ভারতে মাওবাদী দলের মুষলপর্ব কি শুরু হয়ে গেল? কেন্দ্রীয় সরকারের আধা সামরিক বাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে দিশাহারা ওই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অন্তর্দ্বন্দ্ব একবার লক্ষ করা যাক। সদ্য আত্মসমর্পণকারী, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বেনুগোপাল ওরফে সোনু বা ভূপতি বা অভয় দল ছাড়ার আগে ঘোষণা করেছেন, তাঁদের পার্টি লাইন সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং সেই কারণে প্রতিরোধ না করে, আবেগে আত্মঘাতী না হয়ে মাওবাদী গেরিলারা নিজের জীবন রক্ষা করুন, আত্মসুরক্ষার দিকে নজর দিন। এটাই তাঁদের এই মুহূর্তের কর্তব্য। বেনুগোপালের বক্তব্যের সমর্থনে নাকি বিভিন্ন রাজ্যের মাওবাদী ডিভিশনগুলো বিবৃতি দিয়ে অস্ত্র সংবরণের কথা জানিয়েছে। এই বাস্তব পরিস্থিতিতে দলের সদ্য নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক দেবুজি অবশ্য বেনুগোপালকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে দেগে দিয়ে দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ঘটনা হল, সাধারণ সম্পাদকের ডাকে সাড়া মিলছে না। গত দু’দিনে ২৫৮ জন মাওবাদী, সমাজের মূলস্রোতে ফিরতে চেয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। ফলাফল দাঁড়িয়েছে, ১৯৬০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের একটি পুলিশ থানা এলাকা, একটি জেলা ও একটি রাজ্যে জন্ম নেওয়া মাওবাদী তথা নকশাল আন্দোলন পরবর্তী প্রায় ছয় দশকে ৫৬০টি পুলিশ থানা, ১৬০টি জেলা ও ১৪টি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়লেও বর্তমানে তা মৃত্যুপথযাত্রীর মতো ধুঁকছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, মাওবাদীদের প্রবল প্রভাব রয়েছে দেশে এমন জেলার সংখ্যা তিন। তিনটি জেলাই ছত্তিশগড়ে। এর বাইরে সামান্য প্রভাব রয়েছে, এমন জেলার সংখ্যা ১১-তে এসে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি শুধু গত দশ মাসে নিহত মাওবাদীর সংখ্যা ৩১২, ধৃত ৮৩৬ এবং আত্মসমর্পণ করেছেন ১৬৩৯ জন। পরিসংখ্যান বলে দিয়েছে, এ হল শেষের শুরু।
আসলে মাওবাদীদের এই পরিণতি বোধহয় অবশ্যম্ভাবী ছিল। বন্দুকের নলে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের খোয়াব দেখিয়ে দশকের পর দশক ধরে এই নিষিদ্ধ দলটি দেশের কয়েক হাজার নিরাপত্তাকর্মীকে হত্যা করেছে। তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি তথাকথিত বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল, এমনকী অন্যান্য বামপন্থী দলের নেতাকর্মীরাও। পুলিশের ‘স্পাই’ সন্দেহে প্রত্যন্ত গ্রামের গরিব মানুষও তাদের বন্দুকের লক্ষ্য হয়েছে বারবার। মূলত জঙ্গলঘেরা আদিবাসী জনজাতি, খনিজ সম্পদ ও বনাঞ্চলে নিজেদের অধিকারের দাবিতে যারা সরব, তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেই মানুষের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ছত্তিশগড়, অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা ও মহারাষ্ট্রের একটি অংশ, ঝাড়খণ্ড এবং এ রাজ্যের জঙ্গলমহল এলাকা একদা ছিল মাওবাদীদের বিচরণক্ষেত্র। সীমাহীন অনুন্নয়ন ও রাস্তাঘাট, সেতু, আলো, পানীয় জলের মতো পরিকাঠামো ক্ষেত্রগুলির অভাবকে হাতিয়ার করে মাওবাদীরা বিভিন্ন রাজ্যের প্রশাসনের সামনে প্রাচীর তৈরি করে একের পর এক মানুষ মারার অভিযান চালিয়েছে। সেই পরিস্থিতির বদল হতেই মাওবাদীদের যাবতীয় হুঙ্কার, প্রতিরোধ, নেটওয়ার্ক মুখ থুবড়ে পড়েছে। একদা ‘মিত্র’ গরিব মানুষও এখন তাদের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে যেখানে সংসদীয় ব্যবস্থার উপর সমাজের সব অংশের মানুষের গভীর আস্থা বারবার প্রমাণিত হয়েছে, সেখানে প্রবল শক্তিশালী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে বন্দুক-বিস্ফোরক নিয়ে চোরাগোপ্তা আক্রমণে কিছু লোক মরতে পারে, তাতে সমাজ বদল হয় না। এই সহজ কথাটা না বুঝে মাওবাদীরা নিজেরাই নিজেদের কবর খুঁড়েছে।
ভারতকে মাওবাদীমুক্ত করতে ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ শুরু হয়েছিল ইউপিএ আমলে, ২০০৯ সালে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম কাজ হাসিল করতে ২০১৩ সালের ‘ডেট লাইন’ ঘোষণা করেছিলেন। তারপর নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সেই কাজ সম্পন্ন করার পণ করেছেন। তাঁর দেওয়া সময়সীমা ২০২৬-এর ৩১ মার্চ। তার মানে, হাতে আরও সাড়ে পাঁচ মাস সময় আছে। কিন্তু এখনই বলা ভুল হবে না হয়তো যে, সাফল্যের লক্ষ্যে তিনি অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছেন। হয় আত্মসমর্পণ কর, নতুবা বন্দুকের সামনে দাঁড়াও— মোটামুটি এই নীতিতে এগচ্ছে মোদির প্রশাসন। একথা ঠিক, মূলত উত্তরপূর্বের বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর কার্যকলাপ রুখতে শান্তি আলোচনার পথ খোলা রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু মাওবাদীদের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছেন অমিত শাহ। ফলে নকশালদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনায় সমাধানের প্রস্তাব মানতে নারাজ কেন্দ্র। যার পরিণতিতে এখন কার্যত একতরফা মাওবাদী বিরোধী অভিযান চলছে। ফলে যতদিন যাচ্ছে, ইতিহাসের পাতায় চলে যাচ্ছে মাওবাদীরা। যদিও শহুরে নকশালদের একটি অংশ, যাঁরা রাষ্ট্রের উচ্ছিষ্ট ও দাক্ষিণ্যে দিনযাপন করেন, যাঁদের ‘অস্ত্র’ সোশ্যাল মিডিয়া, তাঁদের মাওবাদী-ভজনা অব্যাহত।