Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

না আঁচালে বিশ্বাস নেই!

বাঙালির অন্যতম প্রিয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘কেউ কথা রাখেনি’। ব্যক্তিগত আক্ষেপের কবিতা। কবিতাটি শুরু হয়েছে ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি’ দিয়ে।

না আঁচালে বিশ্বাস নেই!
  • ৩০ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বাঙালির অন্যতম প্রিয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘কেউ কথা রাখেনি’। ব্যক্তিগত আক্ষেপের কবিতা। কবিতাটি শুরু হয়েছে ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি’ দিয়ে। নাতিদীর্ঘ লেখাটি শেষ হয়েছে ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না।’ আক্ষেপ দিয়ে। সুনীলের এই কবিতাটি বহুপঠিত। মোদি জমানার বারো বছরে এর পাঠ বেড়েও গিয়েছে হয়তো। এই অনুমানের কারণ, কোনো রচনায় মানুষ যখন নিজেকে বিশেষভাবে খুঁজে পায় তখন সেই লেখার দিকে তার নজর যায় বেশি। নরেন্দ্র মোদি দেশের ক্ষমতা হাতে পেয়েছেন ২০১৪ সালে। ক্ষমতা দখলের জন্য তিনি এবং তাঁর দল বিজেপি অনেক আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আর ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্র মোদি এ পর্যন্ত কত যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা কারো গোনাগাঁথা নেই, সম্ভবত সবগুলি মনে নেই তাঁর নিজেরও! 

Advertisement

কথা দেওয়া এবং কথা রাখার মধ্যে কেন এই দুস্তর ব্যবধান? সংগত প্রশ্নটি উঠবেই। আরো জিজ্ঞাসা থাকবে: এত যে কথা, তার উৎস বা তাড়না কী? সত্যিই কি জনকল্যাণচিন্তা কাজ করেছে এসব প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাসের পিছনে? সহজ অনুমান এটাই যে, না। প্রতিটি কথা দেওয়া হয়েছে তাৎক্ষণিক লাভালাভের তাগিদ থেকে। সেই তাগিদটা হল, ব্যাপক হারে ভোট পক্ষে আনা। যাতে ভোটে জিতে ক্ষমতা দখল নিশ্চিত করা যায়। বলা বাহুল্য, বেশিরভাগ প্রতিশ্রুতি/আশ্বাস প্রদানের সময়কাল কোনো-না-কোনো নির্বাচন—মূলত লোকসভা অথবা বিধানসভা ভোট। দেশবাসীর অভিজ্ঞতা বলে, একটি ভোটের সময় মানুষকে প্রভাবিত করার জন্য কী খোয়াব দেখানো হয়েছিল পরবর্তী ভোট আসার আগেই তা বিস্মৃত হয়েছেন শাসক। আরো নির্দিষ্ট করে বলা যায়, পরবর্তী ভোটের প্রতীক্ষা নয়, একেকটি ভোট মিটতেই বেমালুম সব প্রতিশ্রুতি ভুলে মেরেছেন মোদি ও তাঁর সম্প্রদায়। পরিষ্কার ‘কাজের সময় কাজি/ কাজ ফুরোলেই পাজি’ মার্কা রাজনীতির নিবিড় অনুশীলন করছে গেরুয়া বাহিনী। তাই বছরে ২ কোটি চাকরি, প্রত্যেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা, আচ্ছে দিন, সব কা সাথ সব কা বিকাশ, ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে রেশন, সব ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ, পরিস্রুত পানীয় জলের সংযোগ সবার ঘরে, সবার মাথার উপর ছাদ প্রভৃতি প্রতিশ্রুতি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। দেশের অভিভাবকের লাগাতার কথার খেলাপের দরুন যেটা অবশ্যম্ভাবী, ঘটে চলেছে সেটাই—দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈষম্য ও বিভেদ বাড়ছে—দেশজুড়েই। 
শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, যেসব রাজ্য ডবল ইঞ্জিনের জোরে চলছে, সেসব জায়গার আখ্যানও অভিন্ন। যেমন দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ছিল, ‘আমরা সরকারে এলেই দিল্লির সব মহিলা পাবেন ২৫০০ টাকা হারে মাসিক আর্থিক সহায়তা।’ সারা দেশ জানে, জনকল্যাণ/নারীকল্যাণের এমন অভিনব সরকারি প্রকল্প প্রথম চালু করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর মস্তিষ্কপ্রসূত ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প মারফত ২০২১ সাল থেকে লক্ষ লক্ষ মহিলা মাসিক ভাতা পেয়ে থাকেন। একদিনের জন্যও তাতে ছেদ পড়েনি, বরং সম্প্রতি ভাতার অঙ্ক এবং বেনিফিসিয়ারির সংখ্যা বেড়েছে। অন্য একাধিক রাজ্য বাংলাকে টুকে মহিলাদের মন জয়ের কৌশল করলেও বেশিরভাগ জায়গায় তার সাফল্য অধরা। এই প্রসঙ্গেই আসে দিল্লির কথা। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির (আপ) শাসনের অবসান ঘটাতেই সেখানে মহিলাদের আড়াই হাজার টাকা মাসিক ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আতিশী বলছেন, দিল্লিতে বিজেপি সরকার গঠনের পর একবছর তিনমাস অতিক্রান্ত। কিন্তু এখনো মোদিরা কথা রাখেননি। এবার বাংলাসহ পাঁচ জায়গায় বিধানসভা ভোটের আগেও, মোদি-শাহ জুটি রকমারি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, খোয়াব দেখাচ্ছেন। স্বভাবতই খেলাপি বিজেপিকে আর একবার সুযোগ দেওয়ার আগে হুঁশিয়ার করছেন অনেকেই। তাঁরা বলছেন, ‘বিজেপি’ আর ‘জুমলা’ সমার্থক শব্দ। মোদির পার্টি নিজগুণেই এই ‘কীর্তিস্থাপন’ করেছে। আতিশীর অভিযোগের উত্তরে দিল্লির বিজেপি সরকার অবশ্য জানিয়েছে, মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞপ্তি জারি হচ্ছে শীঘ্রই। আগামী মাস থেকেই টাকা মিলবে বলে তাঁদের আশা। পালটা প্রশ্ন উঠেছে, গত একবছরের প্রাপ্যও কি মেটানো হবে? নাকি রাজকোষের স্বাস্থ্যের কথা ভেবেই এই ইচ্ছাকৃত বিলম্ব? বৈতরণি (পাঁচ বিধানসভার ভোট) পেরোনোর পর যথারীতি চোখ উলটে দেবে না তো সরকার? না আঁচালে বিশ্বাস রাখা সত্যিই যে কঠিন, এই ‘ক্রেডিবিলিটি’ একান্তভাবেই মোদিবাবুর বহু কষ্টার্জিত অর্জন। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ