ছে। একবার রাশিয়া ইউক্রেনের ওইসব এলাকা সম্পূর্ণ দখল করে নিলে সেখান থেকেও ক্রিটিকাল মিনারেলস পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে আমেরিকার।
ব্রাজিলের উপর ট্রাম্প ৫০ শতাংশ শুল্ক বলবৎ করার পর ব্রাজিলের বামপন্থী সরকারের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভারের উদ্দেশে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছেন, লুলা যদি আমাকে সরাসরি ফোন করে কথা বলেন, আর শুল্ক কমানোর জন্য আবেদন করেন, আমার পছন্দসই একটি বাণিজ্য চুক্তিতে রাজি হন, তাহলে আমি ব্রাজিলের উপর বলবৎ হওয়া শুল্ক কমিয়ে দেব। লুলা পাল্টা কী জবাব দিয়েছেন? তিনি বলেছেন, ট্রাম্পকে ফোন করতে যাব কেন? যা ইচ্ছা করুন। আমি ফোন করব নরেন্দ্র মোদিকে। আমি ফোন করব জি জিনপিংকে। আমি ফোন করব ভ্লাদিমির পুতিনকে। আপনি এসব ভয় দেখানো কথা অন্য কাউকে বলবেন!
ট্রাম্প পুতিনকে আজ শুক্রবার পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। ইউক্রেনের যুদ্ধ থামানোর জন্য। সেই সময়সীমা মেনে রাশিয়া যুদ্ধ না থামালে ট্রাম্প রাশিয়া ও তার বন্ধুদের জন্য আরও অনেক বড় শাস্তির ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন। ঠিক অনুরূপভাবেই ট্রাম্প গত দু’ মাস ধরে নিয়ম করে ভারতকে হুমকি হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছেন। দেশবাসীর মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প যেভাবে ভারতকে অপমান করছেন, যখন তখন যা ইচ্ছা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, আর যা মুখে আসছে বলছেন, এসব সাধারণ ভারতবাসীদের কাছে অত্যন্ত অসম্মানজনক বলে মনে হচ্ছে। অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা ভারত সরকারের স্পষ্ট কঠোর কোনও বার্তা নেই কেন? ভারত যেসব বিবৃতি দিচ্ছে, সবই যেন আত্মপক্ষ সমর্থনে নানাবিধ কৈফিয়ৎ দেওয়ার মতো শোনাচ্ছে। ট্রাম্পের সুরের সঙ্গে ভারতের জবাব কিন্তু সঙ্গতিপূর্ণ হচ্ছে না। ভারতকে অনেক ব্যাকফুটে দেখতে লাগছে। এটা কি কাম্য?
২ হাজার কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিগত ৫ বছরে কেনা হয়েছে আমেরিকা থেকে। ১০ বছরের জন্য নতুন একটি ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিক ডিল হতে চলেছে। জুলাই মাসেই ওয়াশিংটনে গিয়ে ভারত সরকার ওই ডিলে সায় দিয়ে এসেছে। প্রশ্ন হল, ভারতবাসীর ট্যাক্সের টাকা তো আমেরিকা শুধু তিনটি সেক্টরে লুট করে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ১) অস্ত্র ২) অয়েল ৩) কর্পোরেট। অস্ত্র ক্রয় করে ভারত লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার। আমেরিকা থেকে বেশি দামে ভারত বছরের পর বছর ধরে ব্রেন্ট অয়েল কিনে এসেছে। এবং বহুজাতিক কর্পোরেশন মেটা (ফেসবুক,হোয়াটস অ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম) নামক কোম্পানির বিগত এক বছরে ভারত থেকে মুনাফা বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। মেটার মোট বিজ্ঞাপন বাবদ আয় হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা। যার সিংহভাগ ভারত থেকে।
গুগল ইন্ডিয়া ২০২৪ সালে ১৫০০ কোটি
টাকার মুনাফা করেছে ভারত থেকে। আমাজন
ইন্ডিয়া মার্কেটপ্লেস বিজনেস ২০২৪ সালে আয় করেছে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু আমাজনের সঙ্গে যুক্ত থাকা ভারতীয় কর্মসংস্থান কত হয়েছে! ১ লক্ষ মাত্র।
২০২৪ সালে ইউটিউব ভারত থেকে ১৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এই মুনাফা প্রধানত বিজ্ঞাপন থেকে। ভারতের ডিজিটাল অ্যাড মার্কেটের সিংহভাগ দখল করে রেখেছে ইউটিউব।
এগুলো সব আমেরিকান কোম্পানি। এছাড়া কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সিংহভাগ মুনাফা যায় আমেরিকায়। প্রশ্ন হল, ভারতের ১৪৪ কোটি জনসংখ্যা আমেরিকার কর্পোরেশনগুলির কাছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। কিন্তু সেই জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করছে যে সরকার, সেই ভারত সরকারের গর্জন শোনা যাচ্ছে না কেন? কেন ভারত চীন ও ব্রাজিলের মতো পাল্টা হুমকি ও হুঁশিয়ারি দিচ্ছে না? কেন ভারত প্রতীকী হলেও ঘোষণা করছে না যে, ট্রেড ডিল নিয়ে যতক্ষণ কোনও নিশ্চিত চুক্তি ও ভারতের স্বার্থবাহী শুল্ক কাঠামো না হচ্ছে, আপাতত আমেরিকার সঙ্গে সব ডিফেন্স ডিল স্থগিত থাকছে। ভারত সরকার হুমকি দিক যে, ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ভারতে চালাতে হলে বিশেষ লাইসেন্সিং রেজিমে আবেদন করতে হবে। চীন যেটা করেছে সম্প্রতি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি রপ্তানির ক্ষেত্রে। আমেরিকা চরম সঙ্কটে পড়বে যদি চীন এভাবে ক্রিটিকাল মিনারেলস বন্ধ করে রাখে।
কিন্তু ভারতের দ্বিধা কীসের? যদি ৫০ শতাংশ ট্যাক্স ভারতের কোম্পানিগুলিকে আমেরিকায় পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে দিতে হয়, তাহলে সবথেকে বড় সর্বনাশ হবে চারটি সেক্টরে। ১) ড্রাগস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস ২) টেক্সটাইল ৩) ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল এবং ৪) জুয়েলারি। এগুলোই সবথেকে বেশি রপ্তানি করা হয় আমেরিকায়। এইসব রপ্তানি কমে যাবে অথবা বন্ধ হয়ে যাবে। আর তার জেরে ভারতে উৎপাদন কমে যাবে। বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। বিপুল কর্মী ছাঁটাই হবে। বেকারত্ব চরম আকার নেবে।
এই সঙ্কট থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি উপায় ছিল। যদি ভারতবাসীর হাতে বিগত ১০ বছরে ক্রয়ক্ষমতা অনেক বেশি পৌঁছে দিতে সক্ষম হতো সরকার। কারণ বাইরের ডিমান্ড কম হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও জোগান সেই সমস্যাকে অনেকটা সামাল দিতে পারত। কিন্তু কর্মসংস্থান, আয়, সঞ্চয়। সবথেকে বড় ধাক্কা খেয়েছে। হাউসহোল্ড কনসামশন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, গ্রাম ও শহরে মানুষ পণ্য কেনা বহুগুণ কমিয়ে দিয়েছে। কারণ উদ্বৃত্ত টাকা নেই। একদিকে যেখানে আম জনতার কর্মসংস্থান নেই, আয় কমে যাচ্ছে, ব্যাঙ্কিং সেক্টরে ডিপোজিট করার প্রবণতা অর্থাৎ সঞ্চয় করা কমে যাচ্ছে, সেই সময় অন্যদিকে ভারতে সবথেকে দ্রুতগতিকে একটি সেক্টর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারতে সবথেকে বেশি কোন সেক্টর গত পাঁচ বছরে হু হু করে বাড়ছে? প্রাইভেট জেট! মাত্র দু বছরের মধ্যে ভারতে ১৬৮ টি নতুন প্রাইভেট
জেট রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। প্রাইভেট জেট ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা কিছু বছর আগে ছিল ২২৪। এখন ২৪৬৫। ২০২৫ সালের মার্চ মাসের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, এশিয়ায় প্রতি ১০টি প্রাইভেট জেট রুটের মধ্যে প্রতিদিন চারটি রুট ভারতের। মুম্বই, দিল্লি, আমেদাবাদ, বেঙ্গালুরু এবং পুণে! ভারতের সুপাররিচ আগে ক্রয় করত রোলস রয়েস এবং মার্সিডিজের মে ব্যাক। এখন প্রাইভেট জেট!
এই যে সর্বোচ্চ উপরের স্তরের সঙ্গে নীচের স্তরের আয়, পণ্যক্রয়, সঞ্চয় এবং সম্পত্তি ক্রয়ের বিরাট বৈষম্য, এটা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ধনের সমান বিভাজন হওয়া সম্ভব নয় পুঁজিবাদী সমাজে। কিন্তু এই বৈষম্যের জেরে ভারতের যে এখনও ৮২ কোটি মানুষকে গরিব কল্যাণ যোজনার বিনামূল্যে চাল-গম দিতে হচ্ছে, এটাই কি একটি ৭৮ বছরের গণতন্ত্রের সবথেকে বড় ব্যর্থতা নয়? আর সম্ভবত ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটা ভালো করেই জানেন। কিন্তু ভারত সরকার যতই নীরব থেকে ট্রাম্পের এই অপমান মেনে নেবে, ততই কিন্তু ট্রাম্প বার্তা পাবেন যে, ভারতের হাত পা বাঁধা। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন বাঁধা? ট্রাম্পকে পাল্টা হুমকি, হুঁশিয়ারি, চ্যালেঞ্জ ছুড়তে ঠিক আটকাচ্ছে কোথায়? এটা বেশ রহস্যময়!