নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: অভিনব কায়দায় চলছিল প্রতারণা। নকল সোনা বন্ধক রেখে চলছিল ঋণ নেওয়া। কোনও একটি নির্দিষ্ট দোকান থেকে নয়, দোকান পাল্টে পাল্টে। যে দু’জন এই কারবার চালাচ্ছিল, তারা সম্পর্কে শ্বশুর-জামাই। তিন মাস তক্কে তক্কে থাকার পর শনিবার দু’জনকে বাগে পেয়ে যায় বেহালার পর্ণশ্রী এলাকার ‘প্রতারিত’ স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ, তাদের মারে মৃত্যু হয়েছে শ্বশুর মহেন্দার সিংয়ের (৫৫)। গুরুতর জখম অবস্থায় উদ্ধার করে জামাই দীপক সিংকে পুলিস হাসপাতালে পাঠায়। শনিবার রাতে পর্ণশ্রী থানা এলাকার এই ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। নকল সোনা উদ্ধার করেছে পুলিস। প্রাথমিক তদন্তে তারা জেনেছে, রীতিমতো একটি চক্র তৈরি করে শ্বশুর-জামাই দীর্ঘদিন ধরে এই কারবার চালাচ্ছিল।
পুলিস সূত্রে খবর, শনিবার রাত ২.৩০টা নাগাদ পর্ণশ্রীর ধর্মরাজতলায় টহল দেওয়ার সময় কর্তব্যরত পুলিসকর্মীদের নজরে আসে, বছর ৩৩-এর এক ব্যক্তি জখম অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সে পুলিসকে জানায়, তার নাম দীপক সিং। তার শ্বশুর মহেন্দার সিংকেও গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। পুলিস মহেন্দারের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে। এম জি সাহা রোডে নিথর অবস্থায় মহেন্দারকে পাওয়া যায়। তাদের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। দু’জনকেই পুলিস স্থানীয় বিদ্যাসাগর হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে মহেন্দারকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসক। দীপকের আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
হাসপাতালে গিয়ে তদন্তকারী পুলিস অফিসার দীপকের বয়ান রেকর্ড করেন। তা থেকে জানা যায়, তারা দু’জনেই রাজস্থানের বাসিন্দা। সোনার গয়না বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছিল। সেগুলি নকল জানার পর জুয়েলারির দোকানদাররা তাদের গণপিটুনি দিয়েছে। বাঁশ ও রড দিয়ে ব্যাপক মারা হয়েছে তাদের। সে কোনওক্রমে বাঁচতে পেরেছে। দীপকই তদন্তকারীদের জানায়, যারা মারধর করেছে, তারা সবাই সোনার দোকানদার। সেই মতো পুলিস রাতেই চন্দন ঘোষ, সঞ্জীব কর্মকার ও বিশ্বজিত বিশ্বাস সহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে। ধৃত চন্দন পুলিসকে জানিয়েছেন, ২০২২ সাল থেকে তাঁর কাছে আসা শুরু করে দীপক ও মহেন্দার। গয়না বন্ধক রেখে তিন বছরে মোট ১০ লক্ষ টাকা ঋণ নেয় তাঁরা। বিশ্বাস অর্জনের জন্য তাঁর কাছে শ্বশুর-জামাই সোনার গয়নাও গড়িয়েছে। একইভাবে ওই এলাকার আরও সোনার দোকান থেকে তারা মোটা টাকা ঋণ নিয়েছে। মাস তিনেক আগে এক দোকানদার বন্ধক দেওয়া সোনা পরীক্ষা করাতে গিয়ে জানতে পারেন, সেগুলি সবই নকল। তখন স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সমিতির তরফে বেহালা, পর্ণশ্রী, ঠাকুরপুকুর এলাকার সমস্ত সোনার দোকানে ওই দু’জনের ছবি পাঠিয়ে গোটা বিষয়টি জানানো হয়। শনিবার রাতে দীপক ও মহেন্দার পর্ণশ্রী এলাকায় ফের কিছু অলঙ্কার বন্ধক দিয়ে টাকা ধার নিতে আসে। সেখান থেকে তারা বেরতেই মালিক সোনা পরীক্ষা করিয়ে দেখেন, সেগুলি নকল। তখন তাদের ফোন করে ‘টোপ’ দিয়ে বলা হয়, তাদের জমা রাখা সোনার উপর আরও কিছু টাকা ঋণ মিলবে। সেই ফাঁদে পা দিয়ে শ্বশুর-জামাই সেখানে এলে চন্দন, বিশ্বজিৎ সহ অন্যান্যরা তাদের বেধড়ক মারধর করে বলে অভিযোগ। পুলিস জেনেছে, মহেন্দার ও দীপক এভাবে নকল সোনা দিয়ে ঋণ নেওয়ার একটি চক্র চালায়। কোনও এক জায়গায় মাস দেড়েক থেকে সেখান থেকে টাকা হাতিয়ে অন্য জায়গায় ডেরা বাঁধে। একাধিক থানায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।