Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গুরুত্বপূর্ণ ২৬ সেকেন্ড!

সময় মাত্র ২৬ সেকেন্ড! এই নামমাত্র সময়ের অপরিসীম গুরুত্বের কথা একদিন শোনা গিয়েছে বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যায়। তাঁরা বলেছেন, পৃথিবী নাকি প্রতি ২৬ সেকেন্ডে শান্ত ও ছন্দোবদ্ধভাবে স্পন্দিত হচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ ২৬ সেকেন্ড!
  • ২ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সময় মাত্র ২৬ সেকেন্ড! এই নামমাত্র সময়ের অপরিসীম গুরুত্বের কথা একদিন শোনা গিয়েছে বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যায়। তাঁরা বলেছেন, পৃথিবী নাকি প্রতি ২৬ সেকেন্ডে শান্ত ও ছন্দোবদ্ধভাবে স্পন্দিত হচ্ছে। এই মৃদু কম্পন মানুষ অবশ্য অনুভব করতে পারেন না। ‘সিসমোমিটার’-এ এই স্পন্দনের অস্তিত্ব টের পাওয়া গিয়েছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘মাইক্রোসিজম’। যদিও এই স্পন্দন কেন হচ্ছে, তার কোনও নিশ্চিত ব্যাখ্যা আজও জানা যায়নি। তবে ভোটের বিহারে এই ২৬ সেকেন্ড সময় এখন যাবতীয় বিতর্ক-আলোচনার কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে। সৌজন্যে এনডিএ জোট। শুক্রবার পাটনায় এনডিএ-র ইস্তাহার প্রকাশের অনুষ্ঠান ছিল। সাধারণত এই ধরনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী এবং অন্যান্য নেতারা ইস্তাহার হাতে গ্রুপ ছবি তোলেন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলির ব্যাখ্যা করেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। এই বহু চেনা ছবিটার ছন্দপতন দেখা গেল শুক্রবার। শুরুতে এনডিএ নেতারা একে একে মঞ্চে উঠলেন, ইস্তাহার হাতে ছবিও উঠল। তারপরই দেখা গেল, নীতীশ কুমার, জেপি নাড্ডা, ধর্মেন্দ্র প্রধানের মতো নেতারা একটা শব্দ উচ্চারণ না করেই বিদায় নিলেন! কিছু বুঝে ওঠার আগে ২৬ সেকেন্ডেই শেষ হল সাংবাদিক সম্মেলন! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোট-রাজনীতির ময়দানে দুনিয়া কাঁপানো প্রচারের পাশাপাশি ভোটারদের মনে আস্থা জাগানো এবং বিরোধীদের আক্রমণে ফালাফালা করার মঞ্চ হিসাবে ইস্তাহার প্রকাশের অনুষ্ঠানটিকে ব্যবহার করাই রাজনৈতিক দলগুলির দস্তুর। সেখানে ২৬ সেকেন্ডে খেলা শেষ করে মাঠ ছেড়ে দেওয়াটা কি নীতীশের জন্য মোদি-শাহের কোনও বার্তা?

Advertisement

প্রতি ২৬ সেকেন্ডে পৃথিবীর চাপা ‘হৃদস্পন্দন’-এর নিশ্চিত কারণ যেমন এখনও জানা যায়নি, তেমনই এই নজিরবিহীন কাণ্ডের কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও শোনা যায়নি এনডিএ নেতাদের মুখে। এতেই জল্পনার পারদ চড়তে শুরু করেছে। সাধারণত ইস্তাহার প্রকাশের অনুষ্ঠানে দল বা জোটের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়। এবং তিনিই সাংবাদিক বৈঠকের মূল বক্তা থাকেন। শুক্রবারের ঘটনার পর একটা বড় অংশের ব্যাখ্যা হল, এবার ফের ক্ষমতায় এলে জোটসঙ্গী নীতীশকে পুনরায় মুখ্যমন্ত্রীর পদে রাখতে নারাজ বিজেপি। তাই নীতীশের মুখ বন্ধ রাখতেই ফটোসেশনের পর কৌশলে মঞ্চও ফাঁকা করে দিয়েছে বিজেপি। নীতীশের অবাক করা নীরবতায় প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি তাহলে মানসিক ও শারীরিকভাবে যথেষ্ট সুস্থ নন? এই যুক্তিতেই হয়তো এনডিএ ক্ষমতায় ফিরলে নীতীশকে মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসতে দেওয়া হবে না। বিরোধীদের দাবি, নিজেদের ইস্তাহারে নিজেদেরই বিশ্বাস নেই বলেই প্রশ্ন এড়াতে ছবি তুলে মাত্র ২৬ সেকেন্ডে বৈঠক শেষ করে দেওয়া হয়েছে। অনেকে আবার মনে করছেন, বিজেপিকে চাপে রাখতে এ হল ‘পাল্টুরাম’ বলে খ্যাত নীতীশের খেলা। কারণ যাই হোক, এই অত্যাশ্চর্য ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে, বিজেপির আচরণে তিনি মোটেই খুশি নন। তাই নিজেই ছবি তুলে চলে গিয়েছেন। একটাও কথা বলেননি। সোজা কথায়, এনডিএ-তে ‘অল ইজ নট ওয়েল’!
এনডিএ বা ইন্ডিয়া জোট— দু’পক্ষের কাছেই বিহারের ক্ষমতা দখল কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ইস্তাহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বহর দেখলেই বোঝা যাবে। ২০ বছর ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা বিরোধীদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি হল, প্রতি পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দিতে ক্ষমতায় আসার কুড়ি দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় আইন আনা হবে। রাজ্যের কয়েক লক্ষ কর্মরত মহিলার (জীবিকা দিদি) বেতন ৩০ হাজার টাকা করা হবে। মহিলাদের জন্য বেটি ও মা (বাড়ি, অন্ন, আয়) প্রকল্প চালু করা হবে। বিজেপির কটাক্ষ, ইন্ডিয়া মঞ্চ সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করার মতো অর্থ কোথায় পাবে! এসব করতে গেলে এখনকার থেকে দশগুণ আয় বাড়াতে হবে রাজ্য সরকারকে। অথচ সেই এনডিএ জোটের ইস্তাহারেও এক কোটি সরকারি চাকরি, ১ কোটি ‘লাখোপতি দিদি’, ৫০ লক্ষ নতুন আবাসন, ঘরে ঘরে ১২৫ ইউনিট ফ্রি বিদ্যুৎ, সাতটি এক্সপ্রেসওয়ে, ১০টি শিল্পতালুক সহ প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছে! প্রশ্ন উঠেছে, এনডিএ জোট বর্তমানে ক্ষমতায়, নীতীশ কুমার টানা দু’দশক ধরে মুখ্যমন্ত্রী। গত ২০ বছর ধরে রাজ্যবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলির কতটা পূরণ হয়েছে, এবারের ইস্তাহার প্রকাশের মঞ্চ থেকে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত ছিল। তাহলেই দুধ আর জল আলাদা হয়ে যেত। এবারের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি প্রমাণ করে, গত ২০ বছর বিহারবাসীকে দেওয়া অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই পূরণ হয়নি। সেই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই ২৬ সেকেন্ডে সব শেষ করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনা হল, সিএজি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিহার এই মুহূর্তে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাজ্য বলে পরিচিত। রাজ্য বাজেটের ৩৫ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থই খরচ হয় কর্মীদের বেতন, পেনশন ও ঋণের সুদ মেটাতে। যেখানে রাজ্য-জিডিপিতে দেনার অংশ ৪৫ শতাংশ, যেখানে আয়ের পরিমাণ মাত্র ২০-৩০ শতাংশ, সেখানে এনডিএ ক্ষমতায় এলে প্রতিশ্রুতির হাল কী হবে তা সহজেই অনুমেয়!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ