Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নির্ভেজাল ভোটার তালিকা

অবশেষে বাংলাতেও হতে চলেছে এসআইআর। বিহারে ২০২৫ সালের এসআইআর ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। তা নিয়ে জলঘোলা এবং দেশজুড়ে বিতর্ক হয়েছে বিস্তর। বেশিরভাগ বিরোধী দলের মূল অভিযোগ, বিজেপির সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই এই উদ্যোগ।

নির্ভেজাল ভোটার তালিকা
  • ২৯ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অবশেষে বাংলাতেও হতে চলেছে এসআইআর। বিহারে ২০২৫ সালের এসআইআর ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। তা নিয়ে জলঘোলা এবং দেশজুড়ে বিতর্ক হয়েছে বিস্তর। বেশিরভাগ বিরোধী দলের মূল অভিযোগ, বিজেপির সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই এই উদ্যোগ। তাদের দাবি, বিহারে বিজেপিসহ গোটা গেরুয়া শিবিরের টালমাটাল অবস্থা। স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং নিরপেক্ষভাবে ভোট হলেই হিন্দিবলয়ের ওই বৃহৎ রাজ্যে এনডিএর ভরাডুবি হবে। এমন আশঙ্কা থেকেই নাকি বিরোধীসমর্থক ভোটারদের একাংশকে বাদ দিতে মোদি-শাহের পার্টি জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করেছে। বিরোধীদের মূল অভিযোগ, এতে সবচেয়ে ক্ষতি গরিব মানুষের। বিরোধীদের যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে এসআইআরের পক্ষেই সওয়াল করেছে বিজেপি নেতৃত্ব। তাদের দাবি, এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় শাসক দলের কোনও সম্পর্ক নেই। বৃহত্তম গণতন্ত্রের পবিত্রতা রক্ষার জন্য কমিশনই তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছে মাত্র। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনও দাবি করেছে এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। বরং তারা অত্যন্ত দক্ষতা এবং সংবেদনশীলতার সঙ্গেই এই কাজটি সম্পন্ন করেছে। বস্তুত বিহারে অনুষ্ঠিত এসআইআর নিয়ে দিনের শেষে কোনও অভিযোগ এবং বিতর্কের অবকাশ নেই। 

Advertisement

অতএব সোমবার পশ্চিমবঙ্গসহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বকেয়া এসআইআর দ্বিতীয় ধাপে সম্পন্ন করার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ২০০২-০৪ সালে অনুষ্ঠিত এসআইআর অনুযায়ী ভোটার তালিকায় নিজের অথবা বাবা-মায়ের নাম থাকলেই হবে। তাহলে আর নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র চাওয়া হবে না। বাংলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ২০০২-এর তালিকা। তাতে নাম না-থাকলে দেখা হবে ২০০৩-এর খসড়া তালিকা এবং জানতে চাওয়া হবে ওইসময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোথায় ছিলেন। ভোটারের কাছে তার প্রমাণপত্রও দাবি করা হবে। এই শর্তই প্রধান হয়ে দাঁড়াল। মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে গিয়েছে প্রস্তুতি। ৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত হবে খসড়া সংশোধিত ভোটার তালিকা। তখন নেওয়া হবে অভিযোগ, নালিশ, আবেদন এবং চলবে শুনানি ও নথিপত্র পেশ। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে ৭ ফেব্রুয়ারি। বিএলওরা ৪ নভেম্বর থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্দিষ্ট ফর্ম দেবেন। সেটি পূরণ করে সইসমেত জমা দিতে হবে বিএলওকে। ভোটার তালিকার অনলাইন লিংক খুলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম এবং তথ্যাদি ২০২৫ সালের মতো পাওয়া গেলে তৎক্ষণাৎ অনুমোদন দেবেন বিএলও। কিন্তু ২০০২ সালের তালিকায় নিজের ও বাবা-মা কারও নাম না পেলেই সমস্যা—চাওয়া হবে নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি। প্রয়োজনে বাড়িতে নোটিশ যাবে। আধার কার্ড ছাড়াও যেকোনও একটি সহায়ক নথি পেশ করতে হবে। কমিশনের দাবি, যে ১১ রকম নথির কথা বলা হয়েছে তার অন্তত একটি জোগাড় করা কঠিন হবে না। 
কিন্তু তবু শঙ্কা কাটছে বহু মানুষের। তাই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের দাবি, এসআইআর নিয়ে যেন কোনও প্রকার সংকীর্ণ রাজনীতি না-হয়। জিনিসটা যেন কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দলকে ভোটে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার খুড়োর কলে পর্যবসিত না-হয়। সমস্ত মৃত ব্যক্তির নাম অবশ্যই ছাঁটতে হবে। সংশোধন করা চাই ডুপ্লিকেট নামধামও। বাংলাদেশি/পাকিস্তানি/রোহিঙ্গা এমন কুরুচিকর অভিযোগে যেন কোন ও ভারতীয় মুসলিম নাগরিক হয়রানির শিকার না হন, তা দেখতে হবে। ভারতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা—সবাই শিক্ষিত নন। বহু মানুষ গৃহহীন। স্থায়ী চাকরি কিংবা পেশাতেও যুক্ত নন সকলে। তাই লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে বহির্বঙ্গেও কাজে যেতে হয়। এছাড়া অসংখ্য মানুষ বারবার ঠাঁইনাড়া হয়ে পড়েন বন্যা, নদীভাঙন, পাহাড়ে ধস প্রভৃতি কারণেও। অসংখ্য মানুষ বানজারা হিসেবেও বেঁচে আছেন যুগ যুগ ধরে। বলা বাহুল্য, তাদের কারোরই স্থায়ী ঠিকানা নেই। ফলে এই ধরনের মানুষের পক্ষে বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব হয় না। তার মধ্যে এসআইআরে গ্রাহ্য নথিও থাকতে পারে। এই মানুষগুলি তো ভারতীয়ই। স্রেফ এসআইআরের শর্ত পূরণ করতে না-পারার জন্য তাদেরকে যেন ‘বিদেশি’ দেগে দেওয়া না-হয়। ভারত রাষ্ট্রের সুরক্ষা এবং সার্বভৌমত্ব অবশ্যই অগ্রাধিকার। এই জিনিস বজায় রেখেও বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে। এই ধরনের অসংখ্য দুর্বল মানুষকেও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিকল্প উপায় অবশ্যই নিতে হবে। কোনও রাজনৈতিক চাল বা কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের কাছে মহান ভারতের বিবেক ও মানবিক দৃষ্টির যেন সামান্যতম পরাজয়ও না ঘটে। দিনের শেষে এটাই প্রমাণ করা জরুরি যে, ভারত কোনও স্বৈরতান্ত্রিক দেশ নয়, বরাবরের মতোই কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নীতি-আদর্শ পাথেয় করে পরিচালিত। প্রতিটি প্রকৃত ভারতীয়ের জন্য পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাসযোগ্য দেশ হয়ে উঠতে পারে যেন আমাদের এই বৃহত্তম গণতন্ত্র।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ