বেদে বলা হয়েছে, পরমপুরুষকে একমাত্র উপাস্য বলে গণ্য করা উচিত। তন্ত্রেও একই কথা বলা হয়েছে। তন্ত্রের বক্তব্য হ’ল:
বেদে বলা হয়েছে, পরমপুরুষকে একমাত্র উপাস্য বলে গণ্য করা উচিত। তন্ত্রেও একই কথা বলা হয়েছে। তন্ত্রের বক্তব্য হ’ল:
“তদেকং জপাম স্তদেকং স্মরামঃ/ তদেকং জগৎসাক্ষীরূপং নমামঃ।
তদেকং নিধানং নিরালম্বমীশং/ ভবাম্বোধিপোতং শরণং ব্রজামঃ।।”
“তদেকং জপামঃ”। বলা হয়েছে, যখন কেউ জপক্রিয়া করবে তখন সেই জপক্রিয়ার উদ্দিষ্ট দেবতা হবেন সেই পরমপুরুষ। জপ কী? জপ হ’ল অভ্যন্তরীণ অথবা বলা যেতে পারে বাহ্য-অভ্যন্তরীণ মানসাধ্যাত্মিক প্রয়াস বা স্বগত অভিভাবন। এতে হয় কী? —না, এতে মানস বৃত্তির অভ্যন্তরীণ-বাহ্যিক গতিধারা বাইরের দিক থেকে প্রত্যাহৃত হয়ে এক ও অদ্বিতীয় পরমপুরুষের দিকে পরিচালিত হয়; তা ছাড়া মনের চিত্তাণবিক সংরচনা অধিকতর চূর্ণীভূত হয়ে চিতিশক্তির সঙ্গে একীভূত হয়। “তদেকং স্মরামঃ”। স্মৃতি জিনিসটা কী? “অনুভূতবিষয়াসম্প্রমোষঃ স্মৃতিঃ”। যখন জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সহায়তায় কোন কিছু চৈত্তিক প্রত্যক্ষ করো বা মনে মনে কিছু ভাব তখন হয় কী? —না, মনের চিত্তাণবিক সংরচনা বাহ্যিক বস্তুর রূপ পরিগ্রহ করে। আর যখন কিছুকাল পরে বাইরের কোন তান্মাত্রিক স্পন্দনের সাহায্য ছাড়াই মানস শক্তির সহায়তায় মনের মধ্যে সেই আগের দেখা বা ভাবা জিনিসটাই পুনর্নির্মাণ কর, মনের ভেতরে এই পুনর্নির্মাণ পদ্ধতিকেই বলা হয় স্মৃতি। ধর, আজ থেকে দশ বছর আগে তুমি একটা ষাঁড় বা অন্য একটা জন্তু দেখেছ। দশ বছর পর আজ আবার যখন মনের মধ্যে আগেকার দেখা সেই ষাঁড় বা জন্তুটা পুনরায় তৈরী করে নিলে—এই যে তৈরী করা পদ্ধতি এরই নাম স্মৃতি (memory)।
‘অসম্প্রমোষঃ’ মানে পূর্বানুভূত সত্তার পুনর্নির্মাণ। এতে হয় কী? তোমার অতিস্ফুট সংস্কার অনুযায়ী জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে তুমি এমন অনেক বাহ্যিক বস্তু সৃষ্টি কর যার মাধ্যমে তুমি তোমার মনের ইচ্ছাকে পরিতৃপ্ত কর। যেমন ধর, তুমি রসগোল্লা খেতে ভালবাস। তুমি মনে মনে রসগোল্লা তৈরি করে নিতে পারতে। কিন্তু জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে তোমার মনের ভেতরে প্রায় রসগোল্লা তৈরী হয়ে যায়। সাধনার সময় সেই রসগোল্লা স্বতঃস্ফূর্ত্তভাবে মনের মধ্যে এসে যায়, তোমার সাধনায় বিঘ্ন ঘটায়। ধর, মনে মনে কেউ হয়তো ভাবছে অমুকের কাছ থেকে ঘুষ নেবে। সাধনার সময় সে কী ভাবছে—ঘুষ…ঘুষ…ঘুষ। তাহলে দেখ, তোমার বৃত্তিপ্রবাহ ঘুষের দিকে ছুটছে আর তাতে তোমার আধ্যাত্মিক স্মৃতিকে ব্যাহত করছে। তুমি চাইছ তোমার স্মৃতিকে বাড়াতে, কিন্তু পারছ না। সাধনাকালে অপেক্ষাকৃত শান্ত ভাবের দরুণ ওই সব অবাঞ্ছিত চিন্তা মনের মধ্যে এসে ভীড় করছে। ‘তদেকং স্মরামঃ’। এখানে বলা হচ্ছে, যদি মনের মধ্যে নিতান্তই কিছু স্মরণ করতে চাও তো কেবল সেই পরমপুরুষকেই মনে ঠাঁই দিও, অন্য কিছুকে নয়।
শ্রীআনন্দমূর্ত্তির ‘আনন্দ বচনামৃতম্’ (১ম-৩য় খণ্ড) থেকে