এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল বৈষম্য। দুর্নীতিই যাবতীয় বৈষম্যের যুগপৎ পিতা ও মাতা। অর্থাৎ দুনিয়ার যাবতীয় সমস্যার জন্য দুর্নীতিকেই দায়ী করা চলে। ব্রিটিশ ভারতের নাগরিকরা এই সমস্যার জন্য পরাধীনতাকে দায়ী করতেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, দেশ একবার স্বাধীন হয়ে গেলে দুর্নীতি নামক ক্রনিক ব্যাধি থেকে ভারতবাসী অবশ্যই মুক্তি পাবে। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করে তোলাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, দুর্নীতিবাজদের ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে শাস্তি দেবেন। সোজা কথায়, দুর্নীতির শেষ দেখে ছাড়বেন বলেই তিনি কথা দিয়েছিলেন আমাদের। কিন্তু স্বাধীন দেশ কী দেখল, যত দিন যাচ্ছে বাড়ছে দুর্নীতির বহর। তার মস্ত প্রমাণ—গরিব আরও গরিব হচ্ছে এবং দেশের আয়-সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবারের হাতে। ধনাঢ্য (মিলিয়নেয়ার) ব্যক্তি এবং পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভারত প্রতিবছর ইউরোপ, এশিয়া, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে! প্রায় প্রতিটি নির্বাচন এবং সরকার গঠন প্রক্রিয়া পরিণত হচ্ছে টাকার খেলায়। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং অর্থায়নই বৃহত্তম গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো বিপদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইতিমধ্যেই।
স্বচ্ছতার আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে ভারতের র্যাঙ্ক যে প্রতিবছর নেমে যাচ্ছে তার কারণ এগুলিই। শাসক গোষ্ঠী ব্যাপারটাকে পশ্চিমা দুনিয়ার চক্রান্ত এবং কুৎসা বলে উড়িয়ে দেয় বটে, কিন্তু তা ধোপে টেকে না, কারণ বাস্তবটা সকলেই ওয়াকিবহাল। তাই গণতন্ত্রপ্রিয় ভারতবাসী দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই দেখতে চায় আন্তরিকভাবেই। দেশবাসীর এই মনোভাবকেই হাতিয়ার করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন জননেতা আন্না হাজারে। ২০১১ সালের ওই লড়াইয়ে তাঁর সঙ্গে ছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ওই মওকা গ্রহণে দেরি করেনি তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। বস্তুত তাঁরা একজোট হয়েই সংসদ থেকে সড়ক অচল করে দিয়েছিলেন। লোকপাল বিল পাশ এবং লোকপাল নিয়োগ পদ্ধতির ইশ্যুতে সংসদের একের পর এক অধিবেশন অচল করে দিয়েছিল গেরুয়া শিবির। অবশেষে ২০১৩ সালে সেই বিল পাশ হয়। ঠিক পরের বছরই কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি। লক্ষণীয় যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েই কেন্দ্রে ক্ষমতা হাসিল করেছিলেন মোদি। তিনি এবং তাঁর দল মূলত কংগ্রেসকেই কাঠগড়ায় তুলেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা হাসিল হওয়ার পর কী দেখলাম আমরা? লোকপাল প্রসঙ্গের ঠাঁই হল ঠান্ডাঘরে! কারণ, মোদি সরকারের প্রথম দফায় লোকপাল কমিটি ও চেয়ারপার্সনই নিয়োগ করা হয়নি। এরপর ২০১৯ সালের মার্চ মাসে প্রথম লোকপাল হিসেবে মনোনীত হন বিচারপতি পিনাকীচন্দ্র ঘোষ। ২০২২ সালে তিনি সরে যান। এরপর লোকপাল পদটি শূন্যই ছিল টানা দু-বছর। মাত্র গতবছর নতুন লোকপাল দায়িত্ব নেন। অর্থাৎ ১২ বছরে দুজনমাত্র লোকপাল পেয়েছে দেশ! সরকারি রাঘববোয়ালের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করে সাজার বহর কেমন? জাস্ট বিগ জিরো! সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হল, লোকপালের নিজস্ব আদালতই নেই। তবু এই অবসরে কিছু অভিযোগের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে লোকপাল। তার মধ্যে বিচার প্রক্রিয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬টি অভিযোগের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ যত অভিযোগ জমা পড়েছে সরকারি কর্মী, অফিসার এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে, তার ৯০ শতাংশই খারিজ হয়ে গিয়েছে ‘পদ্ধতিগত ত্রুটি’র অজুহাতে। নজরকাড়া বিষয় হল, দুর্নীতি সংক্রান্ত মোট যত অভিযোগ জমা পড়েছিল, তার মধ্যে ৩ শতাংশ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে! সংশয় নেই যে, সেসবের একটাও ধোপে টেকেনি।
কিন্তু কাজ থাকুক বা না-ই থাকুক, যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদন্তকারী কমিটি দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে একমাত্র আশা-ভরসা—সেই লোকপাল দপ্তরই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। কারণ, লোকপাল দপ্তর সাতটি উচ্চমানের বিএমডব্লু গাড়ি কিনতে চলেছে। তার টেন্ডারও বেরিয়ে গিয়েছে। প্রতিটির দাম ৭০ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি টাকা দিয়ে সাতটি বিদেশি গাড়ি কেনা হবে। সোজা কথায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শেষমেশ বিলাসিতার প্রতিযোগিতায় পর্যবসিত হয়েছে। প্রতিযোগিতার দুটি পক্ষ—সরকারের মন্ত্রী মহোদয়গণ এবং লোকপালের সাতজন সদস্য! হায়, মোদি সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই আর স্বদেশি স্লোগান। সরকার লোকপালকে নখদন্তহীন একটি সংস্থায় রূপান্তরিত করতে পেরেছে। তার জন্য দেশবাসী ভুলেই গিয়েছেন যে লোকপাল নামক একটি সংস্থা ভারতে আছে। এটাই সরকারের ‘সাফল্য’। দুর্নীতি-বৈষম্য-অনুন্নয়ন মিলিয়ে যে দুষ্টচক্রে দেশ আবর্তিত হচ্ছে, বহাল থাকছে সেই দুরারোগ্য দুর্ভাগ্যই। সরকার বা প্রধানমন্ত্রী বদলে এই দুর্ভাগা দেশের কিছুই যায় আসে না।