


কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: ইংরেজ পুলিসের চোখে রবীন্দ্রনাথ ঘোরতর সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি। তিনি স্বদেশিদের সমর্থন দেন। রাখি বাঁধেন। শাসক বিরোধী লেখালেখিও করেন। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের নথিতে তিনি চিহ্নিত ‘রবি টেগোর, আই.বি. সাসপেক্ট নাম্বার ১১’ হিসেবে। কবি তলায় তলায় ইংরেজ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কেমন ষড়যন্ত্র করছেন, তা জানার জন্য তাঁর পিছনে গোয়েন্দাও লাগানো রয়েছে। তক্কে তক্কে আছে তারা, বেচাল কিছু দেখলেই ধরবে। এহেন সন্দেহবাতিক ব্রিটিশদেরও নতজানু হতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সামনে।
স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে। ইংরেজরাও বিপাকে পড়ে বিদ্বানের আশ্রয় চেয়েছিল। অর্থাৎ রবি ঠাকুরের। উনিশ শতকের কলকাতায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের সাংস্কৃতিক জীবনে সঙ্গীতের কোনও স্থান ছিল না। তা ছিল শুধুমাত্র পেশাদার বাঈজি এবং নর্তকীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর তাই সেই সময় সংস্কৃত কলেজে সঙ্গীতশিক্ষা শুরু করতে নাকানি-চোবানি খাচ্ছেন সাদা চামড়ার আমলারা। বড় বাধা বঙ্গের রক্ষণশীল সমাজ। পরিত্রাণের উপায় না পেয়ে রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হল ব্রিটিশ সরকার। রবীন্দ্রনাথ ‘না’ করলেন না, বরং পথ বাতলে দিলেন। কীভাবে?
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য লেখ্যাগার বা আর্কাইভে ঢুকলে ক্যালেন্ডারের পাতা যেন এক লহমায় এক শতক পিছনে চলে যায়। সংরক্ষিত অমূল্য নথির মাঝে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস বেরিয়ে আসতে চায়। এমনই এক নথি বর্তমান কালকে হতবাক করে জানাচ্ছে সঙ্গীতশিক্ষা নিয়ে রীতিমতো দিশাহারা ছিল ব্রিটিশ শাসকরা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সংগীত শিক্ষা কিছুতেই চালু করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় তাদের মনে হল, ওই ‘রবি টেগোর’ লোকটি হয়তো কিছু সুরাহা করতে পারেন। আর্কিভিস্ট শর্মিষ্ঠা দে তাঁর ‘শহরের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সুর মিলিয়ে সঙ্গীত’ শীর্ষক লেখায় লিখেছেন, ১৯১৪ সালে ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন, ডব্লু ডব্লু হর্নেল রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে সংগীতশিক্ষা বিষয়ে পরামর্শ চান। লেখেন, ‘আমি শুনেছি, শান্তিনিকেতনে সংগীতশিক্ষার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অনুগ্রহ করে আপনি জানাবেন, সেখানে কেমনভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় ও তার প্রভাব কেমন?’ এছাড়াও তিনি জানতে চান, ‘হিন্দু ও মুসলমান সংগীত নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আপনি কি এর কোনও সমাধানসূত্র দিতে পারেন?’ রবীন্দ্রনাথ উত্তরে লেখেন, ‘বাংলায় হিন্দু-মুসলমান সংগীতের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে বড় পার্থক্য নেই। অধিকাংশ মানুষই ধর্মীয় গান পছন্দ করেন এবং অনেক বাংলা গান আছে, যা হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের উপযোগী।’ আর সংগীতশিক্ষা? রবি ঠাকুর প্রস্তাব দেন, ‘গান বাছাই করে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণির জন্য একটি সুনির্বাচিত সিলেবাস তিনি তৈরি করে দিতে পারেন।’ এরপর রবীন্দ্রনাথ এবং রাজা সুরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের পরামর্শ মেনে পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের অধিদপ্তর সংগীত শ্রেণি চালুর সুপারিশ করে। রক্ষণশীলতার ‘বাঁধন টুটে’ শুরুও হয় সংগীতশিক্ষা।
শর্মিষ্ঠা দে’র লেখা থেকে জানা যায়, সংস্কৃত কলেজে প্রথম সংগীত শ্রেণি চালু হলে ছাত্রদের থেকে প্রবল আপত্তি আসে। তার প্রমাণ মেলে সংস্কৃত কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জি বেলেট-এর চিঠিপত্রে। এক চিঠিতে লেখা, ‘কলেজের অধিকাংশ ছাত্র রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারের, যারা সংগীতকে নিম্ন ও অধঃপতিত জীবনের সঙ্গে যুক্ত মনে করেন।’ এই পরিস্থিতিতেই ইংরেজদের পরিত্রাতা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর হস্তক্ষেপের পর শিক্ষা ব্যবস্থায় সংগীত একটি সম্মানজনক বিষয়ে পরিণত হয়... বাঙালির সংস্কৃতিতে, জন্ম-মৃত্যুতে, প্রভাত ফেরিতে। আজ ২২ শ্রাবণও যখন বাংলার আনাচ কানাচ মুখরিত হবে রবি ঠাকুরের সৃষ্টিতে, মনে কি পড়বে সংগীতশিক্ষায় তাঁর ‘নিঃশব্দ’ অবদান?