স্বামীজীর মাদ্রাজে আগমন এবং ঐ সময়ে নগরবাসীর উল্লাস বর্ণনা করতে গিয়ে একখানি বিখ্যাত সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিল: “পূর্বমুহূর্তেই ইহা সর্বত্র সুপ্রচারিত হইয়াছিল যে, সেদিন সকালে স্বামী বিবেকানন্দ সাউথ ইণ্ডিয়ান রেলওয়ের ট্রেনে মাদ্রাজে পৌঁছিবেন; অতএব মাদ্রাজের নগরবাসী, বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন শ্রেণীর হিন্দুরা—প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বালক-বালিকা, মহাবিদ্যালয়ের যুবকগণ, ব্যবসায়ী, উকিল, জজ, সর্বমতের সর্বজাতির লোক, এমন কি অনেক ক্ষেত্রে পুরনারীরা পর্যন্ত—পাশ্চাত্য জগতে সাফল্যলাভের পর স্বদেশ প্রত্যাগত স্বামীজীর অভ্যর্থনার জন্য সমবেত হইলেন। তাঁহার সংবর্ধনার জন্য সংগঠিত অভ্যর্থনাসমিতি তাঁহার সম্মানার্থ অতি চমৎকার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন এবং মাদ্রাজের এগমোর স্টেশনেই ট্রেনটি প্রথম থামে বলিয়া সেখানে তাঁহারা বেশ সুবন্দোবস্ত করিয়া রাখিয়াছিলেন। স্টেশনের অন্তর্ভাগে স্থান সঙ্কীর্ণ বলিয়া বিনা টিকিটে কাহাকেও প্রবেশ করিতে দেওয়া হয় নাই; সমগ্র প্ল্যাটফরমটিই লোকে লোকারণ্য হইয়া গিয়াছিল। এই জনতার মধ্যে মাদ্রাজের সুপরিচিত ব্যক্তিদের কেহই বাদ পড়েন নাই। সকাল প্রায় সাড়ে সাতটায় ট্রেন স্টেশনে আসিল। ট্রেনটি দক্ষিণ প্ল্যাটফরমে থামিবামাত্র জনতা উচ্চৈঃস্বরে হর্ষধ্বনি করিয়া উঠিল এবং হাততালি দিতে লাগিল; একটি দেশীয় ব্যাণ্ড পার্টিও উল্লাসপূর্ণ ভারতীয় সঙ্গীত আরম্ভ করিল। তিনি গাড়ি হইতে অবতরণ করিলে অভ্যর্থনা সমিতি তাঁহাকে সংবর্ধনা জানাইলেন। স্বামীজীর সহিত ছিলেন তাঁহার গুরুভ্রাতা স্বামী নিরঞ্জনানন্দ ও স্বামী শিবানন্দ, আর ছিলেন তাঁহার ইওরোপীয় শিষ্য শ্রীযুক্ত জে. জে. গুডউন। স্বামীজীকে বক্তৃতামঞ্চে লইয়া যাওয়া হইলে সেখানে ক্যাপ্টেন শ্রীযুক্ত জে. এইচ. সেভিয়ার ও তাঁহার পত্নী তাঁহার সহিত মিলিত হইলেন। ইঁহারা পূর্বদিন কলম্বোর বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ও স্বামীজীর অনুরাগী শ্রীযুক্ত টি. জি. হ্যারিসন ও তাঁহার পত্নীর সহিত মাদ্রাজে পৌঁছিয়াছিলেন। শোভাযাত্রা অতঃপর প্ল্যাটফরম ধরিয়া স্টেশনের প্রবেশদ্বারাভিমুখে চলিল; উহার পুরোভাগে চলিল ব্যাণ্ড পার্টি এবং চারিদিকে এমন হর্ষরব ও করতালিধ্বনি উঠিতে লাগিল যে, কর্ণ বধির হইয়া যায়। প্রবেশপথে পরিচয়পর্ব আরম্ভ হইল। স্বামীজীকে মাল্যদান করা হইল এবং ঐ-সময়ে ব্যাণ্ডে একটি সুন্দর গৎ বাজিয়া উঠিল। সেখানে যাঁহারা উপস্থিত ছিলেন তাঁহাদের সহিত কয়েক মিনিট বাক্যালাপের পর স্বামীজী মাননীয় বিচারপতি সুব্রহ্মণ্য আয়ার ও গুরুভ্রাতাদের সহিত যুগলাশ্ববাহিত একখানি অপেক্ষমাণ গাড়িতে উঠিলেন এবং এটর্নি শ্রীযুক্ত বিলিগিরি আয়েঙ্গারের বাসভবন ‘ক্যাসল কার্নান’ অভিমুখে যাত্রা করিলেন। সেখানেই তাঁহার বাসস্থান নির্দিষ্ট হইয়াছিল। এগমোর স্টেশনটি পতাকা, তালপত্র এবং পাতাবাহার প্রভৃতি দ্বারা সুসজ্জিত হইয়াছিল এবং প্ল্যাটফরমের উপর লাল শালু আস্তীর্ণ হইয়াছিল। বিজয়তোরণে লিখিত ছিল ‘স্বামী বিবেকানন্দ সুস্বাগত’। রেল কমপাউণ্ডের বাহিরে আসিয়া জনতা ক্রমেই বাড়িতে লাগিল। এবং স্বামীজীর প্রতি লোকের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের জন্য গাড়িখানিকে প্রতিপদে থামিয়া থামিয়া চলিতে হইল।


