Bartaman Logo
১১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

স্বাধীন ভারতের প্রথম রেডিও-কণ্ঠ যূথিকা রায় আজ বিস্মৃতির অতলে

১৯৪৭ সাল। ১৫ আগস্ট। স্বাধীনতা দিবস। অল ইন্ডিয়া রেডিও’র দপ্তর। এক অফিসার হাঁফাতে হাঁফাতে এলেন—‘দাঁড়ান দাঁড়ান, পণ্ডিত নেহেরুর ফোন এসেছে। লালকেল্লায় পতাকা তোলার সময় পর্যন্ত গান গাইতে হবে আপনাকে।’ হতবাক যূথিকা রায় তাকিয়ে অফিসারের দিকে।

স্বাধীন ভারতের প্রথম রেডিও-কণ্ঠ যূথিকা রায় আজ বিস্মৃতির অতলে
  • ১৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: ১৯৪৭ সাল। ১৫ আগস্ট। স্বাধীনতা দিবস। অল ইন্ডিয়া রেডিও’র দপ্তর। এক অফিসার হাঁফাতে হাঁফাতে এলেন—‘দাঁড়ান দাঁড়ান, পণ্ডিত নেহেরুর ফোন এসেছে। লালকেল্লায় পতাকা তোলার সময় পর্যন্ত গান গাইতে হবে আপনাকে।’ হতবাক যূথিকা রায় তাকিয়ে অফিসারের দিকে। 

Advertisement

‘সোনে কা হিন্দুস্তান মেরা, সোনে কা হিন্দুস্তান...’ দিয়ে শুরু। তারপর মহাত্মা গান্ধীর পছন্দের ভজন। ঝাড়া এক ঘণ্টা চলল যূথিকার গান। গোটা ভারত কান পেতে শুনছে। মানুষ উদ্বেল। দেশের যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে লক্ষ ভারতীয় ভাসছেন চোখের জলে।
যে যূথিকাকে গান গাইতে নির্দেশ দিয়েছিলেন পণ্ডিত নেহেরু, যে যূথিকার গান সভা শুরুর আগে শোনাতে বলতেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী, যে যূথিকা রায়ের গান স্বাধীনতা দিবসের সকালে বাংলার ইথার তরঙ্গে আলোড়ন ফেলেছিল... কোথায় থাকতেন সেই যূথিকা রায়? উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর স্ট্রিট। ভগ্নপ্রায় ৫এ তিনতলা বাড়িটা অট্টালিকার মতো বড়। সেখানেই ভাড়ায় থাকতেন ভারতের জনপ্রিয়তম সঙ্গীতশিল্পী যূথিকা রায়। ১৯৩৪ সালে তিন মাসের মধ্যে ৬০ হাজার গানের রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল তাঁর। 
ততদিনে তিনি কিংবদন্তি। 
২০২৫ সাল। স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের দিন। শ্য্যামপুকুর স্ট্রিটে ৫এ বাড়িটির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে বছর পঁচিশের যুবক। ‘যূথিকা রায়ের বাড়িটি কোনটা বলতে পারেন?’ তাঁর উত্তর, ‘যূথিকা রায়? চিনি না তো!’ পরের প্রশ্ন, ‘বিখ্যাত গায়িকা ছিলেন। চেনেন না?’ উত্তর, ‘না চিনি না। সরি।’ তারপর গলির আরও জনা দশেককে এক প্রশ্ন, ‘চেনেন যূথিকা রায়কে?’ উত্তর প্রায় কমন, ‘না চিনি না। সরি।’
আমরাও দুঃখিত যূথিকাদেবী। বিদেশ হলে ওই বাড়ির সামনে অন্তত আপনার একটি মূর্তি থাকত। বাড়িটি এতদিনে সংরক্ষণ হয়ে যেত। সে বাড়িটি আপনার পাড়ার অনেকেই চেনেন না। সরি... আপনাকেও চেনেন না তাঁরা। ক্ষমা করবেন বাঙালিকে। 
৫এ বাড়ির কয়েক গজ দূরে রাস্তার কল। কাপড় কাচছেন মিন্টু বসাক। মধ্যবয়স্ক। সরকারি কর্মী। অবশেষে তিনি বললেন, ‘আমাদের পাড়াতেই তো থাকতেন দিদি। সুবিধা-অসুবিধায় যেতাম ওঁর কাছে। একবার শ্বাসের খুব কষ্ট হয়েছিল। আমরাই তো ডাক্তার গণেশ বেদজ্ঞকে নিয়ে গিয়েছিলাম।’ আপনার পাড়ার অনেকেই দেখলাম ওঁর নাম পর্যন্ত শোনেননি। মুখটা একটু ছোট হয়ে গেল মিন্টুবাবুর। 
কিংবদন্তি যূথিকা রায়ের একটি লম্বা সাক্ষাৎকার রয়েছে আবুল আহসান চৌধুরীর ‘বাঙালির কলের গান’ বইতে। সেখানে যূথিকা রায় নিজেই বলেছেন ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের সেই সকালের কথা। অনেক গবেষক বলে থাকেন, যূথিকা রায়ের ‘আমি ভোরের যূথিকা...’ গানটি দিয়ে বাংলা গান আধুনিক জগতে প্রবেশ করেছিল। গানটি সেই অর্থে যুগান্তর হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ৫এ বাড়ির সামনে ট্যাক্সি ধোয়ামোছা করছিলেন এক ব্যক্তি। ছবি কেন তোলা হচ্ছে প্রশ্ন করলেন। তারপর যূথিকা রায়ের খোঁজখবর করা হচ্ছে শুনে বললেন, ‘এটা আমাদের বাড়ি। আমাদের ভাড়াটে ছিলেন দিদি।’ সরাসরি প্রশ্ন করা হল, শোনা যায়, তাঁকে বাড়ি ছাড়তে একপ্রকার বাধ্য করা হয়েছিল। তারপর বরানগরে উঠে যান বাধ্য হয়ে। মানুষটি আগেই নিজের নাম জানাবেন না বলেছিলেন। এবার বললেন, ‘আপনাকে বলে আমার কী লাভ? আপনি আসুন।’ 
যূথিকাদেবী ভারতের বহু ভাষায় কত যে গান গেয়েছিলেন, তার হিসেব মেলা ভার। তবে রজনীকান্তের ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়...’ ওঁর গলায় যতবার শোনা যায়, ততবার গায়ে কাঁটা দেয়। তবু শ্যামপুকুর স্ট্রিট মনে রাখে না তাঁকে। মনে রাখে না বাঙালিও...।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ