পি চিদম্বরম: গত রবিবার প্রধানমন্ত্রীর ‘মন কি বাত’ উৎসর্গ করা হয়েছিল মূলত কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা এবং তার পরিণতির প্রতি। এই ব্যাপারে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে, মোদিজি বলেছেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির প্রতি ভারতের প্রতিটি মানুষ গভীর সহানুভূতিশীল। একজন মানুষ তিনি কোন রাজ্যের বাসিন্দা কিংবা তিনি কোন ভাষায় কথা বলেন, সেটা বিচার্য নয়, এই হামলায় যাঁরা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন তাঁদের বেদনা তিনি অনুভব করছেন। জঙ্গি হামলার ছবি দেখে আমি অনুভব করতে পারছি যে প্রতিটি ভারতীয়ের রক্ত টগবগ করে ফুটছে।’
প্রধানমন্ত্রী সারা দেশের অনুভূতি উপলব্ধি করেছেন। তিনি ভারতের জনগণের ঐক্য, সংহতি এবং সংকল্পের কথা বলেছেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন যে ভারত একটি জাতি হিসেবেই তার দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি প্রদর্শন করবে। আমি তাঁর দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ কথাগুলির প্রশংসা করছি।
অতিরিক্ত দাবি
কিন্তু, আমি এই ভয় পাচ্ছি যে, ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন তার সবই সঠিক ছিল না। পহেলগাঁও হামলা পূর্ববর্তী কাশ্মীর পরিস্থিতি সম্পর্কে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘কাশ্মীরে শান্তি ফিরে আসছিল; উন্মাদনা ছিল স্কুল ও কলেজে; অভূতপূর্ব গতি এসেছিল নির্মাণকাজে; গণতন্ত্র শক্তিশালী হচ্ছিল; রেকর্ড হারে বাড়ছিল পর্যটকদের সংখ্যা; সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছিল, নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছিল তরুণদের জন্য...।’ এই দাবির সঙ্গে সকলেই একমত হবেন না। এমনকী বিষয়টি নিয়ে মোদিজিও যখন গভীরভাবে ভাববার অবকাশ পাবেন, এই দাবিগুলি তখন তাঁর নিজেরই অতিরঞ্জিত বলে মনে হবে:
• কাশ্মীরে শান্তি হল একটি দূরবর্তী লক্ষ্য। গত ২৪ এপ্রিল একটি সর্বদল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে প্রেজেন্টেশনে দাবি করা হয় যে, ২০১৪ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ওই এক দশকে ১,৬৪৩টি জঙ্গি-প্ররোচিত ঘটনা ঘটেছিল। ওইসময়ে জঙ্গিরা ১,৯২৫ বার অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। তার মধ্যে ৭২৬টি ক্ষেত্রে তারা সফল হয় জঙ্গিদের আক্রমণে ওইসময় নিরাপত্তা কর্মী বা জওয়ান নিহত হন ৫৭৬ জন।
• স্কুলগুলিতে কোনোরকম প্রাণচাঞ্চল্য বা উন্মাদনা ছিল না: অ্যানুয়াল স্টেটাস অফ এডুকেশন রিপোর্ট (এএসইআর) ২০২৪ বলছে যে, ২০১৮ সালের পর সরকারি স্কুলগুলিতে ভর্তির হার কমে গিয়েছে। উঁচু ক্লাসের পড়ুয়া হয়েও ক্লাস টু’য়ের পাঠ্য জিনিস পড়তে পারার মতো শিক্ষার্থী কমে গিয়েছে।
• প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি ছিল যে, গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হচ্ছে! জম্মু ও কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার পর থেকে, গণতন্ত্র বাস্তবিকই হ্রাস পেয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর এখন একটি অর্ধ-গণতন্ত্র। কেননা, সেখানে লেফটেন্যান্ট গভর্নরই বিপুল ক্ষমতা ভোগ করছেন। তার ফলে নস্যাৎ হয়ে গিয়েছে মন্ত্রিসভা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্বাভাবিক ক্ষমতা। রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নেওয়া (এবং নির্বাচনের পরে পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি পালন না করা) একটি অব্যাহত অপমান। এই ঘটনা সেখানকার জনগণকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে।
• ২০২৩-২৪ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে বেকারত্বের হার সরকারি হিসেবেই ছিল ৬.১ শতাংশ।
• আরও জানা দরকার যে, ওখানকার মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের নীচে।
তবে, এটা সত্য যে কাশ্মীরে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু জঙ্গি হামলার ফলে তা সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত হল।
ঐকমত্য বিনষ্ট
পহেলগাঁওয়ে হামলার পরপরই দেশের সমস্ত শ্রেণির মানুষ সরকারকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন করেছে। কংগ্রেস এবং অন্য দলগুলি অকুণ্ঠ ও পূর্ণ সমর্থনের বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে, সরকার তার বিবেচনা মতো যেকোনও পদক্ষেপ করতে পারে। যদি মনে হয় যে ঐকমত্য ভেঙে গিয়েছে, তাহলে তো সরকারকে নিজেকেই দোষারোপ করতে হবে। এর অনেক কারণ রয়েছে: পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডে সরকার হতবাক হলেও অনুতপ্ত নয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর ত্রুটির সত্যটি কর্তৃপক্ষের কেউই কবুল করেননি। প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরব সফর কাটছাঁট করে দিল্লিতে ফিরে এসেও পহেলগাঁও, এমনকী শ্রীনগর পর্যন্ত যাননি। একটি সর্বদল বৈঠক অবশ্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি সেটি এড়িয়ে গিয়েছেন! তার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী কী করলেন? চলে গেলেন পাটনা। উপলক্ষ একটি রাজনৈতিক সমাবেশে ভাষণ দান।
রাজনৈতিক দলগুলি এবং নেতারা তখন থেকেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘এই গুরুতর ট্র্যাজেডিকে বিজেপি এক্সপ্লয়েট করছে! তাদের অফিসিয়াল এবং প্রক্সি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে তারা ব্যবহার করছে আরও বিভেদ, অবিশ্বাস, মেরুকরণ এবং বিভাজন সৃষ্টির মতলবে। অথচ এইসময় ঐক্য ও সংহতি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’ প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, পহেলগাঁওকে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়েছিল এবং ‘কোন ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে এমন মারাত্মক আক্রমণ সম্ভব হল, সেই বিষয়ে একটি বিশদ বিশ্লেষণ দাবি করা হয়েছিল।’ যখন প্রতিশোধ গ্রহণের উগ্র জাতীয়তাবাদী দাবি উত্থাপনের এক আবহ তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রাক্তন প্রধান এবং বিশিষ্ট কাশ্মীর বিশেষজ্ঞ এ এস দুলাত স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, ‘যুদ্ধ কোনও বিকল্প নয় ... এটি এমনকী শেষ উপায় নয়, বরং শেষ খারাপ বিকল্প।’ অন্যদিকে, সিন্ধু জল চুক্তি সাসপেনশনের বিষয়ে, করণ থাপারকে পাকিস্তানে নিযুক্ত প্রাক্তন হাই কমিশনার শরৎ সাভারওয়াল জানিয়েছেন, তিনি এটাকে কোনও উচিত পদক্ষেপ বলে মনে করেন না। তবুও এই ব্যাপারে তিনি সরকারেরই পাশে থাকতে ইচ্ছুক। পহেলগাঁও হামলার জন্য রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ অবশ্য দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ) কিংবা লস্কর-ই-তোইবাকে (এলইটি) দোষারোপ করেনি। এমনকী এও বলেনি যে, নির্লজ্জভাবে অমুসলিমদেরকেই সেখানে টার্গেট করা হয়েছিল। তবুও প্রস্তাবটিতে অনুকূল মোড় দেওয়ারই চেষ্টা করেছিল আমাদের সরকার। মোটেও ভালো ছিল না চীনের ভূমিকা। সে-দেশের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ওয়াইআই উল্টে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দৃঢ় পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন! নিরাপত্তার বিষয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ যে সংগত সেই দাবিও করেছেন তিনি। সর্বোপরি, তিনি পাকিস্তানকেই সমর্থন করেছেন, তাদের নিরাপত্তার স্বার্থরক্ষার্থে।
ভারত অপেক্ষা করছে
পহেলগাঁও হামলার পর দশদিন অতিক্রান্ত। সামরিক বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এ হয়তো অবাক করার মতো কিছু থাকবে না। তবে বোমারু বিমানের আক্রমণ আন্দাজ করে
নিয়ে আমাদের শত্রুপক্ষ তা রুখে দিতে পারে। তাছাড়া, অজয় সাহনি যেমন উল্লেখ করেছেন (দ্য রোড ফ্রম পহেলগাঁও, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৪ এপ্রিল, ২০২৫), এর অপারেশনাল বা কৌশলগত পরিণতি সন্দেহজনক। ভারতের সামরিক
শ্রেষ্ঠত্বের কারণে, আমি নিশ্চিত যে অন্যান্য বিকল্পও রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত একটি
সংবাদ প্রতিবেদন থেকে এটাই মনে করা হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ‘ফ্রি হ্যান্ড’ দিয়েছেন। গণতন্ত্রে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর। সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করে সামরিক বাহিনী। দেশের এবং বাইরের যেসব শক্তি কাশ্মীরে অশান্তি পাকাচ্ছে, ভারতের প্রতিক্রিয়ায় বা অ্যাকশনে তারা অবশ্যই ধাক্কা খাবে। ভারত এখন অপেক্ষা করছে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত